এই মাত্র পাওয়া :

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৪ মার্চ ২০২১

হযরত ফাতেমা জাহরা (সা.আ.) এর জীবনযাপন পদ্ধতি

বিভাগ : কলাম প্রকাশের সময় :১৬ জানুয়ারি, ২০২১ ৫:৪১ : অপরাহ্ণ

হযরত মুহাম্মাদ (স.) এর পবিত্র আহলে বাইতের অন্যতম সদস্য হযরত ফাতেমা জাহরা (সা.আ.) নবুয়তের ৫ম বর্ষে পবিত্র মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন এমন এক মহিয়সি মহিলা যাকে আল্লাহ তাআলা সুরা আহজাবের ৩৩ নং আয়াতের মাধ্যমে পাক পবিত্র বলে ঘোষণা দিয়েছেন। এছাড়া তিনি হচ্ছেন বেহেশতের মহিলাদের নেত্রী। তার জীবনযাপন পদ্ধতিতে আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ নিহিত রয়েছে। এজন্য তার জীবনযাপন পদ্ধতির কয়েকটি দিকের উপর আলোকপাত করতে চাই।
*১. দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্ততা* 
ইমাম জা’ফর আস সাদেক (আ.) এবং হযরত জাবের আনসারী থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, একদিন হযরত মুহাম্মদ (সা.) হযরত ফাতেমাকে দেখলেন যে, তিনি একটি মোটা ও শক্ত কাপড় পরিধান করে নিজ হস্তে যাঁতাকল চালিয়ে আটা তৈরী করছেন। আর সে অবস্থায় নিজের কোলের সন্তানকে দুধ খাওয়াচ্ছেন। এহেন অবস্থা পরিদর্শনে হযরতের চোখে পানি ছল ছল করে উঠলো। তখন তিনি বলেন : “হে আমার প্রিয় কন্যা! এ দুনিয়ার তিক্ততা আখেরাতের মিষ্টি স্বাদেরই পূর্ব প্রস্তুতি মনে করে সহ্য করে যাও।” প্রত্যুত্তরে হযরত ফাতেমা বলেন :
হে আল্লাহর রাসূল (সা.)! আল্লাহ্ প্রদত্ত এতসব নেয়ামত ও অনুগ্রহের জন্যে তাকে অশেষ ধন্যবাদ জানাই এবং এ জন্যে তাঁর অশেষ প্রশংসাও করছি। তখন আল্লাহ্ নিম্নোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ করেন :
وَ لَسَوْفَ يُعْطِيْكَ رَبُّكَ فَتَرْضَى
অর্থাৎ তোমার প্রভু অতি শীঘ্রই তোমাকে এমন কিছু দেবেন যার ফলে তুমি সন্তুষ্ট হবে।” সুরা দুহা/৫
 *২. গৃহাভ্যন্তরে কাজ* 
ইমাম জা’ফর সাদিক (আ.) বলেন : “ইমাম আলী (আ.) পানি ও কাঠ জোগাড় করে আনতেন আর হযরত ফাতেমা (আ.) আটা তৈরী করে খামির বানাতেন আর তা দিয়ে রুটি তৈরী করতেন। তিনি কাপড়ে তালি লাগানোর কাজও করতেন। এ মহিয়সী রমণী সকলের চেয়ে বেশী রূপসী ছিলেন এবং তাঁর পবিত্র গাল দু’টি সৌন্দর্যে পুষ্পের ন্যায় ফুটে ছিল। আল্লাহর দরূদ তিনি সহ তাঁর পিতা,স্বামী ও সন্তানদের উপর বর্ষিত হোক।” রাওদ্বাহ্ আল কাফি,পৃ. ১৬৫।
হযরত আলী (আ.) বলেছেন: “ফাতেমা মশক দিয়ে এতই পানি উত্তোলন করেছেন যার ফলে তাঁর বক্ষে ক্ষতের ছাপ পড়ে যায়, তিনি হস্তচালিত যাতাকলের মাধ্যমে এত পরিমান আটা তৈরী করেছেন যার কারণে তাঁর হাত ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়, তিনি এত পরিমান ঘর রান্না-বান্নার কাজ করেছেন যে তাঁর পোশাক ধুলি  ধোঁয়া মাখা হয়ে যেত। এ ব্যাপারে তিনি প্রচুর কষ্ট স্বীকার করেছেন।” বিহারুল আনওয়ার, ৪৩তম খণ্ড, পৃ. ৪২,৮২
(উল্লেখ্য যে তিনি মদীনার দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত মানুষদের মধ্যে বিতরণের জন্য প্রতিদিনই রুটি প্রস্তুত করতেন।)
 *৩. দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক সমঝোতা* 
আমিরুল মু’মিনীন আলী (আ.) বলেন : “আল্লাহর শপথ, আমার দাম্পত্য জীবনে ফাতেমাকে তাঁর মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত কখনো রাগাইনি আর কোন কাজে তাকে বাধ্যও করি নি। সেও আমাকে কখনো রাগান্বিত করে নি এবং কখনো আমার অবাধ্য হয় নি। যখনি তাঁর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতাম তখনি আমার দুঃখ কষ্ট দূর হয়ে যেত।” বিহারুল আনওয়ার,৪৩তম খণ্ড,পৃ. ১৩৪।
 *৪. ইবাদত ও অপরের জন্যে দোয়া* 
হযরত হাসান বসরী (রহ.) বলেন: “নবী (সা.)-এর উম্মতের মধ্যে হযরত ফাতেমার ন্যায় ইবাদতকারী পৃথিবীতে আর আসেনি। তিনি নামাজ ও ইবাদতে এতবেশী দণ্ডায়মান থাকতেন যে, এর ফলে তাঁর পদযুগল ফুলে গিয়েছিল।” বিহারুল আনওয়ার, ৪৩তম খণ্ড, পৃ. ৮৪।
ইমাম হাসান (আ.) বলেন : “এক বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত্রে আমার মাকে ইবাদতে দণ্ডায়মান দেখতে পেলাম। তিনি সুবহে সাদেক পর্যন্ত নামাজ ও মুনাজাতরত ছিলেন। আমি শুনতে পেলাম যে, তিনি মু’মিন ভাই-বোনদের জন্যে তাদের নাম ধরে দোয়া করলেন কিন্তু নিজের জন্যে কোন দোয়াই করলেন না। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, মা! আপনি যেভাবে অন্যের জন্যে দোয়া করলেন সেভাবে কেন নিজের জন্যে দোয়া করলেন না? উত্তরে তিনি বলেন : হে বৎস! প্রথমে প্রতিবেশীদের জন্যে তারপর নিজেদের জন্যে।” কাশফুল গুম্মাহ্, ২য় খণ্ড, পৃ. ২৫,২৬।
 *৫. পর্দা* 
ইমাম মুসা কাযেম (আ.) তাঁর পিতা ও পিতামহদের কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আমিরুল মু’মিনীন আলী (আ.) বলেছেন: “একদিন এক অন্ধ ব্যক্তি ফাতেমার গৃহে প্রবেশের জন্যে অনুমতি চাইলে তিনি ঐ অন্ধ ব্যক্তি থেকে নিজেকে আড়াল করে রাখলেন। রাসূল (সা.) বললেন : হে ফাতেমা! কেন তুমি এই ব্যক্তি থেকে নিজেকে আড়াল করে রাখছো? সে তো অন্ধ, তোমাকে দেখছে না। প্রতি উত্তরে ফাতেমা বলেন: যদিও ঐ অন্ধ লোকটি আমাকে দেখছেন না কিন্তু আমি তো তাকে দেখছি। এ অন্ধ ব্যক্তিটির নাসিকা গ্রন্থি তো কাজ করছে। তিনি তো ঘ্রান নিতে পারেন। এ কথা শুনে রাসূল (সা.) বলেন: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমি আমার দেহের অংশ।” বিহারুল আনওয়ার,৪৩তম খণ্ড,পৃ. ৯১।
 *৬. সতীত্ব এবং বেগানা পুরুষ থেকে দূরত্ব বজায় রাখা* 
হযরত ফাতেমা (আ.)-কে প্রশ্ন করা হয়, “একজন নারীর জন্য সর্বোত্তম জিনিস কোনটি?” তিনি এর উত্তরে বলেন: “নারীদের জন্যে সর্বোত্তম জিনিস হলো তারা যেন কোন পুরুষকে না দেখে আর পুরুষরাও যেন তাদেরকে দেখতে না পায়।” কাশফুল গুম্মাহ্, ২য় খণ্ড, পৃ. ২৩,২৪।
তদ্রুপ মহানবী (সা.) যখন তাঁর সাহাবীদের সামনে প্রশ্ন রাখেন যে, “একজন নারী কখন মহান আল্লাহর সবচেয়ে বেশী নৈকট্য লাভে সক্ষম হন?” তখন হযরত ফাতেমা বলেন: নারী যখন বাড়ীর সর্বাপেক্ষা গোপন অংশে অবস্থান গ্রহণ করে তখন তার প্রভুর সবচেয়ে নিকটবর্তী হয়। হযরত মুহাম্মদ (সা.) হযরত ফাতেমার উত্তর শ্রবন করে বলেন: “ফাতেমা আমার শরীরের অংশ।”  বিহারুল আনওয়ার, ৪৩তম খণ্ড, পৃ. ৯২।
এসব হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, কোন মহিলা যেন বিনা প্রয়োজনে বাড়ি থেকে বের না হয়। আর কোন প্রয়োজনে বের হলে অবশ্যই যেন হিজাব মেনে চলে।
 *৭. গৃহভৃত্যের সাথে কাজের ভাগাভাগি* 
হযরত সালমান ফারসী বলেন: একবার হযরত ফাতেমা হস্তচালিত যাঁতাকল দিয়ে আটা তৈরী করছিলেন। আর যাঁতাকলের হাতল ফাতেমার হাতের ক্ষতস্থান দ্বারা রক্তরঞ্জিত হয়ে গিয়েছিল। তখন শিশু হুসাইন তাঁর পার্শ্বে ক্ষুধার জ্বালায় ক্রন্দন করছিল। আমি তাকে বললাম : “হে রাসূলের দুহিতা! আপনার হাত ক্ষত হয়ে গেছে, ‘ফিদ্দা’ (হযরত ফাতেমার গৃহপরিচারিকার নাম) তো আপনার ঘরেই আছে।” তখন তিনি বলেন : “রাসূল (সা.) আমাকে আদেশ করেছেন যে পালাক্রমে একদিন ফিদ্দা ঘরের কাজ করবে আর আমি অন্য একদিন। তার পালা গতকাল শেষ হয়ে গেছে আর আজকে আমার পালা।” বিহারুল আনওয়ার, ৪৩তম খণ্ড, পৃ. ২৮।
 *৮. তাসবিহে ফাতেমা*
রাসূল (সা.) এর কাছে একবার কিছু গোলাম ও বাঁদী আসলে আলী (আ.) ফাতিমা (সা.আ.) কে বললেন,
“হে ফাতিমা ঘরের কাজ কর্ম করতে তোমার অনেক কষ্ট হয় তুমি রাসূল (সা.) এর কাছে গিয়ে তোমার সমস্যার কথা খুলে বললে তিনি হয়ত তোমাকে একটা কাজের মেয়ে দিতে পারেন। তাহলে তোমার কষ্ট কিছুটা লাঘব হবে।”
হযরত ফাতিমা (সা.আ.) রাসূল (সা.) এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে দেখলেন তিনি সাহাবীদের সাথে কথা বলছেন (তিনি অতি মাত্রায় লাজুক ছিলেন বিধায়) লোক সম্মুখে কিছু না বলেই ফিরে আসলেন। রাসূল (সা.) বুঝতে পারলেন নিশ্চয় ফাতিমা কোন দরকারে এসেছিল কিন্ত লোকজন থাকায় কিছু না বলেই ফিরে গেছে।
পরের দিন রাসূল (সা.) স্বয়ং আমাদের বাড়ি এসে আমাদের পাশে বসে বললেন, ফাতিমা তুমি গতকাল কি জন্য আমার কাছে এসেছিলে? তিনি লজ্জায় মাথা নিচু করে রইলেন কিছুই যেন মুখ থেকে বের হচ্ছিলনা, আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা.) পানি বহন করে ফাতিমার কোমর ব্যথা হয়ে গেছে, যাতা ঘুরানোর কারনে হাতে দাগ পড়ে গেছে। ঘর দুয়ারে ঝাড় দেয়ার কারন কাপড় চোপড় ময়লা থাকে। তাই গতকাল বলেছিলাম আপনার কাছে গিয়ে একজন খাদেম আবেদন করতে।
রাসূল (সা.) বললেন, “আমি কি তোমাদেরকে কাজের মেয়ের চেয়ে উত্তম কিছু দান করব যা তোমাদের ইহকাল ও পরকাল উভয় জগতেই কাজে আসবে।” হযরত ফাতিমা (সা.আ.) বললেন, “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) যা ভাল মনে করেন আমি তাতেই সন্তুষ্ট।”
রাসূল (সা.) বললেন,
“রাতে যখন শেয়ার জন্য বিছানায় যাবে তখন ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ ও ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পড়ে শয়ন করবে। এই জিকির সর্ব মোট ১০০ বার হলেও আমলনামাতে তার সওয়াব ১০০০ বার লেখা হবে।” বিহারুল আনওয়ার, ৪৩তম খণ্ড, পৃ. ৮২।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হযরত ফাতেমা জাহরা (সা.আ.) এর আদর্শ অনুসরণ করার তৌফিক দান করুন। আল্লাহুম্মা আমিন।
লেখক: মাওলানা আবদুল্লাহ, পরিচালক, পবিত্র কুরআন ও আহলে বাইত শিক্ষাকেন্দ্র, চাপাই নবাবগঞ্জ।

Print Friendly and PDF

ফেইসবুকে আমরা