মতামত

আন্তর্জাতিক নারী দিবস: বাংলাদেশের নারীরা কতটা এগিয়েছে?

প্রতি বছর ৮ মার্চ বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়, যা নারীদের অধিকার, সমান সুযোগ এবং ক্ষমতায়নের বার্তা বহন করে। বাংলাদেশও এই দিবসকে ঘিরে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে, যেখানে আলোচিত হয় নারীর অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা। তবে প্রশ্ন থেকে যায়- বস্তুত নারীরা কতটা এগিয়েছে? কর্মক্ষেত্রে তাদের অবস্থান কতটা সুসংহত? পারিবারিক জীবনে তারা কতটা স্বস্তিতে আছে?

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নারীদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিশেষ করে পোশাক শিল্প, কৃষি, ব্যাংকিং, প্রযুক্তি, ও উদ্যোক্তা খাতে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বর্তমানে প্রায় ৩৬%। নারী উদ্যোক্তা হিসেবেও তারা এগিয়ে আসছেন; বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৮% ব্যবসার নেতৃত্ব নারীরা দিচ্ছেন।

তবে, কর্মক্ষেত্রে এখনো নানা চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। বেতনবৈষম্য, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের অভাব, মাতৃত্বকালীন ছুটির সীমাবদ্ধতা এবং যৌন হয়রানির মতো সমস্যাগুলো নারী কর্মীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও সরকার এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যৌন হয়রানি প্রতিরোধ নীতিমালা তৈরি করেছে, বাস্তবায়নের অভাবে অনেক নারী আজও নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে পারছেন না।

নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্রীদের হার ছেলেদের তুলনায় বেশি। সরকার উপবৃত্তি ও বিনামূল্যে বই সরবরাহের মাধ্যমে নারী শিক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। তবে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছেনি। উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর কর্মসংস্থানে প্রবেশের হারও পুরুষদের তুলনায় কম, যার মূল কারণ হচ্ছে সামাজিক ও পারিবারিক চাপ।

পারিবারিক কাঠামোয় নারীদের ভূমিকা যুগ যুগ ধরে অপরিহার্য হয়ে আছে। কর্মজীবী নারীদের জন্য পরিবার এবং কর্মক্ষেত্রের ভারসাম্য বজায় রাখা চ্যালেঞ্জিং। গৃহস্থালি কাজের প্রায় ৮০% নারী সদস্যদের ওপরই বর্তায়, যা তাদের পেশাগত জীবনে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার থেকে পর্যাপ্ত সমর্থন না পাওয়ায় অনেক নারী তাদের কর্মজীবন ছেড়ে দেন।

গার্হস্থ্য সহিংসতাও বাংলাদেশের নারীদের জন্য এক বড় সংকট। ২০২৩ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৭০% নারী কোনো না কোনোভাবে গার্হস্থ্য সহিংসতার শিকার হন। যদিও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আইন রয়েছে, আইনি সহায়তা পেতে অনেক নারী নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন।

বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়লেও তা এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন থাকলেও সরাসরি নির্বাচিত নারীর সংখ্যা কম। স্থানীয় সরকার পর্যায়ে কিছুটা উন্নতি হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্ব পর্যায়ে নারীদের উপস্থিতি সীমিত।

সামাজিকভাবে নারীর ক্ষমতায়নেও কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। মিডিয়া, সংস্কৃতি ও খেলাধুলায় নারীদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ লক্ষণীয়। তবে সামাজিক রক্ষণশীলতা এবং নারীবিরোধী মনোভাব এখনো অনেক ক্ষেত্রে তাদের এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করে।

নারীদের এগিয়ে নেওয়ার জন্য সরকার, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে নারীর জন্য নিরাপদ ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, মাতৃত্বকালীন ছুটির সময়সীমা বাড়ানো, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা, এবং উচ্চশিক্ষা ও প্রযুক্তিখাতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

পরিবার থেকে শুরু করে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় স্তর পর্যন্ত নারীদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে হবে। নারীকে কেবল মা, স্ত্রী বা কন্যা হিসেবে না দেখে একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে মর্যাদা দিতে হবে, যিনি সমান অধিকারে সমাজের সকল স্তরে অবদান রাখতে পারেন।

বাংলাদেশের নারীরা গত কয়েক দশকে অনেক এগিয়েছে, কিন্তু এখনো দীর্ঘ পথ বাকি। কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ, পরিবারের ভেতরে নিরাপত্তা ও সমর্থন এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে পারলেই নারীরা সত্যিকার অর্থে স্বাধীনতা ও ক্ষমতায়নের স্বাদ পাবে। নারী দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি হওয়া উচিত আমাদের চিন্তার পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি।

 



সম্পর্কিত খবর