এই মাত্র পাওয়া :

ঢাকা, রোববার, ৭ মার্চ ২০২১

সাক্ষাৎকার

একজন শিক্ষক সারা জীবনই একজন ছাত্র: প্রফেসর ডঃ এ এইচ এম মোস্তাফিজুর রহমান

বিভাগ : এক্সক্লুসিভ প্রকাশের সময় :৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ৫:৩২ : অপরাহ্ণ

সাক্ষাৎকারে খোলামেলা অনেক কথা বলেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ডঃ এ এইচ এম মোস্তাফিজুর রহমান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইমরান আলী।

প্রশ্নঃ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মান অতীতে কেমন ছিল এবং বর্তমানে কেমন আছে বলে আপনি মনে করেন?

বর্তমান শিক্ষকরা ভালো মানের গবেষক এবং তারা ইয়াং ট্যালেন্টেড শিক্ষক এতে কোন সন্দেহ নেই। আমাদের দেশে খুব ভালো স্কলার ও শিক্ষক আছেন যারা খুব ভালো পড়ান। এবং এই শিক্ষকরা সারাজীবন অনেক পড়ালেখা করেছেন বলেই চারবার ফাস্ট ক্লাস পেয়ে তারা টিচার হয়েছেন। এখানে আমার কোন দ্বিমত নেই। শুধুমাত্র একটা বিষয় আছে যেটা আমি বলব যে, আমাদের শিক্ষকদের কমিটমেন্টের অভাব আছে। কিসের কমিটমেন্ট? নিজের ডেভলপমেন্টের নয়, নিজের উচ্চতর ডিগ্রির জন্যও নয় বরং ছাত্র-ছাত্রীদের দেবার ক্ষেত্রে ঘাটতি আছে। ছাত্র-ছাত্রীদের যদি এভারেজ টাইম হিসেবে বিবেচিত করেন, একজন ডিপার্টমেন্টের টিচার তাদের কতক্ষণ সময় দেয়? ইট ইজ ভেরি পোর। শিক্ষকদের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি অধিকাংশ শিক্ষকদের যে সময় দেওয়া দরকার শিক্ষার্থীদের ডিপার্টমেন্টের তা দিতে পারছেন না। এতে করে কি হবে? আমার নেক্সট জেনারেশনের শিক্ষার্থীরা আমাদের শিক্ষকদের মত ব্রিলিয়ান্ট শিক্ষার্থী হিসেবে তৈরি হবে না। আমি বলবো এসব ছেলেমেয়েরা অপুষ্টিতে ভুগছে। কেন তাদের কিছুই ব্রিলিয়ান্ট টিচার আছে এবং তাদের কাছ থেকে কিছু পাওয়ার কথা ছিল কিন্তু তারা তা পাচ্ছে না।

প্রশ্নঃ শিক্ষকরা কেন সময় দিতে পারছেন না বলে মনে করেন?

সেটা ব্যক্তিগত উন্নয়নের কারণে, গবেষণার কারণে, বাইরে লেখালেখি করতে হয়, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় পার্টটাইম পড়ান অনেকে আছে। এসবের কারণে আমার শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছেন । আমার শিক্ষার্থীরা যে পরিমাণ কোয়ালিটি এডুকেশন পাওয়ার কথা ছিল তা তারা পাচ্ছেন না।

প্রশ্নঃ বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কী কী ভূমিকা পালন করা উচিত?

আমাদের শিক্ষকদের তাদের দায়িত্বের প্রতি আরো যত্নবান হতে হবে । শিক্ষার্থীদের সময় দিতে হবে । যেমন আমার কথাই বলি , বেস্ট কিছু আমার শিক্ষার্থীদের দিয়েছি । আমি যখন ক্লাস নিতে যেটা আমি কখনোই ক্লাস নোট ছাড়া ক্লাসে যেতাম না। দ্বিতীয়ত, আমি কখনো এক মিনিট দেরিতে ক্লাসে যেতাম না। আমার সময়ের যেমন দাম আছে আমার ছেলেমেয়েদের সময়েরও দাম আছে। আমি যদি পাঁচ মিনিট পরে যাই তাহলে তারা এই সময়ে যে নতুন কিছু শিখতে পারতো তা থেকে বঞ্চিত হতো ।
ক্লাস শেষে আমি ডিপার্টমেন্টে বসতাম এবং সকলকে ওয়েলকাম করতাম তাদের একাডেমিক ও পার্সোনাল সব বিষয় নিয়ে ডিসকাস করতাম । আমার দেশের সব শিক্ষকরা যদি এমন করে তাহলে কেমন হবে? আমার অনেক ব্রিলিয়ান্ট ছেলে মেয়ে তৈরি হবে এটা আমি ইনসিওর করতে পারবো।শিক্ষকরাই পারে একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখতে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কোন আলাদা কাউন্সিলের প্রয়োজন পড়বে না । কারণ একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মানসিক ভাবে কাউন্সিল করবেন । দিস আর দি ভেরি ইম্পর্টেন্ট থিংস। একজন শিক্ষক হবে অভিভাবক, বন্ধু এবং একজন শিক্ষক তো বটেই । আমি মনে করি একজন শিক্ষক সারা জীবনই একজন ছাত্র। যে শিক্ষক নিয়মিত পড়াশোনার মধ্যে থাকে না সে কখনো ভালো শিক্ষক হতে পারে না। যে শিক্ষক  নিজেকে সারা জীবন একজন পূর্ণকালীন ছাত্র হিসেবে মনে করতে পারেন, উনিই হবেন জ্ঞানী। আর তিনিই জ্ঞান দিতে পারবেন শিক্ষার্থীদের। ভালো শিক্ষক হতে হলে শিক্ষার্থীদের এক্সেস দিতে হবে ।


প্রশ্নঃ বিশ্বের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে তাল মিলিয়ে সবসময় র্যাংকিংয়ে পিছিয়ে থাকছে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এর কারণ কি বলে মনে করেন?

বিশ্বের বেশ কিছু সংস্থা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এমন রেংকিং করে থাকে। তারা বেশ কিছু বিষয়ের উপর ভিত্তি করে এই তথ্য দিয়ে থাকেন। যেমন: শিক্ষার্থীদের এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিকেশন্স এর উপর, গবেষণার ওপর, একাডেমিক রেজাল্ট, শিক্ষার্থীরা কেমন গবেষণায় জড়িত রয়েছে, নাম্বার অফ পিএইচডি, এসব মেজারমেন্টের মাপকাঠি হিসেবে ধরে রেংকিং হতে পারে।

আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো র্যাংকিংয়ে নাই। আমি বলব হতাশ হবার কিছু নেই । এটা না থাকার মানে এই নয় যে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভালো শিক্ষা ও গবেষণা হচ্ছে না । হচ্ছে । আমাদের শিক্ষকরাও গবেষণা ও পিএইচডি করছে। কিন্তু আরেকটা বিষয় হচ্ছে আমাদের গবেষণা বাবদ যে ফান্ড দেওয়া হয় সেটা খুবই কম। শিক্ষকরা যে টাকা পান তা দিয়ে ভালো মানের গবেষণা করা সম্ভব নয়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অবস্থার কারণ অনুকূল পরিবেশ নেই এখানে, অর্থের অভাব রয়েছে, টেকনোলজি ও  ল্যাব এর অভাব আছে ইত্যাদি এই সার্বিক দিক বিবেচনা করলে আমরা দেখব আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন র্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে আছে।
কিন্তু আমি কখনোই এটা স্বীকার করবো না আমার শিক্ষকরা বেশি ভালো গবেষক নয়। নো। তারা ভালো গবেষক। আমাদের হতাশ হবার কিছু নেই যে ব্যাংকিং এর পজিশন কত, আমাদের শিক্ষকরা অনেক ব্রিলিয়ান্ট তারা অনেক ভালো পড়ান।


প্রশ্নঃ সার্ভিস ডেলিভারীতে  শিক্ষকদের যে কমতির কথা বললেন এমন সময় নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মানের উপর কোন প্রভাব ফেলবে কি?

মানের উপর প্রভাব পড়তে পারে। এখানে আমার একটা সাজেশন আছে। কিন্তু আমি সরকারের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই। হায়ার এডুকেশন কে বৃদ্ধি করছেন বহু মানুষ এতে উপকৃত হবে। কেবলমাত্র আমাদের এনসিওর হতে হবে ঐসব ইউনিভার্সিটি তে ভালো টিচার দিতে হবে।  এখানে আমার একটা ভালো প্রস্তাব আছে। যেসব ভালো শিক্ষক কেবল রিটারমেন্টে যাচ্ছেন তাদের ঐসব বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। চুক্তিভিত্তিক পুরোটা ভালোভাবে গড়ার জন্য ।

প্রশ্নঃ নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির ফলে শিক্ষিত বেকার তৈরি হচ্ছে কি না?

শিক্ষিত বেকার তো তৈরি হবেই। শুরুতে কিছু দিন বা কয়েক বছর এমনটা হবে হয়তো। তারপর এরা আর শিক্ষিত বেকার হবে না। এক সময় এরা উদ্যোক্তা তৈরি হবে। বর্তমান সময়ে উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে এখান থেকেই। চাকরি আমি করব না, চাকরি আমি দেবো। এর জন্য তরুণদের তৈরি হতে হবে। তাদের স্কিল ডেভলপমেন্ট করতে হবে। যাতে তারা চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে । টেকনোলজির বিস্ফোরণ ঘটেছে world-wide সেটা বাংলাদেশেও ঘটছে। এটাকে কাজে লাগিয়ে তারা ভালো আর করছে। তাই আমি মনে করি সামরিক কিছুদিনের জন্য বেকার হবে, কিন্তু এক সময় তারা বেকার থাকবে না।

প্রশ্নঃ স্যার, শিক্ষকদের দ্রুত সময়ে পদোন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, এতে করে কি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মান আগের মতই থাকবে বলে মনে করেন?

আমি মনে করি শিক্ষকদের মান ঠিক আছে। তারা অনেক ট্যালেন্টেড। কিন্তু তাদের পদোন্নতির বিষয়ে দ্রুত করা এটা ঠিক না। এখানে আরো কিছু টার্মস এন্ড কন্ডিশন এড করা যেতে পারে। সময় ঠিক রেখেও পাবলিকেশন্স এর সংখ্যা বৃদ্ধি করা যেতে পারে । শিক্ষকদের পিএইচডি ছাড়া প্রফেসর এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর পদোন্নতি হবে না। নো। বই লিখতে হবে, বই অনুবাদ করতে হবে। তা না হলে প্রমোশন হবে না। এমনটা করতে হবে।

প্রশ্নঃ শিক্ষক রাজনীতি কি জরুরী? এবং শিক্ষক সংগঠনগুলো তাদের গুণগত মান উন্নিত করতে কি ভূমিকা রাখছে?

না, শিক্ষক রাজনীতির জরুরী নয়। আর এটা শিক্ষার্থীদের উপর প্রভাব ফেলে। তারা লেখাপড়ার দিকে সময় কম দিতে পারে। এইরকম শিক্ষকদের সংখ্যাও খুবই কম। কিন্তু এখনো এটা ক্যাম্পাসকে দূষিত করে। ছাত্র-ছাত্রী এবং শিক্ষকদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে রাজনীতি। আগেও রাজনীতি ছিল কিন্তু তাদের মাঝে একটা সম্প্রীতি সবসময় অক্ষুন্ন থাকতো। এখন রাজনীতিতে তারা বিভক্ত হয়ে যাবে এবং সম্প্রীতি নষ্ট হবে। কিন্তু আগের দিনে তা ছিল না। এখন দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে বেশি।




ইমরান আলী
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়



Print Friendly and PDF

ফেইসবুকে আমরা