এই মাত্র পাওয়া :

ঢাকা, সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১

ওপারে ভালো থেকো বাবা

বিভাগ : ফিচার প্রকাশের সময় :৭ এপ্রিল, ২০২১ ৭:১৭ : অপরাহ্ণ



ফাহিমা বেগম

বাবা আমাকে শেষবারের কিছু কথা বলেছিলেন। কিন্তু বাবার কথাগুলো ছিল অস্পষ্ট। যার জন্যে বাবার কথাগুলো বুঝতে সক্ষম হয়নি। পাশের ঘর থেকে মা ছুটে এসেছিলেন বাবার কথা শুনে। তিনিও বুঝতে পারেননি বাবার মুখ থেকে বের হওয়া কথাগুলো। আমি নিশ্চিত বাবা আমাকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলেছিলেন। কারণ তখন বাবার শয়নকক্ষে কেউ ছিলেন না। বাবা শয্যাশায়ী ছিলেন। আমার ক্লান্ত দেহটা বাবার পাশে এলিয়ে দিয়েছিলাম। চোখে ছিল ঘুমের ঘোর। প্রায় সময় প্রিয় বাবার পাশে ওইভাবে আশ্রয় নিতাম। বাবার পাশে এইদিনের আশ্রয় ছিল আমার শেষ আশ্রয়। দিন শেষে ৮৫ বছর বয়সে বাবা আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। ২৮ ফেব্রুয়ারি দিনগত রাত সোয়া ১২ টায় (১মার্চ) শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

আমার বাবা হাজি আতাউর রহমান। গ্রামের বাড়ি কানাইঘাট পৌরসভার শিবনগর গ্রামে। আমিসহ ভাই বোনদের উচ্চ শিক্ষার জন্যে আমাদেরকে বসবাস করতে হয় সিলেট শহরে। শহরতলির খাদিম চৌমুহনীস্থ শাহপরাণ উপশহর এলাকায় বাসা। এখানেই বাবা শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। শিয়রে বসে বাবার শেষ প্রয়াণ দেখেছি।

বাবার মৃত্যুর দিনের কথা মনে পড়ে। বাবার যাবতীয় দেখভাল আমি নিজ থেকেই করতাম। রুটিন ওয়ার্কের মতো ছিল বাবার দেখভালের বিষয়টি। সকাল ঘুম থেকে উঠেই বাবার হাত-মুখ ধৌত করিয়ে দেই। দেহের সুগার লেবেল পরীক্ষা করি। এর পর তরল খাবার খাইয়ে দেই। তরল খাবারের মধ্যে থাকতো বিভিন্ন ধরণের জুসসহ অন্যান খাবার। ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালেও বাবাকে তরল খাবার দিয়েছিলাম। দুপুর ১২ টা পর্যন্ত বাবার আশপাশেই ছিলাম। বলতে গেলে দিনের সিংহভাগ সময় বাবার আশপাশে কাটিয়ে দিতাম। ১২ টার দিকে আমার কর্মস্থল মা মনি কিন্ডার গার্টেন স্কুলের উদ্দেশ্যে বের হই। বেলা ২ টা পর্যন্ত স্কুলেই ছিলাম। স্কুল থেকে বের হয়ে ফার্মেসিতে যাই। বাবার জন্যে সাড়ে তিন হাজার টাকার ওষুধ ক্রয় করে বাসায় ফিরি। বাসায় ফিরে নিজকে অনেকটা ক্লান্ত মনে হচ্ছিল। বাবার পাশেই নিজের দেহটাকে এলিয়ে দেই। ঘুমের তন্দ্রা আসতেই বাবার মুখ থেকে কথা বের হয়ে আসে। বাবা অনেকদিন কথা বলেননি। ওইদিন (প্রয়াণের দিন) কথা বলেছিলেন। বাবার কথা বুঝতে না পারার যন্ত্রণা আমাকে হয়তো সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে।

২৮ ফেব্রুয়ারি বাবা অনেকটা সুস্থ ছিলেন। দেহ মনে কোনো ধরণের অস্বাভাবিকতা পরিলক্ষিত হয়নি। রাত প্রায় ১১ টা পর্যন্ত বাবার পাশেই ছিলাম। রাত সাড়ে ১১ টার দিকে বাবা অসুস্থ হলেন। দ্রুত শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। রাত সোয়া ১২ টায় তিনি মাবুদের ডাকে সারা দিয়ে আমাদের ছেড়ে চলে যান। মৃত্যুর সময় বাবার শিয়রের পাশে ছিলাম আমরা সাত ভাই বোন ও মা। বড় আপু ছিলেন শ্বশুর বাড়িতে। দুই ভাই থাকেন প্রবাসে।
ভোররাতে ( ১ মার্চ) বাবার মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়িতে যাই। ওইদিন বাদ জোহর নামাজে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয় বাবাকে। বাবা ডাকা থেকে সারাজীবনের জন্যে বঞ্চিত হয়ে গেলাম। ভালো থেকো বাবা।

বাবা মানে নির্ভরতা । আল্লাহর কাছ থেকে পাওয়া অনেক বড় নিয়ামত আমার বাবা। তাই বাবা নামক এই মানুষটার কথা লিখতে শুরু করলে শেষ হবে না।

আমার বাবার নাম হাজী আতাউর রহমান ওরফে (হাজী সাহেব)। ছোটবেলা থেকেই আমার মনে বাবার অবস্থান ছিলো আকাশের মতোই। বাজারে গেলে কারো দোকানে বাবার কথা বললেই যা চাইতাম দিয়ে দিতেন। একটা ছোট্ট বাচ্চার জীবনে আর কী লাগে! আমার বাড়ি থেকে দূরে বা অপরিচিত কারো সাথে দেখা হলে লোকেরা যখন জানতে চাইতো তোমার বাবার নাম কি? বাবার নাম বলার পর পরই লোকজন সাথে সাথে বলতো ‘ও আচ্ছা তুমি হাজী সাহেবের মেয়ে! আমাদের গ্রাম কিংবা পুরো থানার সালিশি থেকে শুরু করে এমন কোনো ফাংশন নেই যেখানে বাবার অবস্থান ছিলো না। সেই ছোটবেলা থেকেই আমি বাবার পাশে পাশে থাকতাম। আমার বাবা জীবনে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন শুধু মাত্র আমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে। বাবাকে কখনো কাঁদতে দেখিনি। শুধু ঘামতেই দেখেছি।

আমার মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা। আমার ভালো রেজাল্ট বা প্রতিযোগিতায় পুরষ্কৃত হবার পর বাবার মুখে যে হাসি দেখেছি তা কখনো ভুলার নয়। বাবা তুমি তুলে ধরে ছিলে বলেই স্বপ্ন দেখেছি বড় হবার। আর সেই স্বপ্ন নিয়ে আমাকে লক্ষ্যে পৌঁছাতে একমাত্র তোমারই অবদান ছিল বাবা। বাবা তোমার ওই হাত ধরে শুরু হয় আমার লক্ষ্যে পৌঁছার পথ চলা।

ছোটবেলায় আমি যখন হোঁচট খেতাম, বাবা তখন ঠিকই আগলে রাখতেন। পড়ে যেতে দিতেন না। তাহলে আমি কেন বাবাকে আগলে রাখতে পারব না। বাবা যখন বৃদ্ধ হলেন, বাবাকে হাত ধরে হাঁটাতাম। খাওয়াতাম। গোসল করিয়ে দিতাম। মন ভালো থাকার জন্য গল্প করতাম। সারাক্ষণ মাতিয়ে রাখতাম হাসি আনন্দে।

গত মার্চ মাসের ১ তারিখে বাবা আমাদের একা করে দিয়ে পাড়ি জমালেন পরপারে। হয়ত আগে বুঝতে পারিনি বাবা কি জিনিস? তবে এখন বুঝলাম বাবা নামের বটগাছের ছায়া। যার মাথার উপর নেই বাবার ছায়া, তিনিই বুঝেন রোদের তাপ কতটা প্রখর……! বাবা তোমাকে একটিবার দেখার জন্যে হৃদয়টা হাহাকার করে। কেন তুমি চলে গেলে বহুদূরে? বাবা তুমি ছিলে আমার জীবনের সুপার হিরো। হয়তো কখনও মুখ ফুটে বলা হয়ে ওঠেনি “”বাবা তোমাকে অনেক ভালোবাসি””। বাবাই হলো একমাত্র রাজা, যার রাজত্বে সারা জীবন মেয়েরা রাজকন্যা হয়ে থাকে। বাবা দোয়া করি পরপারে তুমি খুব ভালো থাকো। সুখে থাকো। আল্লাহ যেন তোমাকে বেহেশতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন। সবশেষে বলবো পৃথিবীর সকল বাবা মা ভালো থাকুক। সুস্থ থাকুক। আর সন্তানদের কলিজা ঠান্ডা থাকুক।

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক।

Print Friendly and PDF

ফেইসবুকে আমরা