এই মাত্র পাওয়া :

ঢাকা, রোববার, ৭ মার্চ ২০২১

মুজিববর্ষে ‘ভিক্ষুক ও পতিতামুক্ত বাংলাদেশ’ ঘোষনা চাই

বিভাগ : কলাম প্রকাশের সময় :২২ জানুয়ারি, ২০২১ ৭:৩৯ : অপরাহ্ণ

মোঃ আব্দুল মালিক

ইংরেজ সরকার কর্তৃক পাশকৃত সেই ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের পতিতাবৃত্তি আইনে এখনো দেশে দু/একটি পতিতালয় চালু আছে। পূর্বে অনেকগুলো পতিতালয় ছিল। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঢাকা, নারায়নগঞ্জ সহ প্রায় সকল স্বীকৃত পতিতালয় বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ পতিতালয়টি রয়েছে। এর বাইরে তেমন বড় কোন পতিতালয় নেই। ধর্ম এবং সমাজ কোনটিই পতিতাবৃত্তি সমর্থন করে না। ধর্মের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের ২৪ বছর, স্বাধীন বাংলাদেশের ধর্ম নিরপেক্ষ সরকারের সাড়ে তিন বছরের পর সংবিধানে ধর্মের লেবাস দেয়া শুরু হয়।

প্রথমে সংবিধানে বিসমিল্লাহ, আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ^াস এবং সর্বশেষ রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সংযুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু ইসলামে নিষিদ্ধ পতিতাবৃত্তি আইনটি এখনো বাতিল করা হয় নি। এমনকি সংবিধানের ১৮(২) উপধারায় ‘রাষ্ট্র গণিকাবৃত্তি নিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিবেন’ লিখা থাকলেও আজও গণিকাবৃত্তি নিরুধ করা হয় নি। অথচ কথায় কথায় দেশে ধর্মের নামে, ইসলামের নামে আন্দোলন হয়। ইসলাম সমর্থিত রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি সংসদে গিয়েছেন, মন্ত্রীত্ব করেছেন কিন্তু এ ব্যাপারে কোনোদিন কোনো বক্তব্য দেননি।

পতিতালয় আবার সমাজকল্যাণ মন্ত্রনালয়ের অধীন। আল্লাহর আইন চাই, সৎ লোকের শাসন চাই স্লোগানধারী আলী আহসান মোহাম্মদ মোজাহিদ সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থেকেও এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেননি। পতিতাবৃত্তিতে যারা জড়িত তারা সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম মানুষ। তাদেরকে সহজেই চাকুরী দিয়ে, বিদেশে পাঠিয়ে বা স্বকর্ম সংস্থানের মাধ্যমে পুনর্বাসন করা সম্ভব। এটা করা হলে জোর করে পতিতাবৃত্তিতে নিয়োগ বন্ধ হবে। যৌন রোগের বিস্তার রোধ হবে।

ভিক্ষাবৃত্তি একটি অনুৎপাদনশীল ও ঘৃণ্য পেশা। এটিকেও ইসলাম সমর্থন করে না। আল্লাহর নবী কাউকে কোনো দিন ভিক্ষা দেননি। সাময়িক সাহায্য দিয়ে কাজের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। কিন্তু আজ বাংলাদেশে ভিক্ষাবৃত্তি একটি লাভজনক পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পেশার আড়ালে অনেক অপকর্ম-অপরাধ সংঘঠিত হচ্ছে। তাই জাতীয় উন্নয়ন, ধর্ম ও সামাজিক মূল্যেবোধ, আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নে ভিক্ষাবৃত্তি নিরোধ করা একান্ত কাম্য। সংবিধানের ১৫(ক) উপধারায় বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবন ধারনের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা।’

বর্তমান সরকারের নিবাচর্নী ইশতেহারে ভিক্ষুক পূর্ণবাসন কর্মসূচি ছিল। সাবেক অর্থমন্ত্রী আব্দুল মাল আব্দুল মোহিত পরপর কয়েক বছর বাজেটে এ খাতে টাকা বরাদ্দ রেখেছিলেন। কিন্তু সমাজকল্যাণ মন্ত্রাণালয় সে টাকা কাজে লাগাতে পারেনি। অর্থ বছর শেষে টাকা ফেরৎ গেছে। তাই পরবর্তীতে তিনি অনেকটা রাগ করে এখাতে আর টাকা বারাদ্দ দেননি। ঢালাওভাবে একটি কথা প্রচলিত আছে ‘ভিক্ষুকরা পূর্নবাসিত হতে চায় না’। কথাটা সম্পূর্ণ সত্য নয়। আসলে প্রকৃত ভিক্ষুকরা পূর্ণবাসিত হতে চায়। যারা চায় না তারা হচ্ছে পেশাদার ভিক্ষুক বা সিন্ডিকেট দলের সদস্য বা সৌখিন ভিক্ষুক। এরা দেখে পূর্ণবাসনের চাইতে ভিক্ষাবৃত্তিতে লাভ বেশি। তাই তারা পূর্ণবাসিত হতে চায় না।

সরকার যদি আইন করে পতিতা বৃত্তি ও ভিক্ষাবৃত্তি কঠোর শাস্তি যোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করেন, তাহলে শাস্তির ভয়ে আর কেউ এসব পেশায় যাবে না। তখন প্রকৃত ভিক্ষুক ও পতিতারা পুর্নবাসিত হবে, অন্যরা সটকে পড়বে।

সরকার পতিতা ও ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধে ইচ্ছুক হলে প্রথমেই একে নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ গণ্য করে একটি আইন পাশ করে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। এদের তালিকাভূক্তির জন্য অনলাইনে যেকোনো স্থান থেকে এবং ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তালিকাভূক্তির ফরম পূরণের সুযোগ করে দিতে হবে। প্রতিটি উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনে একটি করে বাছাই কমিটি থাকবে। উক্ত কমিটি প্রকৃত ভিক্ষুকদের তালিকা প্রণয়ন করে পুর্নবাসনের ব্যবস্থা করবে।

বর্তমান সরকার সামাজিক সুরক্ষার আওতায় অনেক দরিদ্র, বয়স্ক, বিধবা, স্বামী পরিত্যাক্তা, প্রতিবন্ধী ইত্যাদি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ব্যাপক কাজ করে যাচ্ছেন। আগামী অর্থ বছর থেকে দেশের ১৫০টি উপজেলার সকল দরিদ্র বয়স্ক মানুষ, বিধবা ও স্বামী পরিত্যাক্তা নারী এবং প্রতিবন্ধীদের ভাতার জন্য ১২০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। এসব সামজিক সুরক্ষার সুফলভোগীরা আবার ভিক্ষাবৃত্তিও করে থাকে। তাই সামাজিক সুরক্ষার আওতা আরো বাড়িয়ে, স্ব-কর্মসংস্থানের মাধ্যমে ভিক্ষাবৃত্তি নিষিদ্ধ করা জাতীয় উন্নয়নের জন্য জরুরী।

আওয়ামীলীগ সরকার দেশের আর্থ সামাজিক ও ধর্মীয় উন্নয়নে সবচেয়ে বেশী অবদান রেখেছে। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির পিতার জন্ম শত বার্ষিকী ও স্বাধীন বাংলাদেশের সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশের কয়েকলক্ষ গৃহহীন ও ভূমিহীনকে বাসস্থান তৈরি করে দেওয়ার এক মেঘা ও মহৎ উদ্দ্যোগ নিয়েছেন। এদের অনেকেই সামাজিক সুরক্ষাভোগী এবং একই সাথে ভিক্ষাবৃত্তিও করে থাকে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। অদুর ভবিষ্যতে উন্নত দেশে পরিণত হবে। পদ্মা সেতু সহ বহু মেঘা প্রকল্প দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই বঙ্গবন্ধু অনুমোদিত সংবিধানের ১৫ ও ১৮ অনুচ্ছেদের উক্ত দুটি উপধারা বাস্তবায়নের জন্য পতিতাবৃত্তি ও ভিক্ষাবৃত্তি বেআইনী ঘোষনার মাধ্যমে এদের পুর্নবাসন করে ধর্ম, সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী ও তাঁরই প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলাদেশের সুবর্ণ জয়ন্তীকে মহিমান্বিত করতে পতিতা ও ভিক্ষুকমুক্ত বাংলাদেশ ঘোষনা এখন সময়ে দাবি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে এই ক্ষুদ্র প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব বলে অভিজ্ঞরা মনে করেন।

লেখক: শিক্ষক ও কলামিস্ট।

Print Friendly and PDF

ফেইসবুকে আমরা