এই মাত্র পাওয়া :

ঢাকা, সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১

হতাশা ও ক্ষোভে হুমকি-ধমকি প্রদানে লিপ্ত কতিপয় উচহ্লা ভান্তের শিষ্য

দীর্ঘ ২১বছর পর এতিহ্য ফিরে পেল বান্দরবান রাজগুরু বৌদ্ধ বিহার

বিভাগ : এক্সক্লুসিভ প্রকাশের সময় :১৮ মে, ২০২০ ১১:৪৩ : অপরাহ্ণ

জহির রায়হান, বান্দরবান: অবশেষে দীর্ঘ ২১বছর পর শতবছরের এতিহ্যবাহী রাজগুরু বৌদ্ধ বিহার (খিয়ংওয়াক্যং) পরিচালনার দায়িত্বভার পেলেন বোমাং সার্কেলের রাজা। রাজগুরু বৌদ্ধ বিহারে চাবি হস্তান্তর করার মধ্যে দিয়ে শতবছরের প্রথাগত ঐতিহ্য ফিরিয়ে দেয়া হলো বোমাং সার্কেলের রাজাকে। ঘটনাকে বৌদ্ধ ভিক্ষু, নেতৃবৃন্দসহ সচেতন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা স্বাগত জানালেও হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে উচহ্লা ভান্তের কতিপয় শিষ্য ও অনুসারীরা। শুক্রবার ১৫ই মে বান্দরবান বোমাং সার্কেলের ১৭মত রাজা বোমাংগ্রী  উ চ প্রু চৌধুরীর হাতে অনুষ্ঠানিকভাবে রাজগুরু বিহারের চাবি ও মূল্যবান সম্পদের দায়িত্বভার হস্তান্তর করেছে পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্লা। এসময় উপস্থিত ছিলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ সদস্য কেএসমং মারমা, প্রয়াত ১৪তম রাজা মং শৈ প্রু চৌধুরীর ছেলে রাজকুমার মং ঙৈ প্রু চৌধুরী ও রাজকুমার ও হেডম্যান নু মং প্রু চৌধুরী, পার্বত্য ভিক্ষু সংঘের নেতৃবৃন্দ, জেলা বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের প্রতিনিধিরা। এব্যাপারে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ সদস্য কেএসমং মারমা জানান, ঐতিহ্যবাহী গুনসম্পন্ন বুদ্ধমূর্তি সিলগালা ও প্রতœতত্ত¡বিদদের দিয়ে পরীক্ষা করা বিষয়টি সকলের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এই সিদ্ধান্ত ও প্রথাগত নিয়মানুসারে রাজগুরু বিহারের চাবি বোমাং রাজার হাতে হস্তান্তর করা হয়েছে। এব্যাপারে পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্লা বলেন, সকলের অনুরোধক্রমে শ্রদ্ধাভাজন প্রয়াত বৌদ্ধ ধর্মীয়গুরু উচহ্লাভান্তের শবদেহ খৈয়াখালি থেকে বান্দরবানে ফিরে এনে যথাযথ মর্যাদার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করা উদ্যোগ নিয়েছে জেলা পরিষদ। এছাড়াও চুরি যাওয়ার আশংকায় সকলের মতামতের ভিত্তিতে রাজগুরু বিহারের হাজার বছরের পুরোনো বুদ্ধমূর্তিটি সিলগালা ও বয়সকাল নির্ধারণের জন্য প্রতœতত্ত¡বিদদের দিয়ে পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এবং বিহারের চাবি বোমাং রাজার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। প্রাচীনতম ও ঐতিহ্যবাহী গুনসম্পন্ন বুদ্ধমূতিটি চুরি যাওয়ার আশংকায় সিলগালা ও রাজগুরু বিহারে চাবি বোমাং রাজার হাতে হস্তান্তর করার বিষয়ে যমুনা টেলিভিশনের বান্দরবান জেলা প্রতিনিধি বাটিং মারমা জানান, যে সিদ্ধান্তগুলো জেলা পরিষদ নিয়েছে, এটি একটি সময়গোযোগী সিদ্ধান্ত বলে আমি মনে করি। জেলা পরিষদের এই সিদ্ধান্তে আমরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা খুশি ও স্বাগত জানায়। এদিকে বুদ্ধমূতিটি চুরি যাওয়ার আশংকায় সিলগালা ও রাজগুরু বিহারে চাবি বোমাং রাজার হাতে হস্তান্তর করার বিষয়টি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা স্বাগত জানালেও এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে উচহ্লা ভান্তের কতিপয় শিষ্য ও অনুসারীরা। তারা এঘটনায় হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে গন্যমাধ্যম ও ফেইসবুকে বিভিন্ন হুমতি-ধমকি প্রদানসহ ষড়যন্ত্র মূলক কর্মকান্ডে লিপ্ত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পার্বত্য শান্তিচুক্তির আলোকে জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ আইনে উল্লেখ্য রয়েছে, জেলায় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ কোন সংস্থা নিয়ে সাংর্ঘষিক পূর্ণ বিরোধ সৃষ্টি হওয়ার আশংকা তৈরি হলে তার নিরসনে ঐপরিষদগুলো কর্তৃক সমন্বয় সাধণের উদ্যোগ নিতে পারে। উচহ্লা ভান্তে মৃত্যু, শবদেহ ফিরিয়ে এনে সৎকার এবং রাজগুরু বিহার নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ, আঞ্চলিক পািরষদ, পার্বত্য ভিক্ষুসংঘ  এই উদ্যোগটি নিয়েছে বলে সূত্রগুলো জানায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতা ও রাজ পরিবারে এক সদস্য জানান, বর্তমানে রাজগুরু বিহারে সংরক্ষিত থাকা বুদ্ধমূর্তি আসল প্রাচীনতম ও ঐতিহ্যবাহী গুনসম্পন্ন বুদ্ধমূর্তিটি কিনা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে। উচহ্লা ভান্তে রাজগুরু বিহারের বিহারাধ্যক্ষ দায়িত্ব নেয়ার ৪/৫বছর পরে উধাও হয়ে গেছে বলে সকলের মধ্যে এই সন্দেহ সৃষ্টি হয়। তাই প্রতœতত্ত¡বিদদের দিয়ে পরীক্ষা করা হলে আসলে সত্য বের হয়ে আসতে পারে বলে আশঙ্কায় আতংক-উৎকন্ঠায় রয়েছে উচহ্লা ভান্তে শিষ্য ও অনুসারীরা। তাই তারা জেলা পরিষদ, আঞ্চলিক পরিষদ সদস্য, বৌদ্ধ ভিক্ষু ও নেতৃবৃন্দের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভ্রিভান্তি ছড়াতে নানান অপপ্রচারের লিপ্ত রয়েছে। এদিকে বোমাং রাজ পরিবারের একাধিক সদস্যের সাথে আলাপ করে জানা যায়, খিয়ংওয়াক্যং (রাজগুরু বিহার)টি ১৩তম বোমাং রাজার প্রায় ২৪০বছর আগে রাজা ক্য জাইন প্রæ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পঞ্চালাহা (আসাং¤্রাই) বৌদ্ধ মূর্তিটি বুদ্ধের জীবদ্দশায় তৎকালীন আরাকানের রাজা চন্দ্রসূর্যের আমলের তৈরি করা হয়। প্রথাগত আইনে বলা আছে বোমাং রাজাই রাজবিহারে বিহারাধ্যক্ষ নিযুক্ত করা নিয়ম রয়েছে। আরো বলা আছে বিহারাধ্যক্ষ নিয়োগের ঘোষনাপত্রে রাজ পরিবারে সিনিয়র ৯জন সদস্যের স্বাক্ষর যুক্ত অবশ্যই থাকার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু সে প্রথাগত আইন ভেঙ্গে প্রয়াত ১৯৯৯সালের ১৩ই জানুয়ারী নিজস্ব শিষ্য-ভক্তদের নিয়ে জেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান থোয়াইংচপ্রæ মাস্টার গংদের সহযোগিতায় সন্ত্রাসী কায়দায় রাজগুরু বিহার থেকে বিহারাধ্যক্ষ  উঃ আগাদামা ভান্তেকে অপসারণ করেন এবং জোর জবরদস্তি করে উচহ্লা ভান্তে নিজেই রাজগুরু বিহারের বিহারাধ্যক্ষের আসনে বসেছিল। এদিকে বিষয়গুলো নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকের বৌদ্ধধর্মীয় ওয়েব পেজ পঞ্ঞা-প্রজ্ঞায় উচহ্লা ভান্তের কথিত এক শিষ্য ক্ষোভ প্রকাশ করে ও হুমকি দিয়ে করা মন্তব্যে বলেন,  ষড়যন্ত্রকারীদের সাবধান করছি গুরুভান্তের প্রতিটি শিষ্য-শিষ্যারা হচ্ছে একেকটি পিলার। গুরুভান্তে নেই বলে তার শিষ্যদের দূর্বল ভাববেন না। অনেক মৈত্রী দিয়েছি, অনেক সহ্য করেছি। আর নয়। সামনে আর মৈত্রী হবে না। অপরদিকে রাজগুরু বিহার পরিচালনা কমিটির সভাপতি থোয়াইংচপ্রæ মাস্টার ১৪এপ্রিল ও ১৯এপ্রিল অনুষ্ঠিত বৈঠকে জেলা পরিষদকে বিহারে যাবতীয় সম্পদের তালিকা অবহিত করতে গিয়ে আশংকা প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশে ৩টি অতিপুরানো গুণসম্পন্ন বুদ্ধমুর্তির মধ্যে ১টি রাজগুরু বিহারে সংরক্ষিত ছিল। তার জানামতে যুগ পরম্পরায় দানকৃত গুণসম্পন্ন বুদ্ধমূর্তি, স্বর্ণ, রৌপ্য অলংকারাদি বিহারে থাকার কথা। তিনি (থোয়াইংচপ্রæ মাস্টার) সেগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষিত রয়েছে কিনা জেলা পরিষদ, জেলা প্রশাসন ও ক্যাং কমিটির প্রতিনিধি সমন্বয়ে গঠিত কমিটিকে বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য বৈঠকে প্রস্তাব দেন। এই প্রেক্ষিতে পার্বত্য জেলা পরিষদ সকলের মতামতের ভিত্তিতে হাজার বছরের পুরোনো বুদ্ধমূর্তিটি সিলগালা ও বয়সকাল নির্ধারণের জন্য প্রতœতাত্তি¡কদের দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। এছাড়াও বর্তমানে বিহারের কি কি সম্পদ রয়েছে সেসবের তালিকা তৈরি করেছে এবং বিহারের চাবি যথাযথ কর্তৃপক্ষ (বোমাং রাজা) কাছে হস্তান্তর করেন।

Print Friendly and PDF

ফেইসবুকে আমরা