খুলনা

কালীগঞ্জে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের ২৮ দিন পর প্রসূতির মৃত্যু, চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে একটি বেসরকারি হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের ২৮ দিন পর স্বপ্না বিশ্বাস (৩০) নামে এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারে চিকিৎসকের অবহেলা ও পরবর্তী সময়ে যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়ায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

নিহত স্বপ্না বিশ্বাস কালীগঞ্জ উপজেলার ৩ নম্বর কোলা ইউনিয়নের কাকলাশ গ্রামের শংকর কুমার বিশ্বাস ও শিউলি বিশ্বাস দম্পতির মেয়ে।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ১০ সেপ্টেম্বর প্রসববেদনা নিয়ে কালীগঞ্জের ডা. কামরুন নাহার মেমোরিয়াল হাসপাতাল অ্যান্ড নাহার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভর্তি হন স্বপ্না বিশ্বাস। সেখানে চিকিৎসক ডা. প্রতাপ কুমার বিশ্বাসের তত্ত্বাবধানে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেন তিনি। অস্ত্রোপচারের তিন দিন পর, ১৩ সেপ্টেম্বর হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফেরেন স্বপ্না।

স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর থেকেই স্বপ্নার পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলতে থাকে। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে পুনরায় একই হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং চিকিৎসকের পরামর্শে ভর্তি করা হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে যশোর সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়।

যশোর সদর হাসপাতালের চিকিৎসকেরা স্বপ্নার শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে জরুরি ভিত্তিতে দ্বিতীয়বার অস্ত্রোপচার করেন। পরিবারের দাবি, অস্ত্রোপচারের সময় তাঁর পেটের ভেতরে নাড়িসহ বিভিন্ন অংশে মারাত্মক জটিলতা ও পচন দেখা যায়। পরে তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত শনিবার (১০ অক্টোবর) তাঁর মৃত্যু হয়।

নিহত স্বপ্নার বাবা শংকর কুমার বিশ্বাস কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার মেয়ের সিজারের সময় কোনো ভুল হয়েছিল কি না, তা আমরা বুঝতে পারিনি। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর থেকেই তার পেট ফুলতে থাকে। আবার ওই হাসপাতালে নিয়ে গেলে ভর্তি করে পরদিন সকালে পরীক্ষা করতে বলা হয়। রিপোর্ট দেখে ডা. প্রতাপ জানান, কিডনির নিচে পানি জমেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পরে যশোর সদর হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা জানান, দ্রুত অস্ত্রোপচার না করলে যেকোনো মুহূর্তে পেট ফেটে যেতে পারে। এরপর জরুরি অস্ত্রোপচার করা হয়। চিকিৎসকেরা জানান, পেটের ভেতরের বিভিন্ন অংশে পচন ধরেছে। মেয়েকে আইসিইউতে রাখা হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো গেল না।’

অভিযোগ করে শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘আমার মেয়ে সুস্থভাবে সন্তান জন্ম দিতে হাসপাতালে গিয়েছিল। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর থেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। চিকিৎসায় কোনো ভুল বা অবহেলা হয়ে থাকলে আমরা তার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।’

এদিকে মায়ের মৃত্যুর পর নবজাতককে ঘিরে পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে এলাকার পরিবেশ।

এ বিষয়ে অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসক ডা. প্রতাপ কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘রোগীর অবস্ট্রাকশনজনিত সমস্যা প্রকট ছিল। স্বজনদের কারণে চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হওয়ায় আমরা রোগীকে যশোর সদর হাসপাতালে রেফার করি।’

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) চিকিৎসক শিশির কুমার ছানা বলেন, ‘একজন প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনাটি শুনেছি। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।’

ঘটনার খবর পেয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা নাহিদ নিহতের বাড়িতে গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান এবং নবজাতকের খোঁজখবর নেন।

ইউএনও রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। বিষয়টি জানার পর আমি নিজেই ওই বাড়িতে গিয়ে শিশুটিকে দেখে এসেছি এবং তাৎক্ষণিকভাবে কিছু সহায়তা প্রদান করেছি। চিকিৎসার ক্ষেত্রে কোনো অবহেলা বা ভুল হয়ে থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এ ঘটনায় স্বপ্নার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং চিকিৎসায় অবহেলা ছিল কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্বজনেরা।



সম্পর্কিত খবর