এই মাত্র পাওয়া :

ঢাকা, শনিবার, ২৪ জুলাই ২০২১

কি হবে  উচহ্লা ভান্তের হাজার কোটি টাকার অর্থ-সম্পদের !

বিভাগ : এক্সক্লুসিভ প্রকাশের সময় :১১ মে, ২০২০ ২:২৯ : পূর্বাহ্ণ

 
 
জহির রায়হান, বান্দরবান: 
তান্ত্রিকতার সময় থেকে শুরু করে ভিক্ষু জীবনকাল পর্যন্ত স্বর্ণ জাদি, রাম জাদি, নন্দগ্রী জাদিসহ দেশে-বিদেশে হাজার কোটি টাকার অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছিলেন প্রয়াত উচহ্লা ভান্তে। এসব অর্থ-সম্পদ সম্পূর্ণ রূপে নিজেদের কবজ্বায় নিতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে গুটি কয়েক শিষ্য।
এদিকে ভান্তে প্রয়াত হওয়ার পর থেকেই ঐসব স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ পরিবার-পরিজন বা অন্য কেউ ভোগ করতে পারবে না। বুদ্ধ ধর্মীয় নিয়মনীতি অনুযায়ী সমস্ত পরিসম্পদের মালিক এখন ভিক্ষু সংঘ, বলে দাবী করেছে স্থানীয় বৌদ্ধ ভিক্ষুরা। এছাড়াও এসব স্থাপনা ও পরিসম্পদ রক্ষায় এবং পরিচালনায় একটি শক্তিশালী কমিটি বা ট্রাস্টি বোর্ড গঠনের দাবী জানিয়েছেন স্থানীয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা।
স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্বর্ণ জাদি, রাম জাদি, নন্দগ্রী জাদি, শিশু আশ্রম প্রতিষ্ঠান এবং মিয়ানমার, ভারতসহ দেশ-বিদেশে উচহ্লা ভান্তের এক থেকে দেড় হাজার কোটি টাকার অর্থ-সম্পদ রয়েছে। এছাড়াও শিষ্যদের দাবী খিয়ংওয়াক্যং (রাজগুরু বৌদ্ধ বিহার)এ উচহ্লা ভান্তের কিছু পরিসম্পদ রয়েছে।
বৌদ্ধ ভিক্ষুরা জানান, ঐসব স্থাপনা সবই তৈরি করা হয় স্থানীয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ও বিদেশের বৌদ্ধধর্ম ভিত্তিক রাষ্ট্র এবং সেদেশের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের দানের টাকা, স্বর্ণ-রৌপ্যসহ বিভিন্ন মূল্যবান দ্রব্যাদি দিয়ে। তারা বলেন, ভান্তে প্রয়াত হওয়ার সাথে সাথে সমস্ত পরিসম্পদ ভিক্ষু সংঘের মর্মে পরিগণিত হবে সেটাই নিয়ম। বর্তমান সময় থেকে ভান্তের সকল স্থাবর-অস্থাবর পরিসম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য ভিক্ষু সংঘের নেতাদের প্রতি আহবান জানিয়ছেন স্থানীয় বৌদ্ধ ভিক্ষুরা।
এদিকে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পরিসম্পদগুলো ও ক্ষমতা নিজের আয়ত্বে নিতে নানান ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে পড়েছে শিষ্য ও সহযোগিরা। এরঅংশ হিসেবে গত ৪ই মে সোমবার বিকালে উচহ্লা ভান্তের শিষ্যরা রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলার বাঙ্গালহালিয়া ক্যাং এর (বিহার) গোপন বৈঠকে মিলিত হয় ভান্তের অন্যতম সহযোগি থোয়াইংচ প্রু মাষ্টার, বাংলাদেশ ব্যাংক এর কর্মকর্তা মং ক্য শৈনু নেভী ও বাঙ্গালহালিয়া আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা ভদন্ত ক্ষ্যামা থারা মহাথেরসহ কয়েকজন ভান্তে ও শিষ্য।
এঘটনা জানাজানি হলে স্থানীয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বান্দরবান শহরের ঐতিহ্যবাহী খিয়ংওয়াক্যং বিহার কমিটির সবাইকে এবং বৌদ্ধ ভিক্ষু পরিষদ ও জেলার বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সিনিয়র নেতাদের না জানিয়ে অত্যান্ত গোপনীয়তা অবলম্বন করে এক গোপন বৈঠকের আয়োজন করেন ভান্তের শিষ্যরা।

ধারাবাহিক প্রতিবেদন-৮   

যা খুবই দুঃখজনক। উক্ত বৈঠকে তারা প্রয়াত উচহ্লা ভান্তের প্রধান শিষ্যকে মিয়ানমার থেকে নিয়ে এসে বান্দরবানের শতবর্ষীয় ঐতিহ্যবাহী খিয়ংওয়াক্যংসহ স্বর্ণজাদি, রামজাদি ও বিভিন্ন জাদিতে তাদের কৃতিত্ব প্রতিষ্ঠা করে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। সে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে উচহ্লা ভান্তের উক্ত প্রধান শিষ্য মিয়ানমার থেকে দেশে ফিরিয়ে আনেন। ০৬ই মে বুধবার দিবাগত রাতে তিনি বান্দরবান জেলা শহরে প্রবেশ করেন। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, উক্ত শিষ্য বর্তমানে উজানীপাড়াস্থ ক্যাং এর হোম কোয়ারেন্টাইনে রয়েছে।
অন্যদিকে জেলায় বিহারের নেতৃত্ব বৌদ্ধ ভিক্ষু পরিষদ নির্ধারণের নিয়ম থাকলে তার এই নিয়ম অমান্য করে মিয়ানমার থেকে ভিক্ষু এনে নেতৃত্বে বসানোর বিষয়টিকে গভীর ষড়যন্ত্র হিসাবে দেখছে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা। আগামীতে ঐসব স্থাপনায় নেতৃত্ব নিয়ে অশান্তি-বিশৃংঙ্খলা ও অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
স্থানীয় উখ্যানু মার্মা বলেন, ভান্তের মৃত্যুর রহস্য নিয়ে শিষ্যরা যা করছে তা কখনো কাম্য নয়। বিহার নিয়ে এখন যা শুরু করেছে সেটিও কোন ভাবে মানা যায়না।
কুহালং ভাঙ্গামুড়া বৌদ্ধ বিহারের বিহারাধ্যক্ষ ভদন্ত ঞানা মহাথের জানান, যে কোন ভদন্ত প্রয়াণের পর যাবতীয় স্থাপনা ও পরিসম্পদ তার পরিবার-পরিজন ভোগ করার কোন নিয়ম নাই। বিনয় নীতি অনুযায়ী উচহ্লা ভান্তে সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর পরিসম্পদ সবই ভিক্ষু সংঘের মর্মে পরিগণিত হয়েছে। সে রীতিনীতি অনুযায়ী ঐসব স্থাপনায় পরিচালনায় বর্তমানে যারা সংশ্লিষ্ট রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ঐসব পরিসম্পদের রূপরেখা সর্ম্পকে ভিক্ষু সংঘের কাছে উপস্থাপনের জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। এছাড়াও সংশ্লিষ্ট ভিক্ষু, শিষ্য ও পরিবারের সদস্যদের অনাকাঙ্খিত ও ধর্মীয় রীতির বহির্ভূত কার্যক্রম গ্রহণ ও হস্তপেক্ষ হতে বিরত থাকতে আহবানও জানান।
এব্যাপারে সার্ক হিউম্যান রাইটার্স ফাউন্ডেশন সাধারণ সম্পাদক অংচমং মারমা বলেন, গুরু ভান্তে (উচহ্লা ভান্তে) যেসব স্থাপনা সৃষ্টি করে গেছে। তারমধ্যে অনেকগুলো স্থাপনা জেলার ঐতিহ্য বহন করছে। তিনি জীবদ্দশায় নিজেই হাতে সেগুলোকে সু-শৃংখল ভাবে পরিচালনা করেছেন। এসব পরিসম্পদ রক্ষায় একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করা না’গেলে এসব ঐতিহ্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভবনার বেশি বলে আশংকা প্রকাশ করেন তিনি। পরিসম্পদগুলো সু-শৃংখল ভাবে পরিচালনায় শক্তিশালী একটি কমিটি বা ট্রাস্টিবোর্ড গঠনের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে আহবান জানিয়েছেন মানবাধিকার সংগঠেনর নেতা অংচমং মারম।
আলাপকালে ১৪তম বোমাং রাজা মংশৈপ্রু’র পুত্র হেডম্যান নুমংপ্রু বলেন, ধর্মীয় রীতি অনুসারে যে কোন প্রয়াত ভান্তের সমস্ত পরিসম্পদ বৌদ্ধ সম্পদে পরিনত হয়। তা পরিবার-পরিজন বা অন্য কেউর অধিকার থাকে না। তিনি বলেন, জেলা পরিষদ, বৌদ্ধ ভিক্ষু সংঘ, ভিক্ষুরা দায়িত্ব নিয়ে এসব সম্পদ সংরক্ষণ ও সু-শৃংখল ভাবে পরিচালনা করলে ভালো হয় বলে আমি মনে করি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উচহ্লা ভান্তের মরদেহ চট্টগ্রামের রাউজানের খৈয়াখালি থেকে বান্দরবানে ফিরিয়ে আনা এবং  পরিসম্পদ গুলো সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ বিষয় নিয়ে গত ১৪এপ্রিল ও ১৯এপ্রিল দুই দফায় পার্বত্য জেলা পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত বৈঠকেও কুহালং ভাঙ্গামুড়া বৌদ্ধ বিহারের বিহারাধ্যক্ষ প্রয়াত ভান্তের পরিসম্পদের বিষয়গুলো উপস্থাপন করেন। এছাড়াও বাঘমারা বৌদ্ধ বিহারের বিহারাধ্যক্ষ উ: সা:মা মহাথের দাবী জানিয়ে বলেন, রাজগুরু বিহারের স্থাবর-অস্থাবর পরিসম্পদ ব্যবহার, সংরক্ষণ যথাযথ ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা হবে। তবে বাদবাকী স্থাপনা পরিচালনার বিষয়ে ভিক্ষুসংঘের সম্পৃক্ততা থাকবে কিনা তিনি অবগত নন বলে জানান।
তুখ্যংপাড়া বিহারাধ্যক্ষ ভদন্ত ওয়া সাওয়া ও ওয়াব্রাইংপাড়া বিহারাধ্যক্ষ ইন্দশ্রী ভিক্ষুও বৌদ্ধ রীতিনীতি বিকৃতি না করার জন্য পরিবারের সদস্য ও সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহবান জানান।
বৈঠকে রাজগুরু বিহার পরিচালনা কমিটির সভাপতি থোয়াইংচপ্রু মাস্টারও এপরিস্থিতিতে বিহারের স্থাবর-অস্থাবর পরিসম্পদ রক্ষণাবেক্ষণে ক্যাং কমিটির করণীয় কি হবে, সে বিষয়ে ভিক্ষু সংঘের সুস্পষ্ট মতামত ও সিদ্ধান্ত জানাতে আহবান জানিয়েছেন।
উচহ্লা ভান্তের অন্যতম শিষ্য ও রাজগুরু বৌদ্ধ বিহার পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক বাচমং মারমাও জানান, রাজগুরু বিহারের প্রয়াত ভান্তের পৈতৃক দানকৃত জমিতে নির্মিত ক্যাংসহ স্বর্ণজাদি, রামজাদি, নন্দগ্রী জাদি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এছাড়াও প্রয়াত উচহ্লা ভান্তের নিয়ন্ত্রণাধীন বার্মা সরকার কর্তৃক দানকৃত রেঙ্গুনে ১টি মংডু টাউনশিপে ১টি এবং ভারতের বৌদ্ধগয়া ও বারাসাত, কলকাতায় একটি করে প্লট ক্রয় করেছে বলেও বৈঠকে সকলকে অবহিত।
এব্যাপারে আলাপকালে পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্লা এপ্রতিবেককে জানান, উচহ্লা ভান্তের মরদেহ জেলায় ফিরিয়ে এনে বুদ্ধের রীতি অনুযায়ী ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে শেষকৃত্য সম্পাদনের চেষ্টা চালাচ্ছে জেলা পরিষদ। তবে এখনো চূড়ান্ত কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারলেও সম্মিলিতভাবে এবং সকলের অংশগ্রহণসহ সবকিছু সুষ্ঠু সমাধানে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও জানিয়েছেন পরিষদ চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্লা।
প্রসঙ্গত, শারিরীক অসুস্থতা নিয়ে গত ১০ এপ্রিল উ পঞ্ঞা জোত মহাথেরো (উচহ্লা ভান্তে)কে বান্দরবান থেকে চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়। কিন্তু সেদিন তার মৃত্যু হয়েছে বলে বান্দরবানের সিভিল সার্জন জানালেও তার শিষ্যরা দাবি করেন, তিনি ১৩এপ্রিল সকালে মারা গেছে। এরপর অনেকটা গোপনে তার মরদেহ বান্দরবান না এনে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার খৈয়াখালি বৌদ্ধ বিহারে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে সেখানে উচহ্লা ভান্তের মরদেহ রয়েছে।
আগামী ৯ম পর্বে পড়ুন-উচহ্লা ভান্তেকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে 
শুরু হয়েছে নতুন  বিতর্ক, সে কাহিনী।  
……………………………………………………………

Print Friendly and PDF

ফেইসবুকে আমরা