এই মাত্র পাওয়া :

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১

শতবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

নবাব স্যার সলিমুল্লাহ ও বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গ – ৭ম পর্ব

বিভাগ : ফিচার প্রকাশের সময় :২১ জানুয়ারি, ২০২১ ৫:৫৯ : অপরাহ্ণ




মোঃ আব্দুল মালিক:

রবীন্দ্র সাহিত্যে মুসলমান প্রসঙ্গঃ রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এক মস্ত বড় অভিযোগ তাঁর রচনাবলীতে মুসলমান চরিত্রের সংখ্যা কম। রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ সত্য। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, সাহিত্য একটি সৃষ্টিকর্ম, হিসাব করে, আটঘাট বেঁধে, সাহিত্য সৃষ্টি হয় না। সাহিত্য রচিত হয়, রচনা করা যায় না। রবীন্দ্রনাথ যে সমাজকে চিনতেন, জানতেন, সেই সমাজকেই তিনি তাঁর সাহিত্যের উপজীব্য করছেন। একজন শেক্সপিয়ার ইংরেজদের নিয়ে লিখবেন কিংবা জার্মানদের নিয়ে লিখবেন একজন গুন্টার গ্রাস-এটাই স্বাভাবিক। বাঙালি মুসলমানরা গত এক শতক ধরে লিখছেন। এ পর্যন্ত কতজন মুসলমান লেখক, বাঙালি হিন্দুর জীবন তুলে ধরছেন তাঁদের রচনায় ? নিন্দুকরা কাজী নজরুল ইসলামকে উদাহরণ হিসেবে সামনে নিয়ে আসে। কিন্তু শ্যামা সংগীত রচনা করায় তাঁকে তখন তারা নাস্তিক, মুরতাদ ইত্যাদি অভিধায় অভিহিত করতে কার্পণ্য করে নি। তবে রবীন্দ্রনাথ যত কম মুসলমান চরিত্র অঙ্কন করে থাকুন না কেন, কোন উপন্যাস বা ছোটগল্পে মুসলমানকে তিনি ছোট করে দেখান নি।

বর্ণহিন্দুরা বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে ছিলেন, তাই তারা মুসলমান ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের বিরোধিতা করেছেন। একটা সময় পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথও বঙ্গভঙ্গের পক্ষে ছিলেন না, এ কথা সত্য। তার মানে এই নয়, মুসলমানদের প্রতি তাঁর মনোভাব বর্ণহিন্দুদের মতো ছিল। সব বর্ণহিন্দুই মুসলমান বিদ্বেষী ছিলেন না। অন্তত রবীন্দ্রনাথের লেখা পড়ে তাই মনে হয়।

বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন সময় সওগাত, মুসলেম ভারত, নওরোজ, মোয়াজ্জিন, মোহাম্মদী, বুলবুল, প্রবাসীসহ মুসলমান সম্পাদিত অনেক পত্রিকায় লেখালেখি করছেন। সেই সূত্রে ঐ সময়ের অনেক বিখ্যাত কবি সাহিত্যিক ও সম্পাদকের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরী হয়। তিনি মুসলমান সম্পাদিত নতুন পত্রিকা প্রকাশ উপলক্ষে আর্শিবাণী কবিতাও লিখেছেন। ১৯২২ ও ১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ কাজী নজরুল ইসলামের ধূমকেতুর জন্য লিখেছেন-
কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু
আয় চলে আয়, রে ধূমকেতু,
আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু দুর্দ্দিনের এই দুর্র্গশিরে
উড়িয়ে দে তোর বিজয়-কেতন!
অলক্ষণের তিলক রেখা
রাতের ভালে হোক্ না লেখা,
জাগিয়ে দেরে চমক্ মেরে’
আছে যারা অর্দ্ধচেতন!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কাজী নজরুল ইসলামকে উৎসর্গ করেছেন ‘বসন্ত’ নাটিকা, নজরুল কারাগারে অনশনকালে উদ্বিগ্ন রবীন্দ্রনাথ তাঁর অনশন ভাঙ্গাবার জন্য টেলিগ্রাম করেছেন। এছাড়া তিনি কাজী নজরুল ইসলাম ও জসীমউদ্দিনকে শান্তিনিকেতনে যোগ দিতেও আহ্বান জানিয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথের সাথে চিঠিপত্রে যোগাযোগ ছিল অনেক মুসলমান কবি-লেখকের। রবীন্দ্রনাথ চিঠি লিখেছেন কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লা সহ খ্যাত-অখ্যাত অনেকের কাছেই। চিঠিগুলো পাঠ করলে জানা যায় বাংলা ভাষায় আরবি- ফারসি শব্দের ব্যবহার, আঞ্চলিক/উপভাষার প্রয়োগ সম্পর্কে কবির চিন্তা। স্পষ্ট হয়ে ওঠে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যকার সাম্প্রদায়িক সমস্যা, দ্বন্দ্ব ও সম্প্রীতি সম্পর্কে কবির উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা।

ঠাকুরবাড়ির ‘ভারতী’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ কায়কোবাদের ‘কুসুমকানন’ কাব্য সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করেছেন; প্রকাশ করেছেন মীর মোশাররফ হোসেনের ‘গো-জীবন’, ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’ ও ‘বিষাদ সিন্ধু’র সংক্ষিপ্ত সমালোচনা। এছাড়া তিনি কয়েকজন মুসলিম লেখকের বইয়ের উপর প্রবন্ধ ও ভূমিকা লিখেছেন।

হযরত মোহাম্মদ (স) এর জন্মদিন উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ একবার বাণী পাঠিয়েছন স্যার আব্দুল্লাহ সোহরাওয়ার্দীকে। ২৫ জুন ১৯৩৪ বাণীটি প্রচারিত হয় আকাশবাণীতে।

রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে, শেখ সাদীর সমাধিতে, তেহরান ও বাগদাদের জনসভায় ভাষণ দিয়েছেন। এছাড়া কামাল আতাতুর্কের মৃত্যুতে, প্রগতি লেখক সম্মেলনে, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রথম বার্ষিক স্মরণ সভায় তিনি ভাষণ প্রেরণ করেন। বিভিন্ন উপলক্ষে মুসলমানদের সাথে সম্পর্কিত কবির অনেক বিবৃতি, প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদ রয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রবন্ধের দিকে তাকালে দেখা যাবে ৩০টির বেশি প্রবন্ধে হিন্দু মুসলমান সম্পর্ক বিষয়ে তাঁর কোন না কোন বক্তব্য আছে। রবীন্দ্রনাথের সাথে মুসলমান শিক্ষিত মধ্য ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। এর প্রমাণ পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথকে লেখা মুসলমান কবিদের কবিতা এবং বিভিন্ন চিঠি থেকে। কবির সান্নিধ্যে আসা জসীম উদ্দীন, আবুল ফজল, সৈয়দ মুজতবা আলী, বন্দে আলী মিয়া, সুফিয়া কামাল, বিজ্ঞানী কুদরত-ই-খুদা, আব্দুল কাদির, কাজী আব্দুল ওদুদ, আবুল হোসেনসহ বিভিন্ন মুসলমান লেখক ও ব্যক্তি তাঁর সম্পর্কে অনেক স্মৃতিচারণমূলক লেখা লিখেছেন।

রবীন্দ্রনাথকে লেখা বিভিন্ন চিঠি ও স্মৃতিচারণ পাঠ করলে জানা যায় কবির সঙ্গে তাঁদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্পর্কের কথা। রবীন্দ্রনাথের কাছে কেউ গেছেন ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধানে, সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে সহযোগিতা, রচিত গ্রন্থাবলি সম্পর্কে মতামত ও গ্রন্থ প্রকাশে কবির সহযোগিতা লাভের জন্য। আবার কেউ গেছেন কবির স্নেহাশিষ লাভ ও স্বাক্ষর সংগ্রহের জন্য। অবাক ব্যাপার হলো সাড়ে পাঁচ বছর বয়সী মামুন, স্কুল ছাত্রী জেব উন নেছা, মাদ্রাসা ছাত্রী আমিনা মোজহার, স্কুল ছাত্র ফেরদৌস খান থেকে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, আগা খান, তৎকালীন ইরানের বাদশা, শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক সহ সমাজের নানা স্তরের মুসলমানের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যোগাযোগ ও সম্পর্ক ছিল।

রবীন্দ্রনাথ কোন বিশেষ জাতিগোষ্ঠীর জন্য লেখেন নি বা কোন বিশেষ জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে তাঁর লেখনী সীমাবদ্ধ রাখেন নি। তিনি লিখেছেন বিশ^বাসীর জন্য। রচনা করেছেন সর্বজনীন সাহিত্য। যেমন ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতায় রাজা ও প্রজার মধ্যে কথোপকথন শুরু হয়েছে এভাবে-

‘বিঘে দুই ছিল মোর ভুঁই, আর সব গেছে ঋণে।
বাবু বলিলেন, বুঝেছ উপেন এ জমি লইব কিনে।’
এ কবিতার উপসংহার হয়েছে-
‘এ জগতে হায়, সেই বেশী চায়, আছে যার ভুরি ভুরি,
রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙ্গালের ধন চুরি।’
অথবা ‘যেতে নাহি দিব’ কবিতায় সরকারি কর্মচারী পিতা ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরে যাবার সময় ছোট মেয়ের কাছ থেকে বিদায় নিতে গেলে মেয়ে তাকে বিদায় দিবে না।
কবিতার ভাষায়-
‘কহিনু যখন ‘মাগো’, আসি, সে কহিল বিষন্ন-নয়ন ম্লান মুখে,
যেতে আমি দিব না তোমায়।’
তারপর কবি চলে গেলেন-
‘এ অনন্ত চরাচরে স্বর্গ মর্ত চেয়ে,
সবচেয়ে পুরাতন কথা, সবচেয়ে গভীর ক্রন্দন
‘যেতে নাহি দিব’ হায়, তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়।’
শুরু ব্যক্তিকেন্দ্রিক আর শেষ সর্বজনীন। এটিই হচ্ছে রবীন্দ্র সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
রবীন্দ্রনাথের লেখায় শুধু মুসলিম চরিত্র নয়, মুসলমানের প্রধান ধর্মগ্রন্থ কুরআন ও হাদীসের বিষয়বস্তু নিয়েও লিখা আছে। যেমন: ‘ন্যায়দণ্ড’ কবিতা-
‘তোমার ন্যায়ের দণ্ড প্রত্যেকের করে,
অর্পণ করেছ নিজে প্রত্যেকের ’পরে।’

……………….
‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে,
তব ঘৃণা যেন তারে তৃণ সম দহে।’

পবিত্র কুরআন ও হাদীস অনুযায়ী আল্লাহ মানুষকে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে এই পৃথিবীতে যেজন্য প্রেরণ করেছেন, তাঁর মধ্যে অন্যায়, অবিচার, অনিয়ম দূর করে ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা করাই অন্যতম। অন্যায়কারী হচ্ছে জালিম বা জুলুমবাজ। আর যার উপর জুলুম করা হয় সে হচ্ছে মুজলুম। এ সম্পর্কে সূরা শূরার ৪১ নং আয়াতে আছে ‘আল্লাহ-জালেম লোকদের পছন্দ করেন না, আর যেসব লোক জুলুমের প্রতিশোধ নিবে তাঁদেরকে কোনরূপ তিরস্কার করা হবে না।’ এরকম আরো আয়াত আছে। ঈমানের সর্বোচ্চ স্তর হচ্ছে অন্যায় অনিয়মকে শক্তি দিয়ে প্রতিহত করা। সর্ব নিম্ন স্তর হচ্ছে মনে মনে ঘৃণা করা। বুখারী হাদীস নং-১৯৪,১৪৯৬ মুসলিম হাদীস নং—২৬১৩,৬৭৩৭ এ জালিম ও জুলুম সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ আছে।

হিন্দু সমাজের তুলনায় মুসলমান সমাজের, হিন্দু ধর্মের তুলনায় ইসলাম ধর্মের যা কিছু ভালো তা নিজের রচনায় তুলে ধরতে কার্পণ্য করেননি রবীন্দ্রনাথ। প্রয়োজনে ইসলামের আদর্শ কিংবা নবী মুহম্মদ (স) আচরণের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মুসলমানদের গঠনমূলক সমালোচনাও করেছেন, তাদের মনে সাহস সঞ্চারের চেষ্টা করেছেন।

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে মুসলমানরা হিন্দুদের সমর্থন না করার জন্য রবীন্দ্রনাথ বরং হিন্দুদেরকে দোষ দিয়েছেন। যেমনঃ ১) ‘নিজের ধর্মের নামে পশু হত্যা করিব, অথচ অন্যের ধর্মের নামে পশু হত্যা করিলেই নরহত্যার আয়োজন করিতে থাকিবো, ইহাকে অত্যাচার ছাড়া আর কোন নাম দেওয়া যায় না।’ (প্রবন্ধ-ছোট ও বড়) ২) ‘বঙ্গবিচ্ছেদ ব্যাপারটা আমাদের অন্নবস্ত্রে হাত দেয় নাই, আমাদের হৃদয়ে আঘাত করিয়াছিল। সেই হৃদয়টা যতদূর পর্যন্ত অখণ্ড, ততদূর পর্যন্ত তাহার বেদনা অপরিচ্ছন্ন ছিল। বাংলার মুসলমান যে এই বেদনায় আমাদের সঙ্গে এক হয় নাই, তাহার কারণ তাহাদের সঙ্গে আমরা কোনদিন হৃদয়কে এক হইতে দিই নাই।’ (প্রবন্ধ-লোকহিত)

‘গোরা’ উপন্যাসের নায়ক গোরা, ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসের নায়ক নিখিলেশ মুসলমানদের প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতো, তাদের ভালো চাইতো।“পল্লীর মধ্যে বিচরণ করিয়া গোরা ইহাও দেখিয়াছে, মুসলমানদের মধ্যে সেই জিনিসটি আছে যাহা অবলম্বন করিয়া তাহাদিগকে এক করিয়া দাঁড় করানোা যায়। গোরা লক্ষ্য করিয়া দেখিয়াছে গ্রামে কোনা আপদ বিপদ হইলে মুসলমানেরা কেমন নিবিড়ভাবে পরস্পরের পাশের্^ আসিয়া সমবেত হয় হিন্দুরা এমন হয় না। … ধর্মের দ্বারা মুসলমান এক, কেবল আচারের দ্বারা নহে। এক দিকে যেমন আচারের বন্ধন তাহাদের সমস্ত কর্মকে অনর্থক বাঁধিয়া রাখে নাই, অন্যদিকে তেমনি ধর্মের বন্ধন তাহাদের মধ্যে একান্ত ঘনিষ্ঠ। তাহারা সকলে মিলিয়া এমন একটি জিনিসকে গ্রহণ করিয়াছে যাহা ‘না’-মাত্র নহে, যাহা ‘হ্যাঁ’, যাহা ঋণাত্মক নহে, যাহা ধনাত্মক; যাহার জন্য মানুষ এক আহ্বানে এক মুহূর্তে একসঙ্গে দাঁড়াইয়া প্রাণ বিসর্জন করিতে পারে।” (গোরা)

“গোরা বলিল, ‘কিন্তু বাবা, একটা কথা তোমাকে বলি, তুমি কথাটি না বলে যে অপমান সহ্য করলে আল্লা এজন্য তোমাকে মাফ করবে না।”মুসলমান কহিল,-“যে দোষী আল্লা তাকেই শাস্তি দেবেন, আমাকে কেন দেবেন।” গোরা কহিল-‘যে অন্যায় সহ্য করে সেও দোষী, কেননা সে জগতে অন্যায়ের সৃষ্টি করে। আমার কথা বুঝবে না, তবু মনে রেখো, ভালমানুষি ধর্ম নয়, তাতে দুষ্ট মানুষকে বাড়িয়ে তোলে। তোমাদের মুহম্মদ সে কথা বুঝতেন, তাই তিনি ভালো মানুষ সেজে ধর্ম প্রচার করেন নি।’

‘ভারতবর্ষের কল্যাণ যদি চাই তাহলে হিন্দু-মুসলমানে কেবল যে মিলিত হতে হবে তা নয়, সমকক্ষ হতে হবে। সেই সমকক্ষতা তাল-ঠেকা পালোয়ানির ব্যক্তিগত সমকক্ষতা নয়, উভয় পক্ষের সামাজিক শক্তির সমকক্ষতা।’ (কালান্তর)

‘আমি এক ইংরেজিনবিশের কথা জানতেম, হোটেলের খানার প্রতি তাঁর খুব লোভ ছিল। তিনি আর সমস্তই রুচিপূর্বক আহার করতেন, কেবল গ্রেট-ইস্টার্ণের ভাতটা বাদ দিতেন, বলতেন, মুসলমানের রান্না ভাতটা কিছুতেই মুখে উঠতে চায় না। যে সংস্কারগত কারণে ভাত খেতে বাধে সেই সংস্কারগত কারণেই মুসলমানের সঙ্গে ভালো করে মিশতে তার বাধবে।’ (কালান্তর)

একেবারে শেষ বয়সে রবীন্দ্রনাথ এক মুসলমান পাচক রেখেছিলেন, নাম গেদু মিয়া, বাড়ি সরাইল। বৃদ্ধ বয়সে এই গেদু মিয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ চাইতেন, মুসলিম সম্প্রদায় শিক্ষিত হয়ে এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক উন্নতি করে হিন্দুদের সমকক্ষ হয়ে উঠুক। হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সময় গেদুকে তিনি বলেছেন সাবধানে থাকতে। ‘মানুষে মানুষে প্রভেদ আমি করি না গেদু, কিন্তু হিন্দু আর মুসলমানেরা পাগল হয়ে গেছে। আমি সব ধর্মের পুস্তক পড়েছি, সেখানে শান্তির কথা আছে, হানাহানির কথা নেই।’ বিদায়কালে তিনি গেদুকে বলেছিলেন ‘গেদু, আমার তো সময় শেষ, তাই তোমাকে বিদায় দিতে হচ্ছে। তোমার যখন ছেলে মেয়ে হবে, তুমি তাদের শিক্ষিত করে গড়ে তোল।’ শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক এর উপর রবীন্দ্রনাথের অনেক আশা ছিল এটাও গেদুই জানিয়েছেন। শেরে বাংলা ছিলেন জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের অন্যতম নেতা। অথচ জমিদার রবীন্দ্রনাথ তাকেই পছন্দ করেছেন। তাই বলা যায় রবীন্দ্রনাথ মুসলিম বিদ্বেষী ছিলেন না। বরং ইসলাম ধর্মের অনেক কিছুই তাঁর সাহিত্যের বিষয়বস্তু ছিল।

পাদটীকাঃ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় নবাব স্যার সলিমুল্লা ৬০০ একর ভূমিদানসহ অনেক অবদান রেখেছেন। তা সত্ত্বেও বর্তমানে বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে যথাযথ মূল্যায়ন করছে না। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রচন্ড বিরোধীতা করা সত্ত্বেও তাঁর জন্ম ও মৃত্যু দিবস ইত্যাদি ঘটা করে পালন করা হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব দেখে খুবই খারাপ লাগে তাই সত্য আন্বেষনে ব্রতী হই। সীমিত জ্ঞানে যতটুকু আয়ত্ব করতে ও বুঝতে পেরেছি তা গণমাধ্যমে প্রকাশ করেছি। আমার এই অন্বেষণ একান্ত আমার। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারনে যথেষ্ট নয় বিধায় সর্ব সাধারণের জন্য নির্ভরযোগ্য বলার দৃষ্টতা আমার নেই। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নানা গবেষণামূলক গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছেন। সে সব গ্রন্থে উল্লিখিত বিতর্কিত বিষয়ের বস্তুনিষ্ঠ সমাধান কাম্য। বিষয়টি যেহেতু ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে তাই বিশ^বিদ্যালয়ের উচিত এই বিতর্ক নিরসনে এগিয়ে আসা।

তথ্যসূত্র-
১। ব্রিটিশ আমলে বাংলার মুসলিম শিক্ষা সমস্যা ও প্রসার-মোঃ আব্দুল্লা আল মাসুম।
২। ইতিহাসের আলোকে আমাদের শিক্ষার ঐতিহ্য ও প্রকৃতি-অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আলমগীর।
৩। ভারতের মুসলমান ও স্বাধীনতা আন্দোলন-মোহাম্মদ ইনাম উল হক।
৪। রবীন্দ্রনাথ ও মুসলিম সমাজ-ভূঁইয়া ইকবাল।
৫। সোনারতরী-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৬। নৈবদ্য-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৭। চিত্রা-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৮। গোরা-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৯। কালান্তর-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
১০। ঘরে বাইরে-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
১১। গুগল, উইকিপিডিয়া।

লেখক: শিক্ষক ও কলামিস্ট।

Print Friendly and PDF

ফেইসবুকে আমরা