রাষ্ট্রমালিকানাধীন জনতা ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে ঋণ বিতরণে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের অনিয়ন্ত্রিত ঋণ দেওয়ার ফলে ব্যাংকটি বর্তমানে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে। ১০টি শিল্প গ্রুপের কাছে ব্যাংকের মোট ঋণের ৫৫ শতাংশ কেন্দ্রীভূত, যা আদায় না হওয়ায় ৬১ শতাংশ ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে ব্যাংকের কার্যক্রম ও সুনাম—চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ব্যাংকটি লোকসান করেছে ১,৫০৪ কোটি টাকা।
জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান সম্প্রতি সরকারের কাছে দেওয়া এক চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, ব্যাংকটির বর্তমান সংকট ইতিহাসে সবচেয়ে নাজুক। বড় গ্রাহকদের কাছ থেকে ঋণ আদায় না হলে ব্যাংকটির অস্তিত্ব রক্ষা কঠিন হবে। একই পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গেও আলোচনা করা হয়েছে।
ব্যাংক- সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ শিল্প গ্রুপগুলো আগ্রাসী কৌশলে ব্যাংক থেকে বিপুল ঋণ নেয়। সরকারের পরিবর্তনের পর এই বড় ঋণগ্রহীতাদের অনেকে কারাগারে বা দেশের বাইরে চলে গেছেন। এর মধ্যে বেক্সিমকো, এস আলম, বসুন্ধরা, ক্রিসেন্ট, এননটেক্সসহ বিভিন্ন গ্রুপ রয়েছে।
জনতা ব্যাংকের শীর্ষ ১০ গ্রাহকের মধ্যে ৯ জনই এখন খেলাপি।
- বেক্সিমকো গ্রুপ: ২৪,৪৮২ কোটি টাকা ঋণের বেশিরভাগ খেলাপি। গ্রুপটি রপ্তানি আয় দেশে ফেরত আনছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
- এস আলম গ্রুপ: ১০,১০০ কোটি টাকা ঋণ খেলাপি। গ্রুপের সম্পত্তি নিলামে তুললেও আদায় হয়নি।
- এননটেক্স গ্রুপ: ৭,৭৩৮ কোটি টাকা খেলাপি।
- ক্রিসেন্ট গ্রুপ: ৩,৭৮৯ কোটি টাকা খেলাপি।
- বসুন্ধরা গ্রুপ: ২,৫৭৩ কোটি টাকার ঋণের বেশিরভাগই খেলাপি।
এসব গ্রুপের ঋণ আদায়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হলেও কার্যকর ফল আসেনি।
সেপ্টেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের মোট আমানত ছিল ১ লাখ ১১ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা, যার বিপরীতে ঋণ ছিল ৯৮ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা। কিন্তু ৬০ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা ঋণ খেলাপি। ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৩,৯২১ কোটি টাকা।
জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ৬৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। ফলে ২০২৪ সালের শেষে ব্যাংকটির লোকসান হতে পারে ২,৬০০ কোটি টাকা।
জনতা ব্যাংকের নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবর রহমান জানিয়েছেন, খেলাপি ঋণ আদায়ে পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। সরকারের সহায়তায় এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সংকট কাটানোর চেষ্টা চলছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনগত ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী তদারকি ছাড়া এই সংকট উত্তরণ সম্ভব নয়।
বায়ান্ন/এএস