এই মাত্র পাওয়া :

ঢাকা, সোমবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২১

চলে গেলেন ব্রিটেনে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক সৈয়দ আব্দুর রহমান

বিভাগ : কলাম প্রকাশের সময় :৭ জানুয়ারি, ২০২১ ২:৩০ : অপরাহ্ণ

মিলু কাশেম

ব্রিটেনে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও প্রবীণ কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব আমার মামা সৈয়দ আব্দুর রহমান আর নেই। গত ২৯ ডিসেম্বর ভোর রাতে সিলেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। তিনি তিন ছেলে দুই মেয়ে সহ অসংখ্য আত্মিয়স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। গত ২৯ ডিসেম্বর দুপুর ১২টায় সিলেটের শাহী ঈদগাহ ময়দানে ও বাদ আছর তার গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার সৈয়দপুর গ্রামে পৃথক দুটি জানাজা শেষে পারিবারিক গোরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে।

বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী সৈয়দ আব্দুর রহমানে জন্ম ১৯৩১ সালের ২৫ আগস্ট তৎকালীন সিলেট জেলার সুনামগঞ্জ মহকুমার জগন্নাথপুর থানার ঐতিহ্যবাহী সৈয়দপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। তার পিতার নাম সৈয়দ শমসেদ আলী।

১৯৫৭ সালে তিনি প্রথম ব্রিটেনে গমন করেন। বিলেতে তিনি আবাস গড়েন বার্মিংহামের কাছাকাছি কিডিরমিনিস্টার নামক একটি ছোট শহরে। সেখানে আগে থেকেই তার আত্মিয় স্বজনরা বসবাস করতেন। সৈয়দ আব্দুর রহমানের কর্মজীবন শুরু হয় স্টার ফোর্ড নামক একটি স্টিল কোম্পানীতে। পরে উইলসন নামক আরেকটি কোম্পানীতে কাজ করেন। পরবর্তীতে সেই কোম্পানী বন্ধ হয়ে গেলে তার এক চাচার সাথে মিলে শুরু করেন গাড়ীতে করে ফিস এন্ড চিপস বিক্রির ব্যবসা। একদিন নিউজ পেপারে বিজ্ঞাপন দেখে ব্রিটিশ রেলওয়েতে টিকেট কালেক্টর পদে চাকুরীর জন্য আবেদন করেন। তখন তিনি ভাল ইংরেজি জানতেন না। তবে স্মার্টনেস আর হ্যান্ডসাম চেহারার কারণে রেলওয়েতে তার চাকুরী হয়ে যায়। প্রায় দুই বছর তিনি ব্রিটিশ রেলওয়েতে কাজ করেন। পরবর্তিতে তিনি তার ছোট ভাই সৈয়দ আতাউর রহমানকে বিলেতে নিয়ে যান এবং শুরু করেন নিজস্ব পোলট্রি ব্যবসা।

১৯৬৪ সালে বিলেতে দীর্ঘ আইনি লড়াই করে প্রথম হালাল চিকেন ব্যবসা শুরু করেন সৈয়দ আব্দুর রহমান। তিনি বিলেতে হালাল চিকেন ব্যবসার প্রবর্তক। বিলেতের কমিউনিটি উন্নয়ন আন্দোলনে তার রয়েছে অনেক অবদান। অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় এ মানুষটিই প্রথম বাঙালি যিনি ১৯৬৬ সালে ব্রিটেন থেকে নিজের গাড়ী চালিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এসেছিলেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায়ে বিটেনে গুরুত্বপূর্ন
ভূমিকা পালন করেন সৈয়দ আব্দুর রহমান। তিনি ছিলেন ব্রিটেনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। তখন তিনি মিডল্যান্ডস আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি।

বহির্বিশ্বে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে জনমত তৈরি ও আর্থিক সহায়তার জন্য বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত অ্যাকশন কমিটি ফর বাংলাদেশ লিবারেশন মুভমেন্টের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি।

বাংলাদেশের স্বাধিনতা ও পাকিস্তানের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির লক্ষে তিনি প্রবাসীদের কাছ থেকে প্রচুর চাঁদা তুলে প্রবাসী সরকারকে সহযোগীতা করেছিলেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারে সমর্থন আদায়ের লক্ষে বার্মিংহামের তৎকালীন ব্রিটিশ এমপি ডরিশ ফিশারকে সাথে নিয়ে সর্বপ্রথম লন্ডনে ব্রিটিশ হাউস অব কমন্স এ গমনকারী ছয় সদস্যের অন্যতম ছিলেন তিনি।

১৯৭১ সালে বার্মিংহামে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে আয়োজিত সর্বপ্রথম জনসভার মূল সংগঠক ছিলেন তিনি। দেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭২ সালে দেশে এসে ঢাকায় গনভবনে সৈয়দ আব্দুর রহমান তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সাথে দেখা করে তার হাতে তুলে দেন দেশ গঠনের কাজে প্রবাসীদের কাছ থেকে সংগ্রহীত অর্থের চেক।

দেশ প্রেমিক মানবতাবাদি এই মানুষটি সারা জীবন পর্দার আড়ালে থেকে গেছেন। পরিতাপের
বিষয় মুক্তিযুদ্ধে অনন্য ভূমিকা পালনকারী সৈয়দ আব্দুর রহমান মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত কোনো সরকারি সম্মাননা বা স্বীকৃতি পাননি। লজ্জার বিষয় মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন হয়নি তার লাশ।

গত কয়েক বছর আগে ব্রিটিশ তথ্যচিত্র নির্মাতা মাইকেল প্লান বিবিসি টেলিভিশনের জন্য নির্মিত তার “ভূটান টু বাংলা”তথ্যচিত্রে সৈয়দ আব্দুর রহমানকে নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদনে তার জীবনের কিছু দিক তুল ধরে তাকে ব্রিটেনে হালাল ব্যবসার প্রবর্তক হিসাবে উল্লেখ করা করেন।

বহুমুখি প্রতিভার অধিকারী সৈয়দ আব্দুর রহমান আরেকটা পরিচয় তিনি প্রয়াত বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের ঘনিষ্ঠ শহচর ছিলেন। ষাটের দশকে তিনি প্রথম আব্দুল করিমকে বিলেতে নিয়ে গিয়ে বহির্বিশ্বে তার পরিচিতি ঘটান। বাউল সম্রাটের মৃত্যুর আগে শেষবার ও তিনি লন্ডন সফরে ছিলেন শাহ আবদুল করিমের সঙ্গি। শাহ আবদুল করিমের অসংখ্য গান ছিল তার মুখস্ত। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনিও গাইতেন করিমের গান। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি করিম পরিবারের পাশে থেকে তাদের নানাভাবে সহযোগীতা করেছেন।

জীবন সংগ্রামে সফল নানাগুনে গুনান্বিত পরোপকারী মানবতাবাদি এই মানুষটি আর আমাদের মাঝে নেই। আমরা তার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। আল্লাহ্ তাকে জান্নাতবাসি করুন।

লেখক: সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও পর্যটক।

Print Friendly and PDF

ফেইসবুকে আমরা