এই মাত্র পাওয়া :

ঢাকা, রোববার, ১৭ জানুয়ারী ২০২১

লোকসানী চিনিকল লাভজনক করতে হলে

বিভাগ : কলাম প্রকাশের সময় :৩ জানুয়ারি, ২০২১ ১২:১০ : অপরাহ্ণ

মোঃ আব্দুল মালিক

দীর্ঘদিন ধরে দেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চিনিকলগুলো ফি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা লোকসান দিয়ে যাচ্ছে। নিয়মিত বেতন ভাতা না পাওয়ায় শ্রমিক, কর্মচারী, কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। অসন্তোষ বিরাজ করছে আখ চাষীদের মধ্যেও। যার জন্য হরতাল, ধর্মঘটও হয়ে থাকে।

চিনিকলগুলো নিয়মিত উৎপাদনে না থাকায় মেশিনারিজ নষ্ট হচ্ছে, অবকাঠামোর ক্ষতি হচ্ছে, আখ চাষের জমি পতিত থাকছে, উৎপাদিত চিনি বিক্রি না হওয়ায় মিলে নষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে চিনি আমদানি করতে গিয়ে অতি মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এতে দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, বিদেশি পণ্যে বাজার ভরে যাচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য মোটেও কাম্য নয়। চিনিকলগুলো অলাভজনক ও লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার পিছনে শিল্প মন্ত্রী, উর্দ্ধতন কর্মকর্তা ও সরকারি নীতিমালা কম দায়ী নয়। এর পিছনে চিনি আমদানিকারকদেরও হাত থাকতে পারে।

ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত পরিবেশ বান্ধব, নিরাপদ ও লাভজনক আমাদের রেল পরিবহনকে পরিকল্পিতভাবে এক সময় ধ্বংস করে বেসরকারি বাস মালিকরা লাভবান হয়েছিলেন। বর্তমান সরকার রেল যোগাযোগের উন্নয়নে মনযোগী হওয়ায় রেল আজ লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তেমনিভাবে সরকার লোকসানি চিনিকলগুলোকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চাইলে সহজেই করতে পারেন।

চিনিকলগুলোর লোকসানের কারণ দেশীয় চিনির মূল্য বেশী, রং লাল, দীর্ঘ দিন সংরক্ষণ করা যায় না, তাই বিক্রি হয় না ইত্যাদি। মূল্য বেশি হওয়ার কারণ শ্রমিক, কর্মকর্তা, কর্মচারীরা বছরে মাত্র ৩-৪ মাস কাজ করে। বাকী সময় কাজ না করে বেতন ভাতা নেন। মিলের রক্ষণাবেক্ষন ও সংস্কার কাজের নামে মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় দেখানো ইত্যাদি। এর থেকে বের হয়ে চিনিকলগুলোকে লাভজনক করতে হলে-১) সৎ ও দক্ষ শিল্পমন্ত্রি এবং কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে হবে, ২) চিনিকলগুলোর সর্বোচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে, ৩) চিনিকলগুলোকে বহুমুখী উৎপাদন কাজের উপযোগী করতে হবে, ৪) উৎপাদন মৌসুমে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আমদানি বন্ধ রাখতে হবে, ৫) মাথাভারি প্রশাসন ও সংস্কার কাজে সচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে ব্যয় সংকোচন করতে হবে। চিনিকল কেন্দ্রিক অবকাঠামো, আখ উৎপাদনের ভূমি, শ্রমিক, কর্মকর্তা, কর্মচারীর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ফলে লোকাসানি চিনিকলগুলো লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। তারপরও যদি লাভজনক না হয় তাহলে সর্বোচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত করে স্বল্প মূল্যে চিনি বিক্রি করলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ, চা-মিষ্টির দোকানীরা দেশীয় চিনি কিনবেন। ফলে বিক্রি বেড়ে যাবে। এতে যে লোকসান হবে এর সুফল ভোক্তারা ভোগ করবে। বর্তমানে যা ভোগ করছে কতিপয় শ্রমিক, কর্মচারী, কর্মকর্তা। এভাবে এক সময় দেশীয় চিনি ব্যবহারকারী একটা দেশপ্রেমিক শ্রেণী গড়ে উঠবে। জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, আমদানি নির্ভরতা কমবে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়বে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। ফলে প্রত্যক্ষ লোকসানের তুলনায় পরোক্ষ লাভ বেশি হবে।

আমদানিকৃত চিনিতে কেমিক্যাল মিশ্রিত থাকে। তাই রং সাদা ও সহজে গলে না, মিষ্টি কম, স্বাস্থ্য সম্মত নয়। পক্ষান্তরে দেশীয় চিনিতে কেমিক্যাল নেই। তাই রং লাল ও সহজে গলে যায়, মিষ্টি বেশি এবং স্বাস্থ্য সম্মত। এসব বিষয় সরকারিভাবে প্রচার করে জনগণকে সচেতন করতে হবে। এভাবে উদ্দ্যোগ নেয়া হলে চিনিকলগুলো লাভজনক হতে বাধ্য।

ভারত যখন বাংলাদেশে গরু রপ্তানি বন্ধ করে দেয় তখন আমরা সাময়িক অসুবিধায় পড়েছি। বর্তমানে এক খাতে আমরা স্বয়ং সম্পূর্ণ। পিয়াজের ক্ষেত্রেও স্বয়ং সম্পূর্ণ হওয়ার পথে। এভাবে চিনির ক্ষেত্রেও সম্ভব। জাতীয় স্বার্থে এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

লেখক-শিক্ষক ও কলামিস্ট

Print Friendly and PDF

ফেইসবুকে আমরা