ভালোবাসা আর সম্পর্কের আড়ালে চলছে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ভয়াবহ লুটপাট। একদিকে ক্ষমতার অপব্যবহার, অন্যদিকে সেই ক্ষমতার আড়ালে আত্মীয় ও ঘনিষ্ঠজনদের মাধ্যমে দুর্নীতির অর্থ গচ্ছিত রাখার নতুন ট্রেন্ড ধরা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত দুদক কর্তৃক দায়েরকৃত ৩৩টি মামলার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ২৮টি মামলায় অভিযুক্তদের স্ত্রী, প্রেমিকা কিংবা পারিবারিক ঘনিষ্ঠ নারী সদস্যদের নামে শত শত কোটি টাকার সম্পদ অর্জন ও লেনদেনের চিত্র।
সবচেয়ে আলোচিত হচ্ছে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের প্রেমিকা হিসেবে পরিচিত তৌফিকা করিমের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ। তার নামে ৮৮টি ব্যাংক হিসাব থেকে ৩৭৪ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। যেখানে তার বৈধ আয় মাত্র ২ কোটি ৬২ লাখ টাকা, সেখানে সম্পদ দেখানো হয়েছে ৫৬ কোটি টাকা। এ সম্পদের উৎস হিসাবে তিনি কোনো গ্রহণযোগ্য তথ্য দেখাতে পারেননি। অভিযোগ রয়েছে, আনিসুল হকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার সুবাদে তিনি দীর্ঘদিন ধরে নানা সুবিধা নিয়ে এসেছেন এবং তার নামে করা আর্থিক কর্মকাণ্ডে বাস্তব নিয়ন্ত্রণ ছিল সাবেক মন্ত্রীর।
এদিকে সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও তার বিদেশিনী স্ত্রী এমা ক্লেয়ার বার্টনের বিরুদ্ধেও এসেছে কোটি কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ। তদন্তে জানা যায়, এই দম্পতির নামে ১১৩ কোটি টাকার ব্যাংক লেনদেন হয়েছে, যার মধ্যে ৩ কোটি টাকার ওপরে সম্পদ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বলে চিহ্নিত করেছে দুদক। প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, চট্টগ্রামের বিভিন্ন বন্দর-সম্পৃক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা খাতের অনিয়ম থেকে এসব অর্থ এসেছে।
আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে নাজমুল হাসান পাপন ও তার স্ত্রী রোকসানা হাসানকে ঘিরে। বিসিবি সভাপতি এবং সাবেক যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী পাপনের স্ত্রী রোকসানা হাসানের নামে রয়েছে ৩২ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ এবং ৭৪২ কোটি টাকার লেনদেনের রেকর্ড। এসব সম্পদের মধ্যে বিদেশি ব্যাংকে রাখা অর্থ, গুলশান ও বারিধারায় উচ্চমূল্যের অ্যাপার্টমেন্ট এবং নামসর্বস্ব কোম্পানির শেয়ার রয়েছে। পাপনের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক পরিচিতি থাকায় এতদিন এসব তথ্য গোপনই ছিল।
বাংলাদেশ পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আনোয়ার হোসেন ও তার স্ত্রী মাহমুদা আক্তারের বিরুদ্ধেও এসেছে ভয়াবহ অভিযোগ। মাহমুদার নামে রয়েছে প্রায় ১৫ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ, যার কোনোটিরই উৎস জানা যায়নি। বংশাল থানা, কেরানীগঞ্জ এবং গুলশান এলাকায় মাহমুদার নামে জমি, ফ্ল্যাট ও ব্যাংক হিসাবের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। তার স্বামী ডিআইজি পদে থাকাকালীন এই সম্পদের পরিমাণ দ্রুত বেড়ে যায় বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
একইভাবে, দুর্নীতির অভিযোগে চাকরি হারানো ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ইউসুফ আলী সরদারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগেও দেখা যায় তার স্ত্রীর নামে রয়েছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। শুধু স্ত্রীর নামে নয়, একাধিক আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুর নামে জমি, বাড়ি ও গাড়ি ক্রয় করে তিনি নিজের সম্পদ গোপন রেখেছিলেন।
ঢাকা ওয়াসার প্রকৌশলী রাশেদুল হাসান রাজুর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও বিস্ময়কর। তার স্ত্রী ফরিদা ইয়াসমিনের নামে রয়েছে ১১টি বাড়ি, ১টি ফ্ল্যাট ও ৪০ কাঠা জমি। অথচ তার স্ত্রীর নিজস্ব কোনো আয় নেই। এই দম্পতির ব্যাংক হিসাবে ২০ কোটিরও বেশি টাকার লেনদেনের রেকর্ড পাওয়া গেছে। একই অভিযোগ এসেছে রাজউকের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল বাতেনের বিরুদ্ধেও, যার স্ত্রীর নামে রয়েছে কোটি টাকার সম্পদ, যার সিংহভাগই দুর্নীতির অর্থ বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও এমন অভিযোগ উঠেছে। কর কমিশনার মো. মতিউর রহমান ও তার স্ত্রী ও মেয়ের নামে থাকা ১৫টি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে ৭৩ কোটি টাকারও বেশি। মতিউরের নিজ নামে মাত্র দুটি হিসাব থাকলেও তার পরিবারের অন্য সদস্যদের হিসাবে লেনদেনের পরিমাণ বিস্ময়কর। এসব অর্থের বেশিরভাগই এসেছে ঘুষ ও অবৈধ কমিশন হিসেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নূর মোহাম্মদ ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধেও রয়েছে প্রায় ৪৮৪ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ। তিনি আওয়ামী লীগের উপকমিটির সাবেক সদস্য ও ওষুধ ব্যবসার আড়ালে সরকারি কেনাকাটায় প্রভাব খাটিয়ে অর্থ অর্জন করেছেন বলে দাবি তদন্ত কর্মকর্তাদের। তার স্ত্রী নাজমুন নাহার ও দুই সন্তানের নামে থাকা সম্পদের পরিমাণও বিশাল।
তদন্তে পাওয়া এসব তথ্য থেকে স্পষ্ট, দুর্নীতির একটি প্রধান রুট এখন ‘পরিবার’ বা ‘সম্পর্ক’। দুর্নীতিবাজরা নিজেরা সরাসরি জড়িত না থেকে স্ত্রী, প্রেমিকা কিংবা ঘনিষ্ঠদের নামে সম্পদ রেখে নিজেদের দায়মুক্ত রাখতে চাইছেন। তারা জানেন, দুর্নীতি অনুসন্ধানে প্রথমেই দেখা হয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নামে থাকা আয় ও ব্যয়ের অনুপাত। কিন্তু স্ত্রী, প্রেমিকা কিংবা আত্মীয়দের নামে করা লেনদেন আলাদাভাবে অনুসন্ধান না করলে ধরা পড়ে না। এই দুর্বলতাকেই ব্যবহার করছে দুর্নীতিবাজ চক্র।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে দুর্নীতির শিকড় কেবল সরকারি দফতর নয়, এখন তা ছড়িয়ে পড়েছে পারিবারিক কাঠামোতেও। একটি শ্রেণি সংগঠিতভাবে স্বজন, স্ত্রীর প্রভাব ও ভালোবাসার সম্পর্ককে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ করছে। এই প্রক্রিয়াটি সমাজের জন্য ভয়ানক বার্তা বহন করে, কারণ এতে করে পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট হচ্ছে।
দুদক সূত্র জানায়, তদন্তে দেখা গেছে, অভিযুক্তদের মধ্যে অনেকেই নিজের নামে ব্যাংক হিসাব না খুলে স্ত্রী ও সন্তানদের নামে সম্পদ রাখতেন। এসব হিসাবের মাধ্যমে দেশের বাইরে অর্থ পাচারেরও আলামত পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, ও বিএফআইইউ এসব লেনদেনের ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য দুদককে সরবরাহ করেছে। বহু ক্ষেত্রে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ইতিমধ্যেই মামলা হয়েছে, অনেকের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে এবং কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
তবে এসব মামলার পরিণতি নিয়ে অনেকেই সন্দিহান। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বড় দুর্নীতির মামলা সময়ক্ষেপণের কারণে নিষ্পত্তি পায় না। রাজনৈতিক পরিচিতির কারণে অনেক সময় মামলার গতি থমকে যায় কিংবা অভিযুক্ত পার পেয়ে যান। তাই এই মামলাগুলোর দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং বিচার কার্যক্রম নিয়মিতভাবে মনিটরিংয়ের দাবি জানিয়েছেন দুর্নীতিবিরোধী কর্মীরা।
টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “এই চিত্র খুবই উদ্বেগজনক। দুর্নীতির অর্থ গচ্ছিত রাখার জন্য স্ত্রী বা প্রেমিকাকে ব্যবহার করা একটি নতুন ‘সিস্টেমেটিক করাপশন মডেল’-এ পরিণত হয়েছে। এটিকে শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ হিসেবে দেখলে হবে না, এটি নৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়েরও প্রতিফলন।”
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দুদকের কার্যকরতা, আইনি সংস্কার ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি। একই সঙ্গে, সমাজের সর্বস্তরে দুর্নীতিবিরোধী মানসিকতা গড়ে তোলা না গেলে স্ত্রী বা প্রেমিকার ভালোবাসার মুখোশে লুকিয়ে থাকা দুর্নীতিবাজদের রুখে দেওয়া কঠিন হবে।