এই মাত্র পাওয়া :

ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ মে ২০২১

৩০০ টাকায় লাখপতি শামীমা

বিভাগ : এক্সক্লুসিভ প্রকাশের সময় :২৮ এপ্রিল, ২০২১ ৪:৪৪ : অপরাহ্ণ


হাসান সিকদার, টাঙ্গাইল থেকে:

জীবন সুন্দর, তার চেয়ে বেশি সুন্দর জীবনের স্বপ্নগুলো। জীবন থেমে থাকার জন্য নয়। হতাশা, ক্রোধকে ভুলে কঠোর পরিশ্রম, মেধা ও অনুপ্রেরণা দিয়ে যে জীবনকে জয় করা সম্ভব, তার একজন উজ্জল দৃষ্টান্ত শামীমা সুলতানা। নিজের স্বামী ও এক মেয়েকে ঠিক যতটুকু সময় দেন, তার চেয়ে বেশি সময় দেন নিজের ফেসবুক ভিত্তিক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান আনকোরা। এক কন্যা সন্তানের মা অনার্স শেষ না হতেই যখন চাকরির আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরতে গিয়ে নিজের মধ্যে হতাশা আবিষ্কার করলেন, ঠিক তখনই ব্যবসায়ী হওয়ার স্বপ্ন মাথায় চাপে। এরপর স্বামীর অনুপ্রেরণায় নিজেকে একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুললেন। ‘আনকোরা’ ফেসবুক পেজ তার জীবনকে নিয়ে গেলো এক অনন্য উচ্চতায়। নিজের জমানো মাত্র ৩০০ টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করে বর্তমানে এক লাখেরও বেশি টাকার পুঁজি করেছেন। প্রতি মাসে আয় করছেন ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। এমনটাই জানান ‘আনকোরা’র স্বত্বাধিকারী শামীমা সুলতানা। এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষে থাকাকালীন বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় তাকে। কিন্তু সংসার ও সন্তান লালন-পালনের পাশাপাশি সফলতার সঙ্গে চালিয়ে যান পড়াশোনা। শামীমা সুলতানা টাঙ্গাইলের কুমুদিনী সরকারি মহিলা কলেজের অনার্স শেষ বর্ষের ছাত্রী। চাকরির আশায় বসে না থেকে তিনি উইয়ের মাধ্যমে শুরু করেছেন অনলাইন ব্যবসা। ‘আনাকোরা’ নামে ফেসবুক পেজ খুলে দেশীয় আমসত্ত্ব বিভিন্ন রকমের আচার ফেসবুক পেজে আপলোড দিতে থাকেন। ধীরে ধীরে অর্ডার আসতে থাকে। সেইসঙ্গে মানুষের চাহিদাও বাড়তে থাকে; ফলে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে ‘আনাকোরা’ পেজ। শামীমার সঙ্গে কথা বলেছেন শিক্ষার্থী ও গণমাধ্যমকর্মী হাসান সিকদার।

ব্যবসার শুরু কীভাবে?
শামীমা: গত বছর সারা বিশ্বে যখন মহামারি শুরু, তখন আমাদের দেশও মহামারি থেকে রক্ষা পায়নি। গত বছর ১৭ মার্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয় সরকার। তখন ঘরবন্দী হয়ে যাই। তারপর থেকে মনে মনে চিন্তা করি কিছু একটা করতে হবে। আমি উই নামের একটা ফেসবুক পেজ দেখতে পাই। আমারও ইচ্ছে জাগলো এই অলস সময়টা নষ্ট না করে সময়টাকে কাজে লাগাই। তারপর থেকেই শুরু করি অনলাইনে ব্যবসা। আচার, আমসত্ত্ব ও বিভিন্ন হ্যান্ডপেইন্ট নিয়ে কাজ শুরু করি। আস্তে আস্তে শুরু হলো আমার অর্ডার আসা। মেয়ে নয় মানুষ হিসেবে নিজের পরিচয় গড়াই ছিল আসল উদ্দেশ্য। উই থেকে আমার উদ্যোক্তা জীবনের শুরু। উই থেকেই শিখেছি কিভাবে ঘরে-বাইরে সব কিছু সামলিয়ে নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে সফল ব্যবসায়ী হওয়া যায়। তবে ডিএসবির অবদানও কিন্তু অস্বীকার করার মতো না।
কেন মনে হলো, আপনি ব্যবসায়ী হবেন?
শামীমা: কম বয়সে বিয়ে, পড়াশোনা, সংসার আর একমাত্র মেয়ের জন্মের পর পরই মনে হলো মেয়ের মা হিসেবে একটা পরিচয় আমার ভীষণ প্রয়োজন। কিছু একটা আমাকে করতেই হবে, সেই ভাবনা থেকেই ব্যবসার চিন্তা এসেছে মাথায়।
আপনার লাখপতি হওয়ার গল্পটা শুনতে চাই।
শামীমা: লাখপতি হওয়ার গল্পটা যত সহজে বলবো, ততটাও সহজ ছিল না। আসলে শুধু আচার নিয়ে কেউ লাখপতি হয়েছে কিনা তা আমার জানা নেই। ব্যবসার শুরুর দিকে বেশ ভালো সাড়া পেলেও সেটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই নভেম্বর মাসের দিকে ডিএসবিতে রাজীব স্যারের পোস্ট দেখে নিজেকে আরও দক্ষ করার যাত্রা শুরু হয়। উদ্যোক্তা হওয়ার ৫ মাস পরে আবার নতুনভাবে উদ্যোক্তা হলাম। আর উইতে তখন থেকেই এক্টিভিটি বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। সেলটা মূলত তখন থেকেই শুরু আর ৫ মাসের ব্যবধানে শুধু আচার সেল করেই লাখপতি হয়ে গেলাম।

আপনার মাসে আয় কত?
শামীমা: আমার মাসে ২০-২৫ হাজার টাকা আয় হয়।
আপনার ব্যবসা পদ্ধতি কী?
শামীমা: আমার ব্যবসা পদ্ধতি মূলত অনলাইন ভিত্তিক। তবে এখন সময় আর পরিচিতির সঙ্গে সঙ্গে অফলাইনেও টুকটাক সেল হয়।
শুরুর চ্যালেঞ্জগুলো কী কী ছিল?
শামীমা: আমার কাজ মূলত আচার, আমসত্ত্ব নিয়ে। শুরুর দিকে নিজ এরিয়ার বাইরে কুরিয়ারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝামেলা পোহাতে হয়েছে, যেহেতু ফুড আইটেম। প্যাকেজিং নিয়েও বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। তবে পরবর্তীতে এই প্যাকেজিং নিয়েই বেশ প্রশংসা পেরেছি। আমার জমানো ৩০০ টাকা দিয়েই শুরু হয়েছিল আমার আনকোরার যাত্রা। যথেষ্ট জ্ঞানের অভাব ছিল, তাই রিস্ক বা স্টক করার ব্যাপারে কিছুটা ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। তেমন কোনো আর্থিক সহায়তা পাইনি কারো কাছ থেকে, আসলে নিতে ইচ্ছে হয়নি আমার। ব্যবসাতে আমি অন্য কারো থেকে এক টাকাও সহায়তা নেইনি। আমি মানসিক সাপোর্টের দিক থেকে অনেক ভাগ্যবান, আমার স্বামী ছাড়াও বন্ধু-বান্ধব, আশেপাশের মানুষের কাছ থেকে পেয়েছি প্রচুর সাপোর্ট, যেটা কিনা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ পায় না।
আপনার কাজ নিয়ে পরিকল্পনা কী?
শামীমা: আমার আনকোরাকে ব্র্যান্ড হিসেবে দেখতে চাই। বাংলাদেশের প্রাণ, রুচির চেয়েও ভালো অবস্থানে থাকবে আনকোরা। আনকোরার মাধ্যমেই যেন আমার মতো আরও মানুষের কর্মসংস্থান করতে পারি, সেই পরিকল্পনা নিয়েই কাজ করে যাচ্ছি। অতি দ্রুতই বাস্তবায়ন করবো।
ব্যবসায় কোন কোন বাধার সম্মুখীন হয়েছেন?
শামীমা: আমি ব্যক্তিগতভাবে তেমন বাধা পাইনি, শুধু আমার বাবা ছাড়া। তারপরও নিজের লক্ষ্য স্থির রেখে চেষ্টা করে গেছি। এখন কিছুটা হলেও সফলতা পেয়েছি। সামাজিকভাবে মেয়ে বা নারী হিসেবে প্রতিটা জায়গায় বাধা পেয়েছি। আমার ব্যবসার কাজগুলো নিজেই করি। বাজার থেকে শুরু করে কুরিয়ার পর্যন্ত। মেয়ে মানুষ বাজারে যাবে, বাইরে যাবে এবিষয় নিয়ে এখনো কথা শুনতে হয়। আসলে এই বিষয়টা একদমই কমন আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে। তবে সব বাধা পেরিয়ে যে ধৈর্য ধরে থাকতে পারে, বিজয়ের হাসিটা সেই হাসতে পারে। আর আমি প্রতিনিয়ত সেই ধৈর্য নিয়েই থাকি।
আপনার পরিবার সম্পর্কে জানতে চাই।
শামীমা: আমার বাবা বিজিবির কর্মকর্তা ছিলেন, মা গৃহিণী। দুই বোনের মধ্যে আমিই ছোট। সবার কাছে আমি বেশ আদরের ছিলাম। বিয়ে হওয়ার পর শ্বশুর বাড়িতেও আমি সবার ছোট বউ, সেখানেও বেশ আদরের। তবে ব্যক্তিগত জীবনে আমি এক মেয়ের মা, আর আমার স্বামী একজন চাকরিজীবী। এই তো আমার পরিবার।
নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য শুরুতে বিনিয়োগ কতখানি সমস্যা বলে আপনি মনে করেন?
শামীমা: নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য শুরুতে বিনিয়োগ খুব একটা সমস্যা বলে আমার কাছে মনে হয় না। কেননা নিজের জমানো টাকা বা টিউশন ফি অথবা নিজের পরিবারের কাছ থেকে নিয়েও শুরু করা যায়। শুধু একটু মাথা খাটিয়ে চললেই অল্প টাকা নিয়েও শুরু করতে পারবেন।
আপনি কী কী আইটেম নিয়ে কাজ করেন?
শামীমা: আমি কাজ করি হোমমেড আচার, আমসত্ত্ব ও হ্যান্ডপেইন্ট পোশাক নিয়ে। আমার সিগনেচার আইটেম আচারের শুটকি।

Print Friendly and PDF

ফেইসবুকে আমরা