এক্সক্লুসিভ

কর্মস্থল থেকে উধাও ১৩ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা বরখাস্ত

কর্মস্থল থেকে উধাও ১৩ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে সরকার। গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরে ব্যাপক পরিবর্তন ও টানাপোড়েন শুরু হয়। অনেক পুলিশ কর্মকর্তা কর্মস্থলে যোগ দিলেও কিছুদিনের মধ্যে বেপাত্তা হয়ে যান। কেউ ছুটি নিয়ে বিদেশে চলে যান, কেউ আবার ছুটির আবেদন না করেই কর্মস্থল ত্যাগ করেন। এই পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ১৩ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী পলায়নের অভিযোগ আনা হয়েছে এবং তাদের সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন তিনজন পুলিশ সুপার, আটজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং দুজন সহকারী পুলিশ সুপার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের পুলিশ-১ শাখা থেকে গত ২৬ জুন ১৩টি পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়, যার মাধ্যমে বরখাস্তের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। প্রজ্ঞাপনগুলোতে স্বাক্ষর করেন উপসচিব নাসিমুল গনি।

বরখাস্ত হওয়া পুলিশ সুপারদের মধ্যে রয়েছেন মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন, মো. শাহজাহান এবং গোলাম মোস্তফা রাসেল। ছানোয়ার হোসেন বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত ছিলেন এবং গত ১ জানুয়ারি থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। মো. শাহজাহান চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে ছিলেন এবং ১৬ জানুয়ারি থেকে নিখোঁজ। গোলাম মোস্তফা রাসেলও ১ জানুয়ারি থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। তিনজনকেই সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুসারে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপারদের মধ্যে রয়েছেন এস এম জাহাঙ্গীর হাছান, শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম, এস এম শামীম, ইফতেখায়রুল ইসলাম, মিশু বিশ্বাস, হাসানুজ্জামান মোল্যা, রুবাইয়াত জামান এবং মাসুদুর রহমান। জাহাঙ্গীর হাছান চিকিৎসার জন্য ১৫ দিনের ছুটি নিয়ে থাইল্যান্ড যান এবং পরে সিঙ্গাপুর থেকে ছুটি বাড়ানোর আবেদন করেন। যদিও আবেদন মঞ্জুর হয়েছিল, তারপরও বারবার নোটিশ দিয়েও তাকে কর্মস্থলে ফেরানো যায়নি। শাহ আলম আখতারুল ইসলাম ২৬ জানুয়ারি থেকে, শামীম ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে, ইফতেখায়রুল ইসলাম ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ থেকে, মিশু বিশ্বাস ২৬ অক্টোবর ২০২৪ থেকে, হাসানুজ্জামান মোল্যা ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ থেকে, রুবাইয়াত জামান ২৯ জানুয়ারি থেকে এবং মাসুদুর রহমান ১৩ নভেম্বর ২০২৪ থেকে অনুপস্থিত ছিলেন। তারা প্রত্যেকেই পলায়নের অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন।

সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদমর্যাদার মধ্যে রয়েছেন মো. মাহমুদুল হাসান এবং মো. ইমরুল। মাহমুদুল হাসান রাজারবাগ পুলিশ টেলিকম ভবনে কর্মরত ছিলেন এবং গত বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে অনুপস্থিত। অন্যদিকে ইমরুল কক্সবাজারের উখিয়া এপিবিএনে কর্মরত ছিলেন এবং ২৮ জানুয়ারি থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

এই ঘটনাগুলো থেকে বোঝা যায়, সরকার পতনের পর দেশের প্রশাসনিক কাঠামোতে ব্যাপক ধস নামে, যার প্রতিফলন দেখা গেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন স্তরে। কর্তব্যপরায়ণতার অভাব, শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং বিদেশে পালিয়ে থাকার প্রবণতা এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। এই বরখাস্তের সিদ্ধান্তকে অনেকেই আইনের শাসনের প্রয়োগ এবং সরকারি বিধিমালা রক্ষার অংশ হিসেবে দেখছেন। এতে করে ভবিষ্যতে শৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনা হ্রাস পাবে বলে প্রশাসনের অভ্যন্তরে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, এ ধরনের পদক্ষেপ সাধারণত বহিষ্কারের পূর্ববর্তী ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়। সাময়িক বরখাস্তের পর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হতে পারে এবং তদন্তে দোষ প্রমাণিত হলে স্থায়ী বরখাস্ত বা অন্যান্য প্রশাসনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা এই বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং নিয়ম ভঙ্গকারী যে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত থাকবে।

সরকারি চাকরিতে পলায়ন একটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। কোনো কর্মকর্তা বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করে সাময়িক বরখাস্তের মাধ্যমে পরবর্তী শাস্তিমূলক কার্যক্রম শুরু করা হয়। এই ১৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একই ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। এতে করে প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে যে, দায়িত্বহীনতা ও আইনভঙ্গকারী আচরণ সহ্য করা হবে না।

এই পরিস্থিতির পেছনে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং প্রশাসনের ভেতরের অনিশ্চয়তা বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অনেক কর্মকর্তা হয়তো রাজনৈতিক পালাবদলের ফলে নিজেদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। তবে সরকারি চাকরির শপথ ও নিয়মকানুনের ঊর্ধ্বে গিয়ে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বা বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করছে প্রশাসন। বরখাস্ত হওয়া এই কর্মকর্তাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আসন্ন তদন্ত ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর।

এই ঘটনা দেশের পুলিশ বাহিনীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। সরকার বার্তা দিচ্ছে যে, শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে তারা কঠোর হতে প্রস্তুত। একইসঙ্গে এ ধরনের পদক্ষেপ সাধারণ জনগণের মাঝে আস্থা ফিরিয়ে আনার দিকেও ইঙ্গিত করে। ভবিষ্যতে এই ধরনের অনুপস্থিতি ও দায়িত্বহীনতার ঘটনা রোধে কঠোর নজরদারি এবং নিয়মিত মূল্যায়নের উপর জোর দেওয়ার কথা ভাবছে প্রশাসন।

বর্তমান সরকারের এই উদ্যোগকে কেউ কেউ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ বলেও আখ্যা দিচ্ছেন, তবে সরকারের পক্ষ থেকে বারবারই বলা হচ্ছে যে, এটা প্রশাসনিক শৃঙ্খলা রক্ষার অংশ এবং কারও ব্যক্তিগত পরিচয় বা মতাদর্শ এতে প্রভাব ফেলেনি।

 

সবমিলিয়ে এই ঘটনা দেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে নজিরবিহীন না হলেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।



সম্পর্কিত খবর