এই মাত্র পাওয়া :

ঢাকা, শনিবার, ২৪ জুলাই ২০২১

” মায়া ” (৬ষ্ঠ পর্ব)

বিভাগ : কলাম প্রকাশের সময় :১৫ জুলাই, ২০২১ ৪:১২ : অপরাহ্ণ

রঙধনু :

ছোট মামার বাসায় আছে মায়া। এটা নিশ্চিত যে পূর্ব বাংলায় যুদ্ধ শুরু হয়েছে। মা- বাবা আর ছোট ভাইবোনদের জন্য ভয়ানক দুশ্চিন্তা হতে লাগলো মায়ার। আস্তে আস্তে খবর আসা যাওয়াও বন্ধ হযে গেল। মাঝে মাঝে শোনা যায় ওপার থেকে অমুকের আত্মীয় সপরিবারে এসেছেন। কিন্তু মায়ার পরিবারের আসার নাম নেই। রেডিওর খবর উৎকর্ণ হয়ে শোনে সবাই। নতুন আরেকটা স্টেশন ধরা যাচ্ছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। যেখানেই পূর্ব বাংলা থেকে মানুষ আসার খবর পাওয়া যায়, ছোটমামা ছুটে যাচ্ছেন। কিন্তু বোনের পরিবারের কাউকে পাওয়া যায় না।

একজন জ্যোতিষি আসেন মাঝে মধ্যে। মামী তাকে দিয়ে গণনা করালেন, মায়ার পরিবারের সবাই বেঁচে আছে কি না। এদিকে স্বাধীন বাংলা বেতারে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে পূর্ববাংলার নাম হয়েছে বাংলাদেশ। সাধারণ মানুষ পাকিস্তানিদের হাতে সাংঘাতিক নিপিড়ীত হচ্ছে। দেশ ছেড়ে আসা লোকদের কাছ থেকে যেসব খবর পাওয়া যাচ্ছে তাতে অশান্তিতে মায়ার দিনগুলো কঠিন হয়ে উঠলো।

মায়ার বাবা সুপরিচিত হোমিও চিকিৎসক। তাঁর বাবাও ছিলেন নামকরা কবিরাজ। লোকে বাড়ির নাম কবিরাজ বাড়ি- ই দিয়ে দিয়েছে। দরিদ্ররা পয়সা না থাকলেও অসুখে ঔষধ নিতে আসতে দ্বিধা করে না। নাম ও স্বভাব দুটোই তাঁর দয়াময়। এমন একজন মানুষ যে সবার প্রিয় হবেন এ আর আশ্চর্য কি! সংগ্রাম আরম্ভ হবার পরে গ্রামের মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। এখনও হানাদাররা এ গাঁয়ে আসেনি। কিন্তু আশেপাশের গ্রামের ঘটনা শুনে সবাই ভয়ে অস্থির হয়ে আছে। বিশারদ বাড়ির সবাই ইন্ডিয়া চলে গেছেন। যাবার পথে এক জায়গায় নাকি পাকিস্তানিদের হাতে পড়েছিলেন। যে সব টাকা পয়সা সোনাদানা তারা বালিশ ও জুতার মধ্যে করে নিয়ে যাচ্ছিলেন সে সব রেখে দিয়ে খুব মারধোর করে কেন জানি ছেড়ে দিয়েছে। টাকা যায় যাক্, প্রাণ যে রক্ষা পেয়েছে, এটাই অনেক। মনে হয় অনেক টাকা – সোনা পেয়ে তাদের মন গলেছে। কেউ বলছে আয়ু ছিল ওদের। নইলে এমন বাঁচা বাঁচতো না। গ্রামের অনেক হিন্দু পুরুষমানুষই আজকাল লুঙ্গি পরছে। অনেকে এসে বলছে,

” কবিরাজ মশাই, ( ছেলেও বাবার মতো কবিরাজ নাম পেয়েছেন লোকের কাছে) সব সময় বাড়ির সামনে ডিসপেন্সারিতে থাকেন, পাকিস্তানিরা এলে আপনার ধুতি দেখামাত্র গুলি করে দেবে। ছেলেমেয়েগুলোর কথা একবার ভাবেন।ধুতি ছেড়ে ক’দিন লুঙ্গি পরেন। “

শুনে তিনি বলেন, ” ঈশ্বর রক্ষা না করলে কি আর লুঙ্গি পরে রক্ষা পাব?”

একদিন বড় ছেলে নিতু বাড়ি নেই। সে এবার আই. এ. পরীক্ষা দিয়েছে। খবর আসলো গ্রামে মিলিটারি ঢুকেছে। ওরা মহিউদ্দিনের বাড়ি গেছে। কবিরাজ বাড়ির ঠিক পিছনেই ওদের বাড়ি। দু’বাড়ির যাওয়া আসার একটা গলি রাস্তা আছে। তবে দুজন মিলিটারি ঢুকেছে ওদের সদর রাস্তা দিয়ে। ওরা খবর পেয়েছে, মহিউদ্দিনের মামা যিনি পাকিস্তান আর্মি তে ছিলেন, যুদ্ধ শুরু হতেই ব্যারাক থেকে পালিয়ে গেছেন, তিনি এখন বোনের বাড়িতে লুকিয়ে আছেন। শিঘ্রই মুক্তি বাহিনীতে যোগ দেবেন। তাঁকে ধরতেই এরা এসেছে। একটু আগেই মায়ার ছোট বোন মলয়া ওবাড়িতে গিয়েছিল সবচে ছোট বোন মনিকে কোলে নিয়ে। মাত্র পাঁচ মিনিট আগে সে ফিরে এসেছে। ওদের বাড়িতে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ মানুষ কেউ নেই। নারী ও শিশুরা শুধু। আট নয় বছর বয়সী মহিউদ্দিনই সবচে বড় ছেলে। ওর বড় বোন হাফছা, অত্যন্ত সুন্দরী তরুণী। বোরখা পরে ঘরের কোনে বসেছিল। তল্লাশি করতে করতে মিলিটারিরা ঘরে ঢুকা মাত্র সে জানালা দিয়ে এক লাফে বের হয়ে বাড়ির পিছনের জঙ্গলে ঢুকে গেল। প্রথমে ভেবেছিলো ওরা যদি ঘরে না ঢুকে তবে ঐ ঘন জঙ্গলে না গেলেই ভালো। কিন্তু ওদের ঘরে ঢুকতে দেখে তড়িৎ সিদ্ধান্ত নিল, এই হানাদারদের হাতে পড়ার চাইতে জংলি জানোয়ারদের হাতে মরা সম্মানজনক। মিলিটারিরা জঙ্গলে কিছুটা খোঁজাখুজি করে হাল ছেড়ে দিল। এই পরিবারটির উপর ঈশ্বরের অশেষ কৃপায় ওরা কি মনে করে আর কাউকে মারধোর না করে গলি রাস্তাটা ধরে রওয়ানা হলো। এই রাস্তা কবিরাজবাড়ি ঘেষে সদর রাস্তায় পড়েছে। এ রাস্তা দিয়ে কবিরাজবাড়ি ঢুকতে হয় ঠাকুরঘরের পাশ দিয়ে। ঠাকুরঘরটি বসতঘরের মতোই বড় ঘর। পিছন দিক থেকে দেখে কিছু বোঝা যায় না। বাড়িতে ওঠার মুখেই একটা প্রকান্ড বড় কাঠাল গাছ আছে। মিলিটারি দুজন এসে ঐ গাছটিতে হেলান দিয়ে বসল। ডিসপেনসারি ঘরের ভেতরে তখন অনড় হয়ে বসে আছেন দয়াময় ডাক্তার ও গ্রামের তিন চারজন লোক। সবাই যেনো নিঃস্বাস বন্ধ করে আছেন। ওরা দুজন গাছ থেকে উঠে দশ কদম এগুলেই দেখবে ওদের ডান পাশের ঘরটি ঠাকুরদালান। ডিসপেনসারির পিছনের উঠানের দিকের খোলা দরজাও তখন ওদের চোখে পড়বে। ডিসপেনসারির বাম পাশে কোনো জানালা নেই বলে ঘরের লোকজন ও মিলিটারিরা কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছে না।

সামনের দরজাটি দিয়ে বাড়ির সামনের অংশ ও সদর রাস্তাটা দেখা যায়। বাড়ির উঠানে ঢুকলেও ওরা বুঝবে এটা হিন্দু বাড়ি। শোবার ঘরে পালঙ্কের উপর সব ছেলেমেয়েকে নিয়ে মা বসে আছেন। ছ’সাত বছর বয়সী সবচে’ ছোট ছেলে পুলকও কোনো শব্দ করছে না। ওর পিঠাপিঠি বড়ভাই হাবুল এমনিতে ছটফটে হলেও এখন চুপচাপ বসে আছে। একটু বড় ভাইবোন বাবুল, মলয়া ও মীরার আতঙ্কিত চেহারা ওদের মনেও ত্রাসের সঞ্চার করেছে। শুধু মনিটা একদম ছোট বলে কিছু বোঝে না। ভাগ্যিস সে ঘুমিয়ে পড়েছে মায়ের কোলে। বড় ছেলে নিতু বাড়ি নেই, যে কোনো সময় চলে আসবে। যদি সদর রাস্তা দিয়ে ঢুকে, তাহলেও মিলিটারিরা দেখতে পাবে। প্রচন্ড আতঙ্কে সবাই নিঃস্বাস বন্ধ করে বসা। ( ক্রমশ)

লেখক: সাহিত্যিক

Print Friendly and PDF

ফেইসবুকে আমরা