এই মাত্র পাওয়া :

ঢাকা, সোমবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২১

বলকানের বিস্ময়- দানিয়ুব সুন্দরী বুদাপেস্ট : মিলু কাশেম

বিভাগ : বিনোদন প্রকাশের সময় :৬ ডিসেম্বর, ২০২০ ১১:২৩ : অপরাহ্ণ


নিজস্ব প্রতিবেদক :


মধ্য ইউরোপের বলকান উপত্যকার সুন্দর দেশ হাঙ্গেরী। আর সেই চমৎকার দেশটির অনিন্দ্য সুন্দর রাজধানী শহর বুদাপেস্ট। হাঙ্গেরিয়ান ভাষায় বুদাপেস্টকে বলা হয় বুদাপেশৎ। ইউরোপে আমার দেখা নগরীগুলোর মধ্যে বুদাপেস্ট আমার প্রিয় শহর। প্যারিসের পরেই এই নগরীর আলো বাতাস আমাকে ভীষন টানে। তিন দশক আগে এই স্বপ্ন নগরী দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। আজও বুদাপেস্টের অনেক স্মৃতি আমাকে হাতছানিতে ডাকে।

দানিয়ুব নদী তীরের এই শহরকে দানিয়ুব সুন্দরী বলেও অভিহিত করা হয়। আসলে বুদাপেস্ট দানিয়ুব নদীর তুই তীরের দুই শহর বুদা এবং পেস্ট এর মিলিত নাম। দানিয়ুব নদীর পশ্চিম পাড়ের পাহাড়ী শহর বুদা আর পূর্ব পাড়ের সমতল শহর পেস্ট। এক সময় দুটো আলাদা শহর ছিল। আজ থেকে ১৪৭ বছর আগে ১৮৭৩ সালের ১৭ নভেম্বর বুদা আর পেস্ট সংযুক্ত হয়ে বুদাপেস্ট নগরীর গোড়া পত্তন হয়। দানিয়ুব নদীতে চেইন ব্রিজ নামক একটি ঐতিহাসিক সেতুর মাধ্যমে বুদা এবং পেস্ট প্রথম যুক্ত হয়। এখন মার্গারেট ব্রিজ অপার্ড ব্রিজ লায়ন ব্রিজ সহ ৮টি চমৎকার ব্রিজ শোভা বাড়িয়েছে দানিয়ুব নদী তীরের এই অনিন্দ্য সুন্দর বুদাপেস্ট এর।

বুদাপেস্ট ইউরোপের অন্যতম সুন্দর শহর। প্যারিসের সাথে এই নগরীর অনেক মিল রয়েছে। যে কারনে বুদাপেস্টকে পূর্বের প্যারিস বলা হয়।

দানিয়ুব নদী বুদাপেস্টকে ভাগ করে উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়েছে। নদীর পূর্ব তীরে
পেস্ট আর পশ্চিমে বুদা অংশের অব¯’ান। চমৎকার ¯’াপত্য কলার শহর বুদাপেস্ট। এক সময় অটোমান সাম্রাজ্যের অধিনে ১৫০ বছর শাসিত হয় হাঙ্গেরী। তাই বুদাপেস্ট জুড়ে ¯’াপত্য কলায় একটা তুর্কি ছোঁয়া দেখতে পাওয়া যায়। তা ছাড়া সারা শহর জুড়ে দালান বাড়ীর নকশাতে বিভিন্ন সময়ের প্রতিফলন রয়েছে।

বুদাপেস্ট জুড়ে রয়েছে অনেক ঐতিহাসিক দর্শনীয় ¯’ান। এর মধ্যে আছে দানিয়ুব নদীর শান বাঁধানো তীর, বুদা প্রসাদ,আন্দ্রেসি এভেনিউ, হিরোস স্কয়ার, দহানী স্ট্রিট, কেলেতি রেল স্টেশন, মিলেনিয়াম পাতাল রেলপথ ইত্যাদি। মিলেনিয়াম পৃথিবীর ২য় প্রাচিন পাতাল রেলপথ। আর মিলেনিয়াম রেল স্টেশন টি পৃথিবীর বড় স্টেশন গুলোর অন্যতম।

পেস্ট অংশে দানিয়ুব নদীর পূর্ব পাড়ে রয়েছে হাঙ্গেরিয়ান পার্লামেন্ট ভবন। এটি এক আশ্চর্য্য সুন্দর ¯’াপনা। অনিন্দ্য সুন্দর এই ভবনটি পৃথিবীর ৩য় বৃহত্তম পার্লামেন্ট হাউস।

হাঙ্গরিয়ান রাজ্যের এক হাজার বছর পূর্তিতে ১৮৯৬ সালে নির্মিত হয় এই ভবনটি।পার্লামেন্ট হাউসের সব আসবাব পত্র কাঠের তৈরী।ভবনটির মুল অধিবেশন কক্ষসহ সবখানে ঝুলানো রয়েছে হাঙ্গে রীর সব পেশার শ্রমজীবি মানুষের ছোট ছোট প্রতিকি মূর্তি। যাতে জনগণের ভোটে নির্বাচিত আইন প্রনেতারা সংসদে গিয়ে ভুলে না যান সাধারণ মানুষের কথা। তাছাড়া অনেক ঐতিহাসিক জিনিষ সংরক্ষিত আছে পার্লামেন্ট হাউসে। বুদাপেস্ট ভ্রমনকারী পর্যটকদের জন্য এটা সেরা আকর্ষণ। নদী তীরের অব¯’ান আরো আকর্ষণীয় করেছে এই ভবনটিকে। দানিয়ুবের পশ্চিম পাড়ে দাড়িয়ে পর্যটকরা পার্লামেন্ট হাউসের ছবি তুলেন আর উপভোগ করেন এর মোহনীয় রূপ।

বুদা এবং পেস্টকে সংযোগকারী প্রথম সেতু হলো চেইন ব্রিজ। যা এখন একটি ঐতিহাসিক ¯’াপনা। মোট ৮ টি দৃষ্টিনন্দন সেতু মিলন ঘটিয়েছে বুদা আর পেস্টের।

বুদাপেস্ট এর সেরা আকর্ষণ ওল্ড টাউন পৃথিবীর সব বিখ্যাত নগরীর পুরাতন অংশ পর্যটকদের টানে। ওল্ড টাউনে গেলে জানা যায় সে দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য আর পরিচয় ঘটে শিল্প সংস্কিতির সাথে। বুদাপেস্টের বুদা অংশ পাহাড় ঘেরা প্রাচিন ঐতিহাসিক অংশ। পেস্ট সমতল এবং আধুনিক। আর এই পেস্ট হ”েছ হাঙ্গেরীর রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু। আর বুদা অংশে রয়েছে বিখ্যাত ওল্ড টাউন।

বুদা ওল্ড টাউনের সেরা আকর্ষণ পুরাতন রাজা বাদশাহদের বাস¯’ান। রয়েছে বুদা ক্যাসেল অনেক বিখ্যাত পুরাতন গীর্জা আছে সিনাগগও। বুদা দূর্গ বুদাপেস্ট এর অন্যতম ঐতিহাসিক ¯’াপনা। এই দূর্গের পরতে পরতে রয়েছে ইতিহাসের গন্ধ। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজাদের তৈরী ¯’াপনাগুলোও মুগ্ধ করে পর্যটকদের।

পুরাতন শহরের সেইন্ট বাসিলিয়া অদ্ভুত সুন্দর দর্শনীয় ¯’ান । সমস্ত এলাকা জুড়ে কয়েক শত বছরের পুরাতন ভবন। আলো আধারি রেস্তোরা কফি শপ পাব নাইট ক্লাব পিয়ানো ভায়োলিনের সুর এক অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ। এখানে দিনরাত পর্যটকদের আনাগোনা ভীড় লেগে আছে। শহরেরএই অংশটা ইউনেসকো ঘোষিত ওয়াল্ড হেরিটেজ।

হিরোস স্কয়ার বুদাপেস্টের অন্যতম আকর্ষন।এর চারপাশে রয়েছে ইতিহাস ঐতিহ্যের ছড়াছড়ি। জাদুকর, চারুকলা, ২য় বিশ্বযুদ্বের স্মৃতি,অর্কেস্ট্রা হল, থিয়েটার হল থেকে শুরু করে কি নেই এখানে। এর পাশেই আছে বিখাত আন্দ্রেসি এভিনিউ।যারা প্যারিস দেখেছেন তাদের কাছে মনে হবে প্যারিসের কোনো রাস্তা। মাঝখানে আইল্যান্ড চওড়া রাজপথ ফুটপাতের পাশে বাহারী ফুলের দোকন। আন্দ্রেসির পাশেই ঐতিহাসিক দোহানী স্ট্রিট। শতশত বছরের পুরনো ভবন, পাশাপাশি গীর্জা সিনাগগের অব¯’ান। পথের দু’পাশে ক্যাফে রেস্তোরাঁ বিপনী বিতান। রাতদিন মানুষের ভীড় লেগেই থাকে।

দানিয়ুবের পশ্চিম পাড়ের বুদা শহরের পাহাড়ী এবং ঐতিহাসিক অংশ। পূর্ব পাড়ের পেস্ট সমতল এবং আধুনিক। বুদাতে রয়েছে পুরনো রাজা বাদশাদের বাড়ীঘর, বুদা ক্যাসেল, মাটিয়াস গীর্জা, জেলেদের দূর্গ সহ অসংখ্য ঐতেহাসিক ¯’াপনা।

বুদাপেস্ট বলকান অঞ্চলের সবচেয়ে ইতিহাস ঐতিহ্য মন্ডিত সুন্দর আকর্ষণীয় শহর। বুদাপেস্টের অন্যতম আকর্ষণ বুদা অংশের কেলেতি রেল স্টেশন। পূর্ব ইউরোপের সবচেয়ে প্রাচিন প্রায় দুইশ’ বছরের পুরনো সুন্দর এই স্টেশনটি চমৎকার গোছানো। এর নির্মানশৈলীতেও আছে বিশেষত্ব। স্টেশনটির গঠন এমনই যে ছাদের উপরের অংশ পুরোটাই খোলামেলা। সূর্যের আলোতে স্টেশনের ভেতর সারাদিন আলোকিত থাকে। ১৯৩০ সালে বুদাপেস্টে প্রথম ট্যাক্সি সার্ভিস চালু হয়। সেই তিরিশের দশকেই বুদাপেস্টে টিলিফোনে টেক্সি ডাকা যেত। যা ছিল সারা বিশ্বে প্রথম।
সমতল পেস্ট শহরের শেষ প্রান্তে রয়েছে সিতাডেল পাহাড়। পাহাড়ের উপর থেকে দেখা যায় বুদা ক্যাসেল ও পুরো পেস্ট শহর। শহরের প্রতিটি বাড়ীর ছাদ লাল টালির। বিল্ডিংয়ের ফাঁক দিয়ে দেখা যায় সবুজ প্রকৃতি গাছপালা সে এক অপূর্ব মনোমুগ্বকর দৃশ্য। পেস্ট চমৎকার সাজানো গোছানো একটা ছোট সুন্দর শহর।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এসেছিলেন এই অনিন্দ্য সুন্দর বুদাপেস্ট শহরে। তার স্মৃতি সংরক্ষিত আছে পেস্টের হোটেল গ্যালায়েতে। আছে রবী ঠাকুরের স্মৃতি ধন্য বালাতন লেক।

হাঙ্গেরী বলকান দেশগুলোর মধ্যে প্রথম ইউরোপীয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশ। আর বুদাপেস্ট হ”েছ ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের ৮ম বৃহত্তম আর অন্যতম সুন্দর পরি”ছন্ন শহর। প্রায় ১৮ লাখ জনসংখ্যার এই শহরটিতে প্রতি বছর প্রায় ৫০ লাখ পর্যটক আসেন। বুদাপেস্টে পর্যটকদের জন্য রয়েছে অনেক ঐতিহ্য মন্ডিত ক্যাফে রেস্তোরা। সুস্বাদু হাঙ্গরিয়ান খাবারের পাশাপাশি আছে বিখ্যাত কয়েকটি ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট ও। তার মধ্যে অন্যতম হলো তাজমহল, ইনডিগো,হাভেলি। তাজমহল বৃহত্তম এবং খ্যাতিমান। বুদা এবং পেস্ট এর দুই অংশেই রয়েছে তাজমহলের দুটি সাখা। বিফ গুলাস হাঙ্গেরীর জনপ্রিয় খাবার। গরুর মাংসের তৈরী ঘন স্যুপ জাতীয় এই খাবারটি খুব সুস্বাদু এবং জনপ্রিয়।

ছবিরমত সুন্দর চোখ জুড়ানো বুদাপেস্ট মধ্য ইউরোপের একটি গুরুত্ব পূর্ন অর্থনৈতিক ও বানিজ্যিক কেন্দ্র। জীবন যাত্রার মানের দিক দিয়ে এটি মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহর হিসাবে বিবেচিত হয়। ইউসিটি গাইডের জরিপে বুদাপেস্ট বিশ্বের নবম সুন্দর শহর। ইনোভেশন সিটিস এর শীর্ষ ১০০ টি শহরের তালিকায় বুদাপেস্ট এর অব¯’ান প্রথম।

বুদাপেস্টে চোখে পড়ার মত আরেকটি বিষয় হলো প্রতিটি কর্মে নারীর মূল্যায়ন ও অংশগ্রহন। অফিস আদালত ব্যবসা বানিজ্য সবখানে নারীদের ব্যাপক প্রধান্য ও সহাস্য উপ¯ি’তি চোখে পড়ার মত ।যা অন্য সব ইউরোপীয়ান নগরী থেকে আলাদা মনে হয় বুদাপেস্টকে।

বুদাপেস্ট আমার দেখা একটা প্রিয় নগরী। বুদাপেস্টের অনেক কিছুর সাথে মিল রয়েছে প্যারিসের।সিন নদী যেভাবে প্যরিস কে ভাগ করেছে ঠিক সেই ভাবেই দানিয়ুব করেছে বুদাপেস্ট কে ভাগ।প্যারিসের মতই রাতের বুদাপেস্ট দারুন আকর্ষণীয় আর মোহনীয়। নদী তীরের সৌন্দযে ও রয়েছে অনেক মিল। প্যারিসের সিন নদীর মত অনেকগুলে ব্রিজ রয়েছে বুদাপেস্টের দানিয়ুব নদীতে।

রাস্তা ঘাট দালান কোঠা ¯’াপত্য কলায় ও রয়েছে অপূর্ব মিল। ওল্ড টাউনের অনেক কিছু দেখলে মনে হয় প্যারিসের কোন এলাকা। তাই প্যারিসের মত বুদাপেস্ট আমার স্বপ্ন নগরী।

আজ থেকে তিন দশক আগে আমার হাঙ্গেরিয়ান বন্ধু তাসেক ও তার পরিবারের আমন্ত্রণে হাঙ্গেরী ভ্রমন কালে এই অনিন্দ সুন্দর শহরটি দেখার সৌভাগ্য হয়েছিলো আমার। সেই স্মৃতি আজও আমি ভুলতে পারিনি। মাঝে মাঝে আমি মনের অজান্তেই হারিয়ে যাই বুদাপেস্টের শান বাধানো দানিয়ুব তীরে।চোখ বুঝে একা একা হাটি বাসিলিয়া আন্দ্রেসি হিরোস স্কয়ার এর রাস্তায়।

হেটে হেটে পাড় হয়ে যাই চেইন ব্রিজ মার্গারেট ব্রিজ কিংবা লায়ন ব্রিজ। কখনো বা সিতাডেল পাহাড়ের চুড়ায় উঠে অবলোকন করি অপরূপ দৃশ্যবলী। সব মিলিয়ে চমৎকার এই নৈসর্গিক শহরটি আমাকে এখনো টানে। মাঝে মাঝে আমি নস্টালজিক হয়ে পড়ি।

বুদাপেস্ট আমার প্রিয় ভালোবাসার নগরী। এই নগরীর আলো বাতাস প্রকৃতি আমাকে বারে বারে হাতছানিতে ডাকে।সত্যি বুদাপেস্ট এক রোমান্টিক মোহনীয় ভালোবাসার নগরী।সময় সুযোগ হলে একবার ঘুরে আসবেন দানিয়ুব তীরের স্বপ্ন নগরী বুদাপেস্ট।

লেখক: সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও পর্যটক।




Print Friendly and PDF

ফেইসবুকে আমরা