এই মাত্র পাওয়া :

ঢাকা, সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১

ক্যামেরা নিয়ে  সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা

রহস্যে ঘেরা স্বর্ণজাদি নামে ধর্মীয় বিহার, কামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান!

বিভাগ : এক্সক্লুসিভ প্রকাশের সময় :৬ মে, ২০২০ ৭:৩৬ : পূর্বাহ্ণ

জহির রায়হান, বান্দরবান:
টাকার বিনিময়ে স্বর্ণজাদিতে দেশী-বিদেশী হাজার হাজার পর্যটক প্রবেশ করে অহরহ ভাবে। সাথে নিয়ে যাচ্ছে মোবাইল, ক্যামেরা। তুলছে ছবি ও ভিডিও। কিন্তু সাংবাদিক জানতে পারলেই ভেতরে প্রবেশ করতে দেন না উচহ্লাভান্তের তার শিষ্যরা।  ক্যামেরা ও মোবাইল নিয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশে অপ্রকাশ্য নিষেধাজ্ঞা জারী আছে স্বর্ণ জাদীতে।  এনিয়ে স্থানীয়  সাংবাদিকদের রয়েছে ক্ষোভ।
স্থানীয়রা জানান, নামে স্বর্ণজাদি ও রামজাদি ধর্মীয় বিহার হলেও দুইটিকে উচহ্লাভান্তে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বানিয়ে ফেলেছেন বহু আগে।
সরকারী রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে পর্যটকদের কাছ থেকে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে তিনি ও তার শিষ্যরা । যা  তার মৃত্যুর পরেও  অব্যাহত আছে। জাতি দুটিতে পর্যটক হয়রানী ও মারধরের অভিযোগ অহরহ।
স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ, ক্যামেরা নিয়ে সাংবাদিকদের স্বর্ণজাদি ও রামজাদিতে প্রবেশে প্রতিনিয়ত বাধা দিলেও টাকার বিনিময়ে মোবাইল, ক্যামেরা নিয়ে অবাধে প্রবেশ করছে পর্যটকরা।
সময় টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি ও স্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল পাহাড়বার্তা’র নির্বাহী সম্পাদক এস বাসু দাশ জানান, বিগত কয়েক বছর আগে তিনি পর্যটন সংক্রান্ত সংবাদ সংগ্রহ করতে স্বর্ণজাদিতে যায়। কিন্তু সাংবাদিক শুনে তাকে ক্যামেরা নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। এছাড়া আরও একবার বিদেশী রাষ্ট্রদূত আসলে সংবাদ সংগ্রহ করতে যায় সাংবাদিকেরা। রাষ্ট্রদূতকে প্রবেশ করতে দিলেও সাংবাদিক ও রাষ্ট্রদূতের নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।

ধারাবাহিক প্রতিবেদন-৭

স্থানীয় সাংবাদিকদের ধারণা স্বর্ণজাদি ও রামজাদিতে এমন কোন কু-কর্মের রহস্য লুকিয়ে রয়েছে। অথবা উচহ্লাভান্তে ও শিষ্য কর্তৃক জাদি দুইটিতে নিষিদ্ধ কোন কর্মকান্ড পরিচালিত হয়। যা দেশ ও জাতির কাছে প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ভয় ও আশংকায় সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে উচহ্লাভান্তে ও শিষ্যরা।
বাংলাভিশন টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি আল ফয়সাল বিকাশ জানান, বাংলাভিশন টেলিভিশনের সংবাদ বিভাগের প্রধান মোস্তফা ফিরোজ দিপু বান্দরবান ভ্রমনে এসে স্বর্ণজাদি দেখতে যান। কিন্তু সাংবাদিক শুনে প্রথমে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি । অনেক অনুরোধের পর  ছবি তোলা যাবে না, বেশিক্ষণ থাকা যাবে না এরকম নানা শর্ত আরোপ করে প্রবেশ করতে দিলেও সারাক্ষণ একজন শিষ্য পেছনে লেগেই ছিলেন।    যার কারণে বার্তা বিভাগের প্রধানের সামনে আমাকে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একমাত্র সাংবাদিকদের প্রচারের কারনে স্বর্ণজাদি সারাবিশ্বে পরিচিত হয়ে উঠেছে। উচহ্লাভান্তে একজন সাধারণ ভিক্ষু, তিনি আজ ব্যাপক পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠার পেছনে সাংবাদিকদের অবদান। সাংবাদিকেরা যদি প্রচার না’করতো তাহলে উচহ্লাভান্তেকে কেউ চিনতেনও না। কিন্তু আজ সাংবাদিকেরাই তার প্রতিষ্ঠানে গিয়ে হেনস্থার শিকার হতে হচ্ছে। যা খুবই নিন্দনীয় কর্মকান্ড।
দৈনিক সমকালের জেলা প্রতিনিধি উজ্জল তঞ্চঙ্গ্যা জানান, স্বর্ণজাদি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হলেও এটি পর্যটন স্পট হিসেবে পরিচিত। এই পরিচিতির পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান সাংবাদিকদের। কিন্তু সংবাদ সংগ্রহে প্রবেশে বাধা দেয়ার বিষয়টি খুবই দুঃখজনক।
সাংবাদিকরা জানান, উচহ্লাভান্তে বিরুদ্ধে বিশেষ করে সরকার ও দেশের তথ্য বিদেশে পাচার করার অভিযোগ বহুদিন ধরে রয়েছে। তার দেশ বিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার বহু তথ্য বিভিন্ন সময় সরকারকে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানিয়েছেন বলে জানা যায়। বিভিন্ন সময় তার দেশ বিরোধী নানা কর্মকান্ড ও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার ঘটনা জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল।
দৈনিক যায়যায়দিনের জেলা প্রতিনিধি কে মুই অং মারমা জানান, স্বর্ণজাদিতে কর্তৃপক্ষের এমন কোন উদ্দেশ্যে অবশ্যই থাকতে পারে। প্রবেশ করতে দিলে সে উদ্দেশ্য হয়ত সাংবাদিকদের চোখে পড়তে পারে ভেবেই তারা বাধা দিচ্ছে। আমি মনে করি যেহেতু স্বর্ণজাদি একটি পর্যটন স্পট। সেখানে সাংবাদিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ও ছবি তুলতে বাধা প্রদান বিষয়টি অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়।
স্বর্ণজাদি সংলগ্ন এলাকা বাসিন্দা ও দৈনিক স্বদেশ প্রতিদিনের জেলা প্রতিনিধি আব্দুর রহিম জানান, গোপনীয় কোন কর্মকান্ড স্বর্ণজাদিতে হয়, যারজন্য সাংবাদিকদের ক্যামেরা নিয়ে জাদিতে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না বলে আমি মনে করি।
স্থানীয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা জানান, স্বর্ণজাদি ও রামজাদি দুইটি বিহার দেশী-বিদেশী বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের দানের অর্থ দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু বিহার দুইটি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই পর্যটন স্পটে পরিনত করা হয়েছে। আসলে নামে বিহার হলেও কামে বিহার দুইটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। যেটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য খুবই দুঃখজনক বিষয়।
বান্দরবান রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি ও দৈনিক ভোরের কাগজের জেলা প্রতিনিধি মংচানু মারমা জানান, স্বর্ণজাদি ও রামজাদি ধর্মীয় বিহার হলেও পর্যটন স্পট হিসেবে খুলে দেয়া হয়েছে। যেখানে পর্যটকরা টাকা বিনিময়ে প্রবেশ করতে পারে, সেখানে সাংবাদিকদের প্রবেশে ও ছবি তুলতে বাধা দেয়া কোনমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমি মনে করি সাংবাদিক প্রবেশে বাধা প্রদানের মূল কারণ হচ্ছে কমিটি কর্তৃক ঐবিহারে বড় ধরণের কোন রহস্য রয়েছে। আমি একজন কলম-সৈনিক হিসেবে এঘটনার তীব্র নিন্দা জানায়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সাংবাদিকদের অভিযোগ, ধর্মের আড়ালে  স্বর্ণজাদি ও রামজাদির মাধ্যমে অবৈধভাবে প্রবেশ ফ্রি নিয়ে বছরে শত শত কোটি টাকা আয় করলেও   সরকারকে আয়কর না দিয়ে  কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে  উচহ্লাভান্তে ও শিষ্যরা। তারা মনে করেন, টাকা বিনিময়ে প্রবেশের যখন সুযোগ রয়েছে। উক্ত প্রতিষ্ঠান দুইটিতে সরকারী ভ্রমণ কর আরোপ করা জরুরী।
বান্দরবান প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও বাংলাদেশ বেতার প্রতিনিধি আমিনুল ইসলাম বাচ্চু জানান, নেপাল, মালেশিয়াসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ধর্মীয় স্থাপনাগুলোতে ক্যামেরা নিয়ে প্রবেশ কোন বাধা নেই। আমি সফরকালে দেখেছি নেপাল বৌদ্ধ স্থাপনাগুলোতে জুতা নিয়েও প্রবেশ করতে পারে। তাহলে আমাদের এখানে প্রবেশে বাধা হবে কেন। এখানে কি রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষার কোন বিষয় আছে। যার জন্যই কি ক্যামেরা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। তিনি বলেন, যেখানে ভান্তেরা নিজেরাই স্বর্ণজাদি ও রামজাদি নানান ছবি ও ভিডিও ফেইসবুকসহ বিভিন্ন জায়গায় আপলোড করছে। তাহলে সেখানে সাংবাদিকদের ক্যামেরা নিয়ে প্রবেশে বাধা দেয়ার কারণ কি?।
বান্দরবান প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান একেএম জাহাঙ্গীর বলেন, স্বর্ণজাদি ও রামজাদিতে অতীতে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনার বিষয়ে উচহ্লাভান্তে জীবদ্দশায় তার মুখোমুখি আমি বলেছি। উত্তরে তিনি (উচহ্লাভান্তে) বলেছিলেন, সবসময় আমরা দিতে পারবো না। তখন আমি বলেছি ওমুক গোত্র ও ওমুক  সম্প্রদায় বা সাংবাদিক প্রবেশ করতে দেয়া যাবে না, এধরণের মনোভাব থাকা উচিত নয়। যেখানে বুদ্ধ নিজেই বলেছেন অহিংসা পরম ধর্ম। আর সেখানে যদি আপনি হিংসা-বিদ্বেষ লালন-পালন করেন, তাহলে আপনার ধর্ম কোথায়। কিন্তু তিনি আমাকে কোন সদুত্তর দিতে পারেনি।
স্বর্ণজাদি ও রামজাদি স্থানীয় বাসিন্দারা জানান,  প্রায় সময় পর্যটকদের নানাভাবে হয়রানি করে থাকেন শিষ্যরা। পর্যটকের ক্যামেরা, মোবাইলসহ টাকা পয়সা ছিনতাই-এর মত ঘটনা ঘটছে এ জাদি দুইটিতে। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, রামজাদিতে বছর তিনএক আগে বান্দরবান কলেজের প্রভাষক ও পর্যটকদের ওপর হামলা চালায় এবং মোবাইল, ক্যামেরা ছিনিয়ে নেয় ভান্তের শিষ্যরা। এরকম ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটে।
বান্দরবান প্রেসক্লাব সাধারণ সম্পদক মিনারুল হক বলেন, স্বর্ণজাদি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হলেও প্রবেশফ্রি দিয়ে পর্যটকরা অবাধে প্রবেশ করছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের কোন নিয়মনীতি নেই। আমি মনে করি পবিত্রতার বিষয়টি চিন্তা করে  পর্যটক প্রবেশ বন্ধ হওয়া জরুরী। আর না’হয় সকলকে প্রবেশের সুযোগ দেয়া উচিত।
এব্যাপারে বান্দরবান প্রেসক্লাব সভাপতি মনিরুল ইসলাম মনু বলেন, সাংবাদিকেরা সব জায়গা যেতে পারে, যুদ্ধ ক্ষেত্র হলেও সেখানে যেতে পারে। স্বর্ণজাদি যদি ধর্মীয় বা কৃষ্টি-সংস্কৃতিক, শিল্পকলা ও পর্যটন স্পট হয়ে থাকে, আর সেখানে যদি জনসমাগম হয়। তাহলে সেখানে সাংবাদিক যেতেই পারে। যেহেতু কলম ও ক্যামেরা সাংবাদিকদের হাতিয়ার। সেগুলো নিয়ে প্রবেশে বাধা দেয়া মানেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা। আর সাংবাদিকদের  প্রবেশ ও ছবি তুলতে না’দিলে মানুষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি বা ভূল ধারণা তৈরি হয়।
স্থানীয় সচেতন মহল জানান, দেশ, জাতির স্বার্থে এবং শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রতিটি পর্যটন স্পট, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনাসহ বিতর্কিত সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানো খুই জরুরী। তারা এব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকার ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
উচহ্লাভান্তের স্থাবর-অস্থাবর শত শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক কে হচ্ছেন? আগামী ৮ম পর্বে পড়ুন-সে কাহিনী।  

Print Friendly and PDF

ফেইসবুকে আমরা