পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক ৩ মাস ২০ দিন ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত, তারপরেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না দেবীগঞ্জ উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার।
দেবীগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আজমল হোসেন জানান, ২ মাস বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকলে উপজেলা শিক্ষা অফিসার ব্যবস্থা নেবেন। এর মধ্যে ওই শিক্ষক মেডিকেলসহ নানা কারণে অনুপস্থিত থাকতে পারেন। তবে ২ মাসের বেশি অনুপস্থিত থাকলে ব্যবস্থা নেবেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার। ওই শিক্ষকের সাধারণ ভাবে বেতন-ভাতা বন্ধ করে উপজেলা শিক্ষা অফিসার আজমল হোসেন তাঁর দায় এড়াতে পারেন না।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানা যায়, বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা শিক্ষকদের শাস্তি এবং তাঁদের দেখভাল করার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রণালয়। এ ছাড়াও সব জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে এ ধরনের অননুমোদিত অনুপস্থিতির বিষয়ে আগামী সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে অনুরোধ করা হয়েছে। ২৪ আগস্ট মন্ত্রণালয়ের বিদ্যালয়-১ অধিশাখা থেকে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে পাঠানো হয়েছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ কামাল হোসেনের সই করা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সম্প্রতি বিভিন্ন দায়িত্বশীল সূত্রে জানা যাচ্ছে যে, দেশের বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত কতিপয় শিক্ষক অনুমোদন ব্যতীত কিংবা অনুমোদিত ছুটি শেষ হওয়ার পরও কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকছেন। এর ফলে শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা লঙ্ঘিত হচ্ছে। এটি সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ এবং সরকারি কর্মচারী (নিয়মিত উপস্থিতি) বিধিমালা, ২০১৯ এর সংশ্লিষ্ট বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে লক্ষ করা যাচ্ছে যে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত শিক্ষক বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। এর ফলে বিদ্যালয়ে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনায় বিঘ্ন ঘটছে এবং যথাযথ ভাবে একাডেমিক সুপারভিশন হচ্ছে না। এ ধরনের অনিয়মের বিষয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হচ্ছে না। ফলে দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে প্রধান শিক্ষক, সংশ্লিষ্ট ক্লাস্টারের সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা কোনো ভাবেই এর দায় এড়াতে পারেন না।
এ অবস্থায় অননুমোদিত ভাবে অনুপস্থিত শিক্ষকসহ দায়িত্বে অবহেলাকারী সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর সংশ্লিষ্ট বিধি অনুসারে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে অনুরোধ করা হয়েছে।
দেবীগঞ্জের সদর ইউনিয়নের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাদের মিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এমন ঘটনা ঘটেছে। অনুপস্থিত থাকা ওই সহকারী শিক্ষকের নাম রেদওয়ান আল রুম্মান। তিনি বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষক হিসেবে ২০২৩ সালের ২৪ জানুয়ারি যোগদান করেন। বিদ্যালয়ে যোগদান করার পর থেকে দায়সারা ভাবে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করতেন। ঠিকমতো ক্লাসে পাঠদানও করতেন না।
দেবীগঞ্জ উপজেলার সহকারী শিক্ষা অফিসার শাহাদৎ হোসেন বিদ্যালয়ে তদন্তে আসেন। তদন্তে আসার পর বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য মোশাররফ হোসেন, হাইস্কুল প্রতিনিধি আব্দুল খালেক, প্রধান শিক্ষক জয়নুল আবেদীন, সহকারী শিক্ষক লায়লা পারভীন, তাছমিন আক্তার ও ইসরাত জাহানের কাছ থেকে ওই শিক্ষক অননুমোদিত ভাবে অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেন।
বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য মোশাররফ হোসেন জানান, বিদ্যালয়ে শিক্ষক অনুপস্থিতির কারণে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষা অফিসারকে জানানোর পরেও তিনি কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না।
দেবীগঞ্জ উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার শাহাদাৎ হোসেন জানান, “বিদ্যালয়টি আমার ক্লাস্টারের মধ্যে। এটির অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। ওই শিক্ষক অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি জানার পর আমি চলতি বছরের পহেলা এপ্রিল তদন্ত করে দেবীগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের নিকট তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি।”
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জয়নুল আবেদীন বলেন, “উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের নিকট আবেদন করে জানিয়েছি। এটিও স্যার তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা পেয়েছেন। এখন বিষয়টি উপজেলা ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সিদ্ধান্ত নেবেন।”
অনুপস্থিত থাকা ওই সহকারী শিক্ষক রুম্মান তাঁর স্ত্রীসহ অস্ট্রেলিয়াতে অবস্থান করার কারণে তাঁর বক্তব্য জানা যায়নি। তবে তাঁর মা দেবীগঞ্জ আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাশিদা খানম আলো ছেলে বিদেশে অস্ট্রেলিয়াতে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, “তিন বছর পর্যন্ত দেখবে। তারপর যদি সেটেল হতে পারে তাহলে আর আসবে না। যদি সেটেল না হতে পারে তাহলে চলে আসবে। আসার পরে যদি বিদ্যালয়ে যোগদান করতে পারে তাহলে করবে, আর যোগদান না করতে পারলে রিজাইন দেবে।”
দেবীগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আজমল হোসেন রেদওয়ান আল রুম্মান নামের ওই শিক্ষক অননুমোদিত ভাবে অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিত রয়েছে। আমি আজ বা কাল জেলা শিক্ষা অফিসারকে জানাবো। আপাতত তার বেতন-ভাতা বন্ধ করে দিয়েছি। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পঞ্চগড় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ইয়াকুব জানান, শিক্ষকের অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি তিনি জানেন না। খোঁজখবর নিয়ে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন।