এই মাত্র পাওয়া :

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২১

ইউরোপের দিনগুলো-বরফমাখা স্মৃতি

বিভাগ : কলাম প্রকাশের সময় :১০ জানুয়ারি, ২০২১ ৬:২৩ : অপরাহ্ণ

মিলু কাশেম

জীবনের সবচে’ সুন্দর তারুণ্যের দিনগুলো কেটেছে আমার ইউরোপে।১৯৮২ সালের শুরু থেকে আমার প্রবাস জীবনের শুরু নেদারল্যান্ডস এর বিশ্ব নগরী আমস্টারডামে। আমি থাকতাম নিউ আমস্টারডামের বেইলমিয়ার এলাকায় আমার এক চাচা বৃটিশ নাগরিক সৈয়দ আনসাফ আলীর ফ্লাট বাড়ীতে। এটা ছিল তৎকালীন সময়ে ইউরোপের সবচে’ আধুনিক বৃহত্তম আবাসিক এলাকা।

বেইলমিয়ারের কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছিল আধুনিক সুসজ্জিত এপার্টম্যান্ট কমপ্লেক্স। এত চমৎকার আর আধুনিক নগরী তখন ইউরোপের আর কোথাও ছিল না।

নেদারল্যান্ডস শীত প্রধান দেশ। আর আমার ইউরোপ জীবনের শুরু শীতকালেই। জীবনের প্রথম তুষারপাত আমি আমস্টারডামেই দেখি। সেদিন সারারাত তুলার মত বরফ ঝরে। সকালে ঘুম থেকে উঠে জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি চারিদিক সাদা বরফে ঢাকা। বাড়ী ঘর গাছপালা কিছুই চোখে পড়ছে না। রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে গেছে বরফ জমে। কিছু সময় পর দেখলাম বরফের মাঝে একদল শিশু কিশোর নানা ধরনের খেলায় আনন্দ উচ্ছ্বাসে মশগুল। আমাদের এপার্টমেন্টের সামনে বিশাল এলাকাজুড়ে ছিল চমৎকার একটা লেক। কিছুদিনের মধ্যে দেখলাম ঠান্ডা আর বরফে লেকের পানি জমে আইস হয়ে গেছে। আর কিশোর কিশোরীরা দল বেধে সেই লেকের জমে যাওয়া আইসে স্কি খেলছে, স্কেটিং করছে। আমার সেসব ছিল এক নতুন অভিজ্ঞতা।

আমার প্রবাস জীবনের প্রায় এক দশক কেটেছে জার্মানীতে।জার্মানে থাকলেও পূর্ব পশ্চিম ইউরোপের অনেক দেশেই শীতকালে ভ্রমনের সুযোগ হয়েছে আমার। ইউরোপে সাধারনত ডিসেম্বর মাসে বিশেষ করে ক্রিসমাস নিউ ইয়ারে বরফ পড়া শুরু হয়। বড়দিনের প্রাক্কালে বরফ পড়াকে খৃষ্ট ধর্মাবলম্বীরা অনেকেই উৎসবের অঙ্গ হিসাবেই মনে করে।

বড়দিনের ভোরে সবকিছু সাদা বরফে ঢাকা দেখলে শিশু কিশোর কিশোরীরা আনন্দে মেতে উঠে। বড়দিনে বরফের দেখা না পেলে ইউরোপের অনেক দেশের রক্ষণশীল খৃষ্টানদের মন খারাপ হয়ে যায়। তারা মনে করে কোনো কারনে ইশ্বর তাদের উপর নারাজ। যে কারণে বরফের দেখা মিলেনি।

আমি ১৯৮৬ সালে বড়দিনে পূর্ব ইউরোপের পোল্যান্ডের কনিন শহরে একটি পোলিশ পরিবারের অতিথি হিসাবে তাদের বাড়ীতে ছিলাম। সে বছর বড়দিনে সেখানে বরফ পড়েনি। সেটা নিয়ে তাদের মন খারাপ ছিল। উল্লেখ্য পোল্যান্ড একটি ধর্মভীরু খৃস্টান দেশ। তখন ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপ ২য় জনপোল ছিলেন একজন পোলিশ নাগরিক।

একই অবস্থা আমি দেখেছি ১৯৮৮ সালের বড়দিনে হাঙ্গেরীর বুদাপেস্টে। সে বছর সেখানে বরফ কম পড়েছিল বড়দিনে। সেবার আমি আমার হাঙ্গেরীয়ান বন্ধু তাসেক এর পরিবারের অতিথি ছিলাম তাদের বাড়ীতে। বড়দিনে বরফ কম পড়ায় সেদিন তাদের আনন্দ অনেকটা মাটি হয়ে গিয়েছিলো। তারা সবাই বলাবলি করছিলো মানুষ গডকে ভুলে যাচ্ছে- তাই তিনি নারাজ। শুনেছি সেবার গীর্জায় বরফের জন্য বিশেষ প্রার্থনা হয়েছিল বুদাপেস্ট। আমার একযুগের ইউরোপ জীবনে বরফ আর তুষারপাত নিয়ে বেশ মজার অভিজ্ঞতা রয়েছে।

১৯৮৭ সালে বড়দিনের ছুটিতে আমি আর আমার পাকিস্তানি বংশোদ্ভত জার্মান বন্ধু আজহার গিয়েছিলাম সড়ক পথে সুইজারল্যান্ডের বাসেল। সেই উদ্দেশে আমরা যাত্রা করি মিউনিখ অভিমুখে। আমাদের প্রোগাম ছিল সুইস বোর্ডারের কাছাকাছি গেইলডর্ফ এর একটি ক্যাম্পে আমার কয়েকজন আত্মিয়কে দেখা। তার পর আমরা যাবো বাসেল। সেদিন আবহাওয়া ভাল ছিল না। নেদারল্যান্ডস সীমান্তবরতী জার্মান শহর স্যানটেন থেকে প্রায় ৫ ঘন্টা ড্রাইভের পর আমরা বায়ার্ন সীমানায় প্রবেশের পর থেকে শুরু হয় তুষারপাত। বরফ জমে রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়ে অটোবানে (মহাসড়ক)৩০/৪০কিলেমিটার দীর্ঘ লাইন পড়ে কিছু সময়ের মধ্যে বরফের স্তুপ জমে যায়।

আমাদের গাড়ীসহ লাইনে দাড়ানো গাড়ী গুলো ঢাকা পড়ে বরফে। ঠান্ডায় গাড়ীর হিটার বন্ধ হয়ে যায়। সেদিন সারা রাত আমরা প্রচন্ড ঠান্ডা আর বরফের মাঝে রাস্তায় কাটাই। সকালের দিকে তুষারপাত থামলে সড়ক বিভাগের গাড়ীগুলো লবন ছিটিয়ে রাস্তা পরিস্কার করলে আমরা আবার যাত্রা শুরু করি। বরফের কারনে আমাদের গন্তব্যে পৌছতে সারা দিন লেগে যায়।
সেই জার্নিটা ছিলো আমার জীবনের একটা স্মরনীয় জার্নি।

গেইলডর্ফে একরাত থেকে আমরা পরদিন যাই সুইজারল্যান্ডের বাসেল(ইধংবষ)। সেখানেও ছিল প্রচন্ড ঠান্ডা এবং তুষারপাত।বাসেলে আমরা রাত যাপন করি আজহারের কাজিন শাহনেওয়াজের বাড়ীতে। রাতে এক নাগারে বরফ ঝরে সারারাত। সকালে উঠে দেখি আমাদের ইগড গাড়ী দেখা যাচ্ছে না। বরফের নীচে ঢাকা পড়ে গেছে। সে এক মজার স্মৃতি।

ঠান্ডা এবং বরফ নিয়ে আমার সবচেয়ে স্মরনীয় এবং কষ্টের স্মৃতি ১৯৮৫ সালের। আমি তখন জার্মানীর লোয়ার রাইন অঞ্চলের ঐতিহাসিক নগরী স্যানটেন এর এগ্রো ফার্ম ‘ফিরমা হেবেন’ এ কাজ করি। এই ফার্মটি ফুলের জন্য বিখ্যাত। বিশাল এলাকা নিয়ে গ্রিন হাউসে চাষ হয় নানা ধরনের ফুল ফুলের চারা। গ্রীন হাউসে ফুল চারা সুরক্ষার জন্য আমাদের ছিল নিজস্ব ক্যাসেল হাউস। সেখান থেকে পাইপের মাধ্যমে গরম পানি দিয়ে হিটার চালু রাখা হয় প্রতিটি গ্রীন হাউসে। যাতে ঠান্ডায় গাছ ফুল নষ্ট না হয়। জার্মানির অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এই এলাকায় প্রচন্ড শীত বা বরফ পড়ার ইতিহাস কম। তবে ১৯৮৫ সাল ছিল এই এলাকার জন্য একটি স্মরণীয় বছর। সে বছর স্যানটেনের মানুষ সর্বনিম্ন তাপমাতা এবং সবচেয়ে বেশী তুষারপাত অবলোকন করেন।

সম্ভবত ডিসেম্বর মাস। রাত থেকেই প্রচন্ড ঠান্ডা এবং বরফ পড়ছে। রুমের হিটারে কাজ হচ্ছে না। সকালে আমার বস ‘হ্যান্স হেবেন’ এর ডাকে ঘুম ভাঙলো। উল্লেখ্য আমি তাদের বাড়ীতেই দু’তলায় থাকতাম। দেখলাম আমার বস খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এবং পেরেশানি অবস্থা।
সে আমাকে জানালো -ঠান্ডা এবং বরফে আমাদের কয়েকটি গ্রিন হাউসের হিটারের লাইনের বাহিরের অংশের পাইপ আইস হয়ে জমে গিয়ে হিটার চলছে না। এতে করে দামি দামি অনেক গাছ সারা রাতে ঠান্ডায় নষ্ট হয়ে গেছে। আমাদের ইঞ্জিনিয়ার পাপে এসে গেছে আমাকে দ্রুত অন্য সহকর্মীকে রুডিকে নিয়ে পাইপ লাইনের কাছে যেতে হবে। ট্রলিতে করে গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে। দ্রুত হিট দিয়ে পাইপের জ্যাম ক্লিয়ার করে হিটার চালু করার ব্যবস্থা করতে হবে। দ্রুত তৈরী হয়ে আমি আর রুডি গ্যাস সিলিন্ডার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিয়ে পাপের সাথে গ্রিন হাউসের পাশের সড়কে হিটারের লাইনের কাছে গেলাম। বরফ সরিয়ে পাইপ বের করে জমে যাওয়া অংশে শুরু হলো হিট দেয়া। বাহিরে তখন প্রচন্ড ঠান্ডা এবং অবিরাম বরফ পড়ছে। আমি ট্রলি ধরে আছি রুডি পাপেকে সহযোগীতা করছে। প্রায় ২৫/৩০ মিনিট প্রচন্ড হিট দেয়ার পর লাইন ক্লিয়ার হয়ে হিটার চালু হলো। কাজ শেষে আমি অনুভব করলাম আমি জায়গা থেকে নড়তে পারছি না। সরাতে পারছি না পা। আমার পা হাটুর উপর পর্যন্ত বরফে ঢেকে গেছে। বিষয়টি আমি পাপে এবং রুডিকে বললে পাপে তার পকেট থেকে ছোট্র ভদকা’র বোতল বের করে এক ডোজ মুখে দিয়ে ট্রলিতে লাগানো থার্মোমিটার দেখিয়ে বললো -তোর পা তো জমে গেছে ঠান্ডায়। দেখ টেম্পারেচার কত। – মায়নাস ২৮, এর আগে এই এলাকায় টেম্পারেচার এত নীচে নামতে আমি আর দেখিনি। পরে তাদের দু’জনের সহযোগীতায় আমি ঘরে ফিরলাম। কয়েক ঘন্টা গরম ইলেকট্রিক হিটারের শেক দিয়েও পা স্বাভাবিক হলো না। বাম পা টা অবশের মত হয়ে গেলো। পর দিন আমার বস হ্যান্স আমাকে আমাদের ডাক্তার মুলারের চেম্বারে নিয়ে গেলেন। তিন দিনে তিনটা ইনজেকশন দেয়া হলো আমার বা পায়ে। তারপর কয়েক দিনে আস্তে আস্তে কিছুটা স্বাভাবিক হলো পায়ের অবস্থা। কিন্তু সেদিনের সেই ভয়ংকর স্মৃতি আমি আজও ভুলতে পারিনি। এখনও শীতকালে মাঝে মাঝে আমার বাম পায়ে প্রচন্ড ব্যাথা হয়। অবশের মত লাগে। তাই বরফের দৃশ্য দেখলেই আমার চোখে ভাসে সে দিনের সেই দৃশ্য আর বরফমাখা স্মৃতি। আর আমি আক্রান্ত হই নষ্টালজিয়ায়।

লেখক: সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও পর্যটক।










Print Friendly and PDF

ফেইসবুকে আমরা