এই মাত্র পাওয়া :

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২১

 উজাড় হচ্ছে সাতছড়ি বনাঞ্চল, হারিয়ে যাচ্ছে জীব-জন্তু

বিভাগ : এক্সক্লুসিভ প্রকাশের সময় :২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ৯:৫৯ : অপরাহ্ণ




আব্দুল হালীম :

সৌন্দর্যের লীলাভুমি হবিগঞ্জের সাতছড়ি এখন নিঃশেষ হতে চলেছে। চোরাকারবারী, রাজনৈতিক দলের নেতা ও এক শ্রেনীর সরকারি কর্মকতার দূর্নীতির কারনে দিন দিন উজাড় হচ্ছে এ বনাঞ্চল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে রয়েছে যে এখনই কাঠোর ব্যবস্থা না নেয়া হলে আগামী কয়েক বছরেই বনাঞ্চলে গাছপালা বলতে কিছুই থাকবে না। ইতিমধ্যে রশিদপুর বনবিট উজাড় হয়ে গেছে। বনবিভাগ এই বিটকে প্রায় ১৬ বছর আগেই পরিত্যক্ত ঘোষনা করেছে। বাকি বিটগুলো চোরাকারবারীরা গ্রাস করতে শুরু করেছে। হবিগঞ্জ জেলায় বনাঞ্চলের আয়তন ৩৬ হাজার একর। ৪ টি রেঞ্জে বিভক্ত বন বিভাগের রয়েছে ১১ টি বিট। এ গুলো হচ্ছে হবিগঞ্জ- ১( শায়েন্তাগঞ্জ )এর আওতায় -১টি, হবিগঞ্জ-২ (কালেঙ্গা) ৪ টি, সাতছড়ির ২ টি, ও রঘুনন্দন রেঞ্জের আওতায় ৪টি বিট। বনাঞ্চলের প্রায় ৯৫ ভাগ জায়গাতেই বন বিভাগ সেগুন, গর্জন, শাল, গামার, জারুল, আকাশমনি, মেনজিয়াম, লোহাকাঠ, আগর, চাপালিশ, বাঁশ, বেত জাতীয় গাছ সৃজন করেছে। শত কোটি টাকার এই বনসম্পদ লুটে নিতে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় গড়ে উঠেছে বনদস্যু। এরা সুযোগ বুঝে দিনে কিংবা রাতে কেটে নিয়ে যাচ্ছে মূল্যবান গাছ। প্রতিদিন রাতের আধারে ট্রলি, ট্রাক যোগে লাখ লাখ টাকার গাছ পাচার হলেও বন বিভাগ ও পুলিশ অনেকটা দেখেও না দেখার ভান করে থাকেন। এর ফলে এ বনের জীবজন্তুও হারিয়ে যেতে বসেছে।

সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার পাইকপাড়া ইউনিয়নর রঘুনন্দন পাহাড়ে অবস্থিত। এ বনের
গাছ কাটা থেকে পাচার পর্যন্ত সমস্ত কিছুই হচ্ছে নগদ নারায়নের মাধ্যমে। বন বিভাগের কিছু অসৎ বিট অফিসার ও রক্ষীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় এ গাছ পাচার চলছে। কয়েকদিন বৃষ্টি হলেই শত শত গাছ পড়ে গেছে বলে দাবি করা হয়। কিন্তু বাস্তবে বন কর্মকতারা গাছ কেটে বিক্রি করে দেন। সরজমিনে তেলমাছড়া ও সাতছড়ি বনাঞ্চলে ঘুরে দেখা গেছে চোরাকারবারীরা গহীণ বন থেকে গাছ কেটে নেয়ার পর গাছের মোথা আগুনে পুড়িয়ে, আবার কোথাও মোথা পর্যন্ত আলামত নষ্ট করে দেয়। একজন গাছ চোর প্রতি ঘনফুট গাছের জন্য দিতে হয় ৪-৫ শত টাকা বিট কর্মকতাকে। অর্থ লেনদেনের শেষে অসৎ কর্মকর্তা ও রক্ষী গাছের প্রধান অংশ গুলো তুলে আলমত নষ্ট করে ফেলে। আর ডগার অংশ নিয়ে যাওয়া হয় বিটে। যা আহরিত বনজ সম্পদ হিসেবে পরিচিত। অবৈধ গাছ গুলো প্রকাশ্যেই ঠেলাগাড়ি, রিকশা বা ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হয় চুনারুঘাট ও তেলিয়াপাড়ার বিভিন্ন করাত কলে। সেখান থেকে পাচার হয় হবিগঞ্জ সহ সারা দেশে। পাচারের সময় রাস্তায় কর্র্মরত বন বিভাগের চেকপোষ্ট, পুলিশকে নির্দিষ্ট পরিমান চাদা দিতে হয়। স্থানীয় লোকজন প্রতিবাদ করলেই তাদের কে বন আইনের বিভিন্ন মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়।


এ উদ্যানে ১৯৭ প্রজাতির জীব-জন্তু রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২৪ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ৬ প্রাতির উভচর। আরো আছে প্রায় ১৫০ প্রজাতির পাখি। এটি বাংলাদেশের একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং পাখিদের একটি অভয়অশ্রম। বনে লজ্জাবতী বানর, উল্লুক, চশমাপরা হনুমান , শিয়াল, কুলু বানর , মেছোবাঘ, মায়া হরিণ ইত্যাদি। সরিসৃপের মধ্যে সাপ, পাখির মধ্যে ধনেশ, বনমোরগ, লালমাথা ট্রগন, কাঠ ঠোকরা, ময়ুর, ভিমরাজ, শ্যামা, ঝুটিপাঙ্গা, শালিক, হলদে পাখি । কিন্তু এদিকে অব্যাহতভাবে গাছ পাচারের ফলে এ জীব-জন্তু এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। অনেক জীবজন্তু লোকালয়ে এসে হাজির হয়। পরে এদের মৃত্যু ঘটে। ফলে হারিয়ে যেতে বসেছে আমাদের বন্যপ্রাণী।

সরেজমিনে সাতছড়ি পুরাতন অফিস, ৪ নাম্বার, তেলমাছড়াসহ কয়েকটি স্থানে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকটি গাছ অন্তর অন্তর বিশাল গাছগুলোর গোড়া কাটা। আবার অনেকগুলো কাটা গাছ পাশে ফেলে রাখা হয়েছে। যারা গাছ কর্তন করেন তাদের এক শ্রমিক গাছ কাটার স্থানগুলো ঘুরে দেখান।

সাতছড়ি রেঞ্জর মোতালেব হোসেন সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, গাছ কাটার বিষয়টি অস্বীকার করেন। তার পর তিনি বলেন, এসব বিষয়ে তিনি কথা বলতে রাজী নন। কারোর প্রয়োজন হলে ডিএফও (বন বিভাগের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সিসিএফ) সাথে যোগাযোগ করেন।

এ ব্যাপারে চুনারুঘাটের উপজেলা নির্বাহী অফিসার সত্যজিত রায় দাশের সাথে কথা বললে তিনি জানান, শুনেছি সাতছড়িতে গাছ পাচার সব সময় হয়ে থাকে। আর গাছ পাচারের ব্যাপারে অভিগোগ থাকলে বন বিভাগের লোকদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Print Friendly and PDF

ফেইসবুকে আমরা