এই মাত্র পাওয়া :

ঢাকা, শনিবার, ২৪ জুলাই ২০২১

হামলা, মামলা, কারাগার, রাজপথ ছিল যার নিত্য সঙ্গী

মিসবাহ‘র ৪৫ বছরের রাজনীতির ছন্দপতন?

বিভাগ : ফিচার প্রকাশের সময় :২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ৪:০০ : অপরাহ্ণ

সিলেট ব্যুরো: বাবা আবদুল গফুর আওয়ামী লীগ করতেন। স্বাভাবিক নিয়মে আমাদের পরিবারটি আওয়ামী লীগ ঘরানার। ১৯৭৫ সালের কথা। আমি স্কুলে অধ্যায়ন করি। ছাত্রলীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতেও অংশ গ্রহণ করি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করে খুনিচক্র। সকালে খবরটি পেয়ে অনেকটা ভেঙ্গে পড়ি। যাঁর কারণে আমরা স্বাধীন দেশ পেয়েছে তাঁকে স্বপরিবারে হত্যার বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না। প্রতিবাদের আগুন জ্বলে উঠে শরীরে। কিন্তু কিশোর বয়সে কতটুকু প্রতিবাদ করা যায়? তবে শরীরে প্রতিবাদের রক্ত নিয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয় হয়ে উঠি। আমার পুরো দেহটি হয়ে উঠে সংগ্রামী মনোভাবের। প্রতিটি মিছিল মিটিংয়ে নিজকে উপস্থিত রাখতাম। জিয়ারউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর প্রথম কারাগারে নিক্ষিপ্ত হই। আমার জীবনে শুরু হয় মামলা আর কারাজীবনের। শতশত মামলার আসামি হয়েছি। যৌবনের প্রায় সাতটি বছর কাটাতে হয়েছে কারাগারে। আমি মুজিব সৈনিক আজো আছি আওয়ামী লীগের সাধারণ কর্মী হয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনার ছায়াতলে। দৈনিক বায়ান্ন-কে দেয়া বিশেষ সাক্ষাতকারে আওয়ামী লীগের সদ্য সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ রাজনৈতিক জীবন নিয়ে কথা বলেছেন খোলামেলাভাবে। সাক্ষাতকার নিয়েছেন দৈনিক বায়ান্ন-এর সিলেট বিভাগীয় ব্যুরো প্রধান। সিলেটের ঐতিহ্যবাহি মদন মোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে প্রথমবারের মতো ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন তিনি। ছিলেন সিলেট জেলা ছাত্রলীগের প্রথমে সাধারণ সম্পাদক পরে সভাপতি। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে সদস্য হিসেবে তিনবার স্থান করে নিয়েছিলেন। সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন দুই বার। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মনোনিত হন। তিনবার ওই দায়িত্ব পালন করেছেন ২০১৯ সাল পর্যন্ত। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে দুই বার মেম্বার নির্বাচিত হন। শিক্ষা জীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এলএলবি পাস করেন ১৯৮৮। সিলেট জজ কোর্টে আইনজীবী হিসেবে যোগদান করেন ১৯৯০ সালে। হাই কোর্টের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভূক্ত হন ১৯৯৪ সালে। এর আগে ১৯৯২ সালে সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে সহ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার স্পেশাল পিপি নিযুক্ত হন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আবার পাবলিক প্রসিকিউটর নিযুক্ত হন। দায়িত্ব পালন করেছেন চলতি মাস পর্যন্ত। মহাত্মা গান্ধী ট্রাস্টি বোর্ডের সম্মানিত সদস্য এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। জিয়ার রহমানের শাসন আমল, এরশাদের শাসন আমল ও বেগম খালেদা জিয়ার শাসন আমলে সিলেটের রাজপথে প্রতিটি মূহুর্তে জ্বলে উঠতে দেখা গেছে এডভোকেট মিসবাহকে। জিয়ার শাসন আমল সম্পর্কে বলতে গিয়ে এডভোকেট মিসবাহ বলেন, মনের মধ্যে ছিল সংগ্রামী মনোভাব। বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের বিচার নিশ্চিত করার আন্দোলনে নিজকে সব সময় উজার করে দিয়েছি। যার জন্যে জিয়ার শাসন আমলের সময় আমাকে প্রথম কারাগারে যেতে হয়েছে। এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর, এই স্বৈরাচরের পতনের জন্যে প্রতিটি মিছিল মিটিংয়ে আমার উপস্থিতি ছিল নিশ্চিতভাবে। স্থানীয়ভাবে আন্দোলন সংগ্রামের পরিকল্পনা নিতাম আমরা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। স্বৈরাচার এরশাদের জমানায় করাগারে বসে এলএলবি পরীক্ষা দিতে হয়েছে এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজকে। এডভোকেট মিসবাহ বলেন, জিয়ার ছত্রছায়ায় খুনী মোস্তাক সারাদেশে সভা সমাবেশ করতে থাকে। ১৯৮৪ সালে বঙ্গবন্ধুর খুনি চক্রের হোতা মোস্তাক সিলেটে সমাবেশ আয়োজন। স্থান নির্ধারণ করা হয় সিলেট আলীয় মাদরাসা মাঠ। ছাত্রলীগ পরিকল্পনা নেয় মোস্তাককে কোনোভাবে সিলেটের মাটিতে সমাবেশ করতে দেয়া হবে না। সমাবেশের দিন মোস্তাক আলীয় মাদরাসা মাঠের মঞ্চের উঠতেই হামলার শিকার হয়। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মোস্তাককে বেদম মারপিট শুরু করে। পরে পুলিশ বিডিআর উদ্ধার করে মোস্তাককে। জ্বালিয়ে দেয়া হয় মঞ্চ। সেখানে এঢভোকেট মিসবাহর নেতৃত্বে সমাবেশ করে ছাত্রলীগ। এডভোকেট মিসবাহ বলেন, কয়েক ঘন্টার মাথায় তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। অন্ধকার কক্ষে নিয়ে বেদম মারপিট করে জিয়ার পুলিশ বাহিনী। সেইদিনের নির্যাতনের কথা মনে হলে আজো শরীরের রক্ত হিম হয়ে যায়। ওই গ্রেফতারের পর ১৭ মাস বন্দী জীবন কাটিয়েছেন কারাগারে। মোস্তাকের উপর হামলার ঘটনাকে বড় সফলতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের কোথায়ও খুনি মোস্তাক বাধার সম্মুখিন হয়নি। কিন্তু সিলেটের মাটি থেকে বিদায় নিয়েছেন মারপিটের শিকার হয়ে। বলা যায় মোস্তাকের বিচার শুরু হয়েছিল সিলেটের মাটি থেকে। এডভোকেট মিসবাহ বলেন, আমি পদ পদবীর আকাঙ্খায় ছিলাম না। আমার টার্গেট ছিল বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। এই দুইটি ইস্যুতে আমি ছিলাম অবিচল। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার হয়েছে। বিচার হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের। অনেকের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। অনেকের বিচার এগিয়ে চলেছে দ্রুত গতিতে। বিচার দেখে যেতে পারছি-এটা আমাদের জন্যে বিশাল অর্জন। জিয়ার আমলের হামলা মামলা আর কারাজীবনের শেষ না হতেই এরশাদ আমলের একের পর এক মামলা আর হুলিয়া মাথায় নিয়ে ঘুরতে হতো মিসবাহকে। এই সময়ে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে প্রায় ৫০টি। এরশাদ সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় আসেন বেগম খালেদা। খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসার এডভোকেট মিসবাহ রাজনৈতিক সহকর্মীদের নিয়ে রাস্তায় অবস্থান নেন। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি রাজপথে আন্দোলন করে গেছেন। গ্রেফতার হয়ে গেছেন কারাগারে। বেগম খালেদা জিয়ার ওই শাসন আমলে উপহার হিসেবে আসামি হয়েছেন ৪২ টি মামলার। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি সকল মামলা থেকে বেকসুর খালাস পান। ২০০১ সালে আবার ক্ষমতার পালাবদল হয়। চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসে। মিসবাহ বলেন, আমরা আবারও আন্দোলন সংগ্রাম শুরু করি বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার দাবিতে। যার জন্যে আবারও আমাদের উপর হামলা, মামলা শুরু হয়। বেশ কয়েকটি মামলার আসামি হতে হয় আমাকে। সর্বশেষ আমাকে কারাগারে যেতে হয়েছে জরুরি অবস্থার সময়। আমরা ৪০ জন নেতা শহরতলির বটেশ্বর এলাকার একটি বাসায় নিমন্ত্রণ খেতে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে আমাদের সবাইকে গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষিপ্ত করে। ২০০৪ সালে সিলেট নগরীর তালতলায় গুলশানে গ্রেনেড হামলা হয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উপর। আহত হয়েছিলেন এডভোকেট মিসবাহও। এই হামলায় প্রাণ হারান আওয়ামী লীগ নেতা মো. ইব্রাহিম। ২০০৬ সালে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতা ত্যাগ করার পরপরই সিলেটে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা রাজনৈতিক বিপ্লব সৃষ্টি করেছিল। ঘটনার দিন সন্ধ্যার কিছুটা পরপরই আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের হাজার হাজার নেতাকর্মী সিলেটের ঐতিহ্যবাহী কোর্ট পয়েন্ট এলাকায় অবস্থান নেন। তাদেরকে ঘিরে ফেলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিএনপি ও জামায়াত শিবির। টানটান উত্তেজনা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বারবার আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সরে যেতে বলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ থেকে বলে দেয়া হয়, গণতন্ত্র পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তারা ঘরে ফেরবেন না। সাবেক সিটি মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান, এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ ও প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা ইফতেখার হোসেন শামীম নেতাকর্মীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছেলিনে। নেতাকর্মীদের সুসংগঠিত করে রাখার জন্যে সব কৌশল প্রয়োগ করছিলেন। এক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ও অন্য দুইটি দলের নেতাকর্মীরা পিছু হটে। এ প্রসঙ্গে এডভোকেট মিসবাহ বলেন, সেদিন হাজার হাজার মানুষও আমাদের সাথে মিলিত হয়েছিল। আমাদের অবস্থান থেকে যখন কেউ আমাদের সরাতে পারেনি তখন বুঝলাম আমাদের বিজয় হয়েছে। তিনি বলেন, সেদিনের দিনটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ বলেন, আমি দীর্ঘ ৪৫ বছর রাজনীতি করছি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ লালন করে চলেছি। এখন কাজ করছি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার স্লোগান নিয়ে। জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে যা দিয়েছেন তা অনেক অনেক। আমি কোনোদিন কোনো কিছু পাওয়ার আশায় রাজনীতি করিনি। জরুরি অবস্থার সময় অনেক লোভলালসা দেখানো হয়েছে। সব ফিরিয়ে দিয়েছি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমি বেঁচে থাকতে চাই আওয়ামী লীগের কর্মী হয়ে। শেখ হাসিনার একজন কর্মী হয়ে।

Print Friendly and PDF

ফেইসবুকে আমরা