অর্থনীতি ও বাণিজ্য

রূপপুরের পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনে অপেক্ষা বাড়ছে

বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। দীর্ঘ এক দশক ধরে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পরমাণু সংস্থা রোসাটমের তত্ত্বাবধানে অবকাঠামো নির্মাণ শেষে এখন চলছে পরমাণু জ্বালানি ইউরেনিয়াম লোডের প্রস্তুতি। তবে, চূড়ান্ত এই পর্যায়ে একের পর এক নেতিবাচক খবরে প্রকল্পটি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। প্রকল্প এলাকার আশপাশে জনমনে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক। প্রকল্পের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক আনবিক সংস্থার (আইএইএ) প্রতিবেদনের ব্যাখ্যা পরিকল্পিতভাবে বিকৃত করে উপস্থাপন করে আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে বলে দাবি রূপপুর প্রকল্প কর্তৃপক্ষের। আইএইএর অনুমোদন ছাড়া, নিরাপত্তার শর্ত পূরণ না করে যেনতেনভাবে উৎপাদনে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলেও জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

 

 

প্রকল্প সূত্র জানায়, আইএইএর একটি বিশেষজ্ঞ দল গত ১০-২৭ আগস্ট রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রি-ওসার্ট মিশন পরিচালনা করে। এরপর সংস্থাটি নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রেসনোট প্রকাশ করে তাদের সফর ও পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে ধারণা দেয়। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয় নিয়ে সতর্কবার্তা ও নির্দেশনা জানানো হয়েছে। প্রতিনিধি দলটি তিন মাসের মধ্যে রূপপুর প্রকল্প নিয়ে পর্যবেক্ষণের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। প্রতিবেদনের সুপারিশ ও শর্ত পূরণের পরই অনুমোদন প্রাপ্তি সাপেক্ষে পরমাণু চুল্লিতে জ্বালানি লোডিং সম্ভব হবে। তবে এরআগে কোনোভাবেই বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর সুযোগ নেই। ফলে, চলতি বছরের ডিসেম্বরে প্রকল্পের প্রথম ইউনিটে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরুর কথা থাকলেও তা হচ্ছে না।

 

 

 

যত সংশয় -পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য জরুরি পরীক্ষাগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। এক—নন নিউক্লিয়ার টেস্ট, যেটি করা হয় ফুয়েল লোডিংয়ের আগে। দুই—নিউক্লিয়ার টেস্ট, যা করা হয় ফুয়েল লোডিংয়ের পরে। রূপপুরে প্রায় এক হাজার ৭০০টি নন নিউক্লিয়ার টেস্ট করা দরকার। করা হয়েছে ৭৫০টির মতো। প্রকল্পটিতে কারিগরি সমাধান বা বিকল্প উপায়ের নামে এ পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার ‘টেকনিক্যাল সলিউশন’ দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

 

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সার্কিটের কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য প্রায় ২৪.৫ মেগাপ্যাসকেল চাপে হাইড্রোস্ট্যাটিক টেস্ট করা হয়। পরীক্ষার আগে সার্কিটের সব যন্ত্রাংশ সঠিকভাবে স্থাপন বাধ্যতামূলক। রূপপুরে সেইফটি ভালভ না বসিয়েই পরীক্ষা করার অভিযোগ রয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ প্রতিরোধক তার ব্যবহার করার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

 

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পের মূল ডিজাইনে বৈদ্যুতিক তারের একটি নির্দিষ্ট মান ঠিক করা থাকে। নিয়ম অনুযায়ী সেটিই দিতে হবে। কোনো কারণে না পাওয়া গেলে ডিজাইনারকে জানাতে হবে। তবে রূপপুর প্রকল্পে অনেক ক্ষেত্রেই তা মানা হচ্ছে না।

 

রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ অন্তত ৬০ বছর। এটা বিবেচনা করেই যন্ত্রপাতি ও উপকরণ স্থাপন করতে হবে, যাতে কোনো সমস্যা তৈরি না হয়। রূপপুরের সরঞ্জাম ও উপকরণাদি বিশেষভাবে তৈরি। কিন্তু সেখানে নকশাবহির্ভূত এমনকী স্থানীয়ভাবে তৈরি নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। কখনো দ্বিতীয় ইউনিট থেকে ধার করে প্রথম ইউনিটে বসিয়ে অস্থায়ীভাবে পরীক্ষার কাজ করা হয়েছে। সমস্যা সবচেয়ে বেশি রয়েছে বৈদ্যুতিক কেবল, ভালভ, পাম্প এবং কন্ট্রোল সিস্টেমের ক্ষেত্রে, যা কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বড় ভূমিকা রাখে।

 

প্রকল্পটিতে জরুরি অবস্থায় ১০.৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ডিজেল জেনারেটর ব্যবহার করার কথা, কিন্তু মূল ডিজাইনের বাইরে গিয়ে অস্থায়ীভাবে স্থানীয় বৈদ্যুতিক তার ব্যবহার করা হয়েছে। মেকানিক্যাল ড্রাফট কুলিং টাওয়ারের ফ্যানগুলোতেও ব্যবহার করা হয়েছে এসব বৈদ্যুতিক তার। এগুলোর মান ও স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

 



সম্পর্কিত খবর