ঢাকা, শুক্রবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ৪ঠা আশ্বিন ১৪৩১

বগুড়ায় ‘নবানের’ মাছের মেলা

বগুড়া প্রতিনিধি | প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার ১৮ নভেম্বর ২০২১ ০৬:৩৬:০০ অপরাহ্ন | দেশের খবর

বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার ‘নবানে’র মাছের মেলা (নবান্নের মেলা)। প্রতিবছর অগ্রাহায়নে নবান্ন উৎসব পালনে সনাতন ধর্মলম্বীদের এই আয়োজন হলেও তা ধর্মীয় বেড়াজালে সীমাবদ্ধ থাকেনা। সনাতন ধর্মালম্বীদের পঞ্জিকা অনুযায়ি বৃহস্পতিবার হয়ে গেল নবানের এই উৎসব মেলা। মেলায় শুধু মাছই নয়, সবধরনের নতুন সবজি ওঠে। আর ছিলো মেলার অন্যতম অনুষঙ্গ নানা ধরুনের মিস্টান্ন থেকে শুরু করে নাগরদোলা,চুরি ফিতার দোকান নিয়ে পরিপুর্ণতা। তবে মাছই এই মেলার প্রধান আকর্ষন। 

শিশু কিশোর থেকে শুরু করে সববয়সী নারী পুরুষের সরব উপস্থিতি মেলায় ছড়ায় উৎসবের আবীর। যা ছড়িয়ে পড়ে আশেপাশের অর্ধশতাধিক গ্রাম জুড়ে। যার যার সামর্থ্য অনুযায়ি মেলা থেকে কেনা কাটা করে অগ্রাহায়নের এই উৎসব ছড়িয়ে দেন সবখানে।

বগুড়া শহর থেকে প্রায় প্রায় ২৫ কিলোমিটার দুররের উথলী বাজারে এই নবানের(স্থনীয় ভাষায়) মেলা বসেছিলো। দিনের আলো আধাঁর দুর করার আগে থেকেই বিক্রেতাদের সমামগম শুরু হয়। মুলতঃ নবান্ন উপলক্ষে মাছের মেলা হলেও দই, মুড়ি, চিড়াসহ নানা ধরনের মিস্টান্ন ও নতুন ওঠা সবধরনের সবজিতে ভরে ওঠে মেলা প্রাঙ্গন। কেউ বলেন, মেলার বয়স ৫০/৬০ কেউবা বলেন,প্রায় শত বছর হতে চললো এই মেলার আয়োজন। তবে আগে এটা তেমন জমজামট না হলেও ২০/৩০ বছর ধরে এটি জমজামাট হয়ে ওঠেছে। এতে বাজারের ইজারদাররা তাকিয়ে থাকেন নবান্নের মেলার দিকে। আশেপাশর প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রামের নানা ধর্ম ও শ্রেনী পেশার মেলার মানুষ ভীড় জমান মেলায়। অনেকে আসেন শুধু মেলা দেখতে।

উথলী গ্রাম ঘিরে আশেপাশের গ্রাম সরকারপাড়া, নারায়নপুর,ধন্দাকোলা, গনেশপুর, দেবীপুর লক্ষীকোলা, গুজিয়া, আকন পাড়া, অর্জুনপুর, গরীবপুরসহ অর্ধশতাধিক গ্রাম ছাড়াও আশেপাশের উপজেলা গুলো থেকেও লোকজন এই মেলায় আসেন। মেলায় আসা কৃষিজীবী মুকুল চন্দ্র জানালেন, তাদের পঞ্জিকা অনুসারে প্রতিবছর ১ অগ্রাহায়ন মেলার আয়োজন হয়ে থাকে। মেলা থেকে ২ হাজার টাকা সদা(কেনাকাটা) করেছেন তিনি। মাছ বিক্রেতা কৃষ্ণ প্রমানিক জানালেন, মেলা সনতান হিন্দু ধমালম্বীদের নবান্নের উৎসব পালনের জন্য আয়োজন হলেও এটি সবার। মেলার ক্রেতা এবং দর্শকদের ২০ শতাংশ সনাতন ধর্মলম্বী। উথলীর এই মেলার উৎসব শুধু মেলা প্রাঙ্গনেই সীমিত থাকে না। আশেপাশের গ্রামে গুলোর বাড়ি বাড়িতে ছড়ায় উৎসবের বর্ণিলতা নিয়ে। প্রতি বাড়িতে জামাইসহ কুটুম আসেন। উপলক্ষ নবানের মাছের মেলা। মেলাতে শতাধিক মাছ বিক্রেতা নানা ধরনের মাছ নিয়ে এসেছিলেন এবার। মাছ বিক্রেতা জাহিদুল জানালেন,মেলায় এবার ২০/২২ কেজি ওজনের নানা ধরেনের মাছ ওঠে। প্রতি মাছের দোকানে দু লক্ষাধিক মাছ বিক্রি হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ২ কোটি টাকারও বেশি মাছ বিক্রি হয় এক দিনের এই মেলায়।  লোকজন মাছ কিনতে আসলেই ‘নবান’ উপলক্ষে সনাতন ধর্মলম্বীরা সব নতুন সবজি ও কৃষি পন্য কেনেন মেলা থেকে।  

পাশের গাবতলি উপজেলার কাগইল গ্রামের বিলকিসের পিতার বাড়ি উথুলীতে। ‘নবানের’( নবান্ন) মেলা উপলক্ষে স্বামী সন্তানসহ এসেছেন মেলাতে। বিলকিসের মা মিনারা বেগম মেয়ে জামাই ও নাতনীদের নিয়ে মেলায় ঘুরছেন এক অন্যরকম আনন্দের আবেশ নিয়ে। ট্রাক চালক  রিপনের উপার্জন যেমনই হোকনা কেন দশ বছরের ছেলে হাবিবুল্লাহকে নিয়ে এসেছিলেন মেলায়। কিনেছেন ২ হাজার একশ’ টাকায় একটি মাছ। মফিজুল হক কল্লোল ৯ কেজি ওজনের কাতল মাছ কিনেছেন প্রায় ৫ হাজার টাকায়। লালদহের ব্যবসায়ী মোকাররম কিনেছেন সাড়ে ৮ হাজার টাকায় একটি বাঘার মাছ।

তারা সকলেই বললেন, শখের বসে মেলা থেকে মাছ কেনা। এরকম প্রায় সবাই মাছ কিনছেন। ভোরের আলো শুরু হওয়ার সঙ্গে মেলা শুরু হলেও বিকাল গড়লেও মেলায় লোকজনের সমাগম আর উৎসবের ঢেউ ছিলো একইরকম। ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেনী পেশার মানুষের সম্প্রীতির মিলন কেন্দ্র হয়ে ‘নবানের ’ এই মেলা ঐতিহ্য সংস্কৃতি আর সম্প্রীতির বন্ধন হয়ে আলোকিত হয়ে ওঠে।