এই মাত্র পাওয়া :

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ জুন ২০২১

এক হাজার টাকায় ভাগ্য বদলে গেছে সিথীর!

বিভাগ : ফিচার প্রকাশের সময় :৮ জুন, ২০২১ ৩:০৫ : অপরাহ্ণ

হাসান সিকদার, টাঙ্গাইল থেকে:
প্রত্যেকটা মানুষের বড় হওয়ার পিছনে অনেক গল্প থাকে। তেমনি একজন মানুষ ফেরদৌসী ইসলাম সিথী। তার পিছনেও গল্প আছে? আমাদের সমাজের মেয়েরা নাকি বোঝা হয়ে থাকে! তার বাবা-মার তিন সন্তানের মধ্যে সিথী দ্বিতীয়। ইচ্ছে শক্তি, বুদ্ধি, মেধা, শ্রম, সততা, নিপুণ হাতের কৌশলে তা প্রমাণ করে দিয়েছেন সিথী। তিনি টাঙ্গাইল পৌর শহরের বেড়াডোমা এলাকার মেয়ে। উইতে ২০২০ সালের ১ জুন যুক্ত হয়ে শুরু করেন ব্যবসা। তার প্রতিষ্ঠানের নাম ইচ্ছে রঙিন। তার হাসবেন্ডের কাছ থেকে মাত্র ১০০০ টাকা নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। কঠোর পরিশ্রম আর সততায় মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় হয়েছেন লাখপতি। তিনি সফল একজন নারী উদ্যোক্তা। ১০০০ হাজার টাকায় তার ভাগ্যকে বদলে দিয়েছে। তার মাসে আয় ৩০-৩৫ হাজার টাকা। বলছিলাম ফেরদৌসী ইসলাম সিথীর কথা ।

ফেরদৌসী ইসলাম সিথী এই প্রতিবেদককে বলেন, স্বপ্ন ছিল আঁকাশ ছোয়া। নিজেকে নিয়ে সব সময় ভাবতাম আমাকে দিয়ে কিছুই হবে না। আমার জীবনে কোনো সফল বলে কিছু ছিল না। আমি যেখানে যাই করেছি কোনো দিন সফল হতে পারি নাই। আমার বাবা-মার তিন মেয়ের মধ্যে আমি একজন যে কিনা বাবা-মার ইচ্ছটা পূরণ করতে পারবো না এমন ধারণা ছিল। আমাকে নিয়ে ভেবেই নিয়েছিলাম আমাকে দিয়ে কিছুই হবে না। অনার্স শেষ করে যখন বাসায় বসে থাকি দমটা বন্ধ হয়ে আসতো। খুব বেশি হতাশ ছিলাম নিজেকে নিয়ে। হতাশার রাত গুলো ছিল আমার কাছে অনেক কষ্টের। ফেরদৌসী ইসলাম সিথী বলেন, বি.বি.এ নিয়ে পড়াশোনা করার সুবাধে ব্যবসার প্রতি একটু ঝোঁক ছিল তবে আত্মবিশ্বাস ছিল না। কারণ ভাবতাম ব্যবসা করতে অনেক বুদ্ধি লাগে যা আমার নেই। হঠাৎ করোনা এসে পৃথিবীকে নিস্তব্ধ করে দিল সাথে আমিও হতাশায় পড়ে গেলাম। বেড়ে গেল চিন্তা মাষ্টার্স কবে শেষ করবো, কবে একটা চাকরি করবো। হঠাৎ একদিন আমার বড় বোন উইতে আমাকে যুক্ত করেন। তখন শুধু মাথায় ঘুরতো কিসের ব্যবসা করবো আমি তো কিছুই পারি না। আঁকাআঁকিটা যে আমি ভালো পারতাম সেটা আমি নিজেও জানতাম না। আসলে সেভাবে কখনো আঁকাআঁকি করাই হয়নি। যখন স্কুল কলেজে পড়তাম তখন খাতার কোনায় কিছু না কিছু আঁকাতাম। এই আঁকানো থেকেই আমার মাথায় আসে আমি আঁকাআঁকি নিয়েই কিছু করবো। তখনও আমি হ্যান্ডপেইন্ট সম্পর্কে কিছু জানতাম না। শাড়ি কাপড়ে কিভাবে আঁকে কিছুই জানিনা। আমার বড় বোনের কথা মত একটি শাড়ী আর রঙ কিনে আঁকা শুরু করেছিলাম এখনো সেভাবেই আঁকা চলছে। উদ্যোক্তা জীবনটা আমার কাছে অনেক মজার আর স্বাধীন মনে হয়। আর এই জন্যই আমি ঠিক করে রেখেছিলাম এমন কিছু করবো যেখানে আমি আমার মত করে সব কিছু করতে পারবো। সিথী বলেন, এই জন্যই মুলত উদ্যোক্তা হওয়া প্রথম যখন উইতে যুক্ত হই তখন শুধু একটাই ভাবনা ছিল আমার কাজটা সবার মনে জায়গা করতে হবে! এ জন্য আমি প্রচুর কষ্ট করেছি। আপনারা জানেন হ্যান্ডপেইন্টের কাজ যত নিখুঁত হয় তার ততই কদর বেশি। আমার প্রথম থেকেই অনেক অর্ডার আসতো কারণ আমার কাজ সবাই অনেক পছন্দ করতো ভালবাসতো। সারাদিন কাজ করতাম, আবার সারা রাত জেগেও কাজ করতাম। অনেক কষ্ট করতাম, এখনও করি। আমি এটা সব সময় মানি পরিশ্রম করলেই সফলতা আসবেই। কথার সাথে কাজে মিল রাখতাম সব সময়। মানের দিকে সব সময় খেয়াল রাখতাম তাই লাখপতির খাতায় নামটা লিখতে পেড়েছি। ৫ মাসে লাখপতি হয়ে গেলাম। সিথী আরও বলেন, আমার মাসে আয় ৩০-৩৫ হাজার টাকা। আমার ব্যবসাটাই অনলাইনে। অফলাইনে সেল নেই। তবে এখন আস্তে আস্তে সবাই জানছে। আমার শুরুটা একটু কঠিন ছিল। কারণ পরিবারের মানুষের কেউ ব্যবসা করেনি কখনো। আমার বাবা সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন সেই সুবাধে আমরাও চাকরিটাকেই পছন্দের তালিকায় রাখি। তবে আমার পরিবার যে ব্যবসা অপছন্দ করেন তা কিন্তু নয়। তবে আমি পারবো কিনা সেটা নিয়ে সবার চিন্তা ছিল। আমি যখন প্রথম ব্যবসার জন্য বিনিয়োগ করি সেই টাকা ছিল আমার প্রিয় মানুষ আমার হাসবেন্ড। অবশ্যই আজ থেকে ১১ মাস আগে তিনি আমার হাসবেন্ড ছিল না! শুধুই প্রিয় মানুষ ছিল! সে আমাকে প্রথমে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। তাকে যখন আমি বলি ব্যবসা করবো প্রথমে সে না করেছিলেন কারণ আমি পারবো কিনা? তারপর সে আমাকে ১০ হাজার টাকা দিতে চায়। আমি বলেছিলাম এত টাকা না অল্প টাকা আগে নেই দেখি শুরুটা কেমন হয়? তখন আমি ৩ হাজার টাকা তার কাছ থেকে চেয়ে নেই। সেই ৩ হাজার টাকা থাকে ১ হাজার টাকা নিয়ে মূলত আমি ব্যবসাটা শুরু করি। ১ হাজার টাকা দিয়ে আমি একটা প্রাইড শাড়ী আর রং-তুলি কিনে শুরু করি উদ্যোক্তা জীবন। এরপর যখন আমার অনেক অর্ডার আসা শুরু হয় তখন আমাকে টাকা দিয়েছে আমার মা ও বড় বোন। মা সব সময় আমার পাশে ছিল। আসলে আমার পরিবারের প্রতিটি মানুষ আমার পাশে আছে। আমার ব্যবসার পিছনে সব থেকে বেশি যে প্রভাবটা ছিল তা হচ্ছে পরিবারের সকলের সাহস। সবাই আমাকে অনেক সাহস দিয়েছে। উইতে পোস্ট করার পর পজিটিভ কমেন্ট গুলো আমাকে সাহস ও অনুপ্রেরণা দিয়েছে। সাথে ভয় গুলো কেটে গেছে। তখন থেকে ব্যবসার প্রতি আমার মনযোগ আরও বেড়ে গেল। সবার প্রথম আমি উইয়ের কথা বলবো। কারণ উই ছাড়া আজকের আমি সম্ভব ছিল না। উইয়ের জন্য আমি নিজের প্রতিভাটা নিজের ভিতর থেকে বের করে আনতে পেড়েছি। আমিও যে কিছু করতে পারব তা শুধুই উইয়ের অবদান। তাছাড়া পরিবারের সবাই আমার পাশে থেকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। আমি প্রচুর পরিশ্রম করি? কারণ আমি আমি স্বপ্ন দেখি একদিন মিলিয়নার হবো। বাবা-মার ৩ মেয়ে বলে যেন তাদের কখনো কষ্ট পেতে না হয়। তাই নিজেকে স্বাবলম্বী করে সারাজীবন তাদের পাশে থাকতে চাই। আমার হাতে আঁকা পণ্য দেশ বিদেশে ছড়িয়ে যাবে। যদিও বর্তমানে কয়েকটি দেশে আমার পণ্য গেছে। আমি চাই ইচ্ছে রঙিন একটি ব্রান্ড হবে। এক নামে সবাই চিনবে ইচ্ছে রঙিনকে । সিথী বলেন, আমার বাবা একজন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন। বর্তমানে (অবসরপ্রাপ্ত)। বাবা-মার ৩ মেয়ের মধ্যে আমি দ্বিতীয়। অনেকের কাছেই আমার বাবা-মার শুনতে হয়েছে ছেলে হয়নি? মেয়ে দিয়ে আর কি ভবিষ্যত হয়? আজ তা আমি বদলে দিয়েছি! আমি আমার বাবা-মার মেয়ে হয়েও ব্যবসা করে লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করছি। বাবা-মার ছেলে নেই তাতে কি আমরা আছি তো। আমার সব সময়ের সাপোর্ট আমার বড় বোন। সেই প্রথম থেকে আমার পাশে আছে। আর একজনের কথা না বললেই নয়! সে হচ্ছে আমার হাসবেন্ড। যে কিনা আমার সাথে আমার কাজের জন্য পরিশ্রম করে গেছে। পণ্য আনা থেকে পারসেল দেওয়া সব কিছুতেই তার সাহায্য আমি পাই। আমি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স শেষ করে বর্তমানে ব্যবসা নিয়েই আছি। সামনে মাষ্টার্স করার ইচ্ছা আছে। টাঙ্গাইল বিন্দুবাসিনী গার্লস স্কুল থেকে এসএসসি, সরকারি কুমুদিনী কলেজ থেকে এইচএসসি, টাঙ্গাইল হাজী আবুল হোসেন ইনস্টিটিউট থেকে অনার্স শেষ করি। সিথী কাজ করছের বর্তমানে সিগনেচার পণ্য ও হ্যান্ডপেইন্টের সব ধরনের পণ্য নিয়ে। সাথে আছে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী তাঁত পণ্য।

Print Friendly and PDF

ফেইসবুকে আমরা