জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার পিংনা ইউনিয়নের রাধানগর সানসেট এলাকায় যমুনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, মজুত ও বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রভাবশালী একটি মহলের ছত্রচ্ছায়ায় এলাকায় একাধিক বালুঘাট গড়ে উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব ঘাটে দিন-রাত বাল্কহেডের মাধ্যমে যমুনা নদী থেকে বালু তুলে ১০ থেকে ১২টি স্থানে মজুত করা হচ্ছে। পরে ড্রাম ট্রাকে করে বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করা হচ্ছে এসব বালু।
অবৈধ এ কার্যক্রমের কারণে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। পাশাপাশি নদীতীরবর্তী কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও জনবসতির নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, যমুনা নদীর সিরাজগঞ্জের কাজিপুর অংশে সরকারিভাবে একটি বালুমহল রয়েছে। তবে পিংনার রাধানগর সানসেট এলাকার বিভিন্ন স্থানে মজুত করা বালু ওই ইজারাকৃত বালুমহল থেকে আনা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, বাল্কহেডে করে সরাসরি নদী থেকে বালু এনে এসব স্থানে মজুত ও বিক্রি করা হচ্ছে।
সরেজমিনে রাধানগর এলাকায় গিয়ে বিভিন্ন স্থানে বালু মজুত ও বিক্রির কার্যক্রম দেখা গেছে। বাল্কহেডে করে বালু আনার পর ড্রাম ট্রাকে সেগুলো বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠানো হচ্ছে। দিন-রাত বালুবাহী যানবাহনের চলাচল এলাকায় বালু ব্যবসার ব্যাপকতা স্পষ্ট করছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন জানান, এসব বালুঘাটের সঙ্গে যুবদলের এক নেতার সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাঁর ইন্ধনেই অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও বিক্রির কার্যক্রম চলছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সরকারি নিয়ম মেনে বালুমহল ইজারা দেওয়া হলে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সরকার রাজস্ব পায়। কিন্তু ইজারার বাইরে নদী থেকে বালু উত্তোলন কিংবা অনুমোদনহীন স্থানে বালু মজুত ও বিক্রি করা হলে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়।
এ ছাড়া যমুনা নদী থেকে বালু উত্তোলন ও বালুবাহী বাল্কহেডের নিয়মিত চলাচল ঘিরে নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করা হলে নদীতীরের মাটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও স্থানীয় অবকাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
দিন-রাত বালুবাহী ড্রাম ট্রাক চলাচলের কারণে স্থানীয় সড়ক ও পরিবেশের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন বাসিন্দারা। তাঁদের মতে, বসতবাড়ির পাশ দিয়ে ভারী যানবাহন চলাচল করায় ধুলাবালি ও শব্দদূষণ বাড়ছে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
বালুঘাট পরিচালনা ও বালু পরিবহনের সুবিধার্থে এলাকার একটি মসজিদের পাশ দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কয়েকটি স্থানে মানুষের বাড়িঘরের ওপর দিয়ে রাস্তা তৈরি করে বালু পরিবহন ও বিক্রির কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এতে স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বসতবাড়ির নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
রাস্তা নির্মাণের ক্ষেত্রে জমির মালিকদের সম্মতি নেওয়া হয়েছে কি না, চলাচলের পথটি বৈধ কি না এবং ভারী যানবাহন চলাচলের উপযোগী কি না, তা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তাঁদের ভাষ্য, “বালু ব্যবসার কারণে এলাকার মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা যেন ব্যাহত না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসনের নজর দেওয়া জরুরি। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী প্রভাব খাটিয়ে জনসাধারণের চলাচলের পথ ব্যবহার করলে কিংবা অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত জমির ওপর দিয়ে রাস্তা তৈরি করলে তার আইনগত ভিত্তিও যাচাই করা প্রয়োজন।”
এলাকাবাসীর দাবি, সরিষাবাড়ী উপজেলার পিংনা রাধানগর সানসেট এলাকায় বালু উত্তোলন, মজুত ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত সব পয়েন্টের বৈধতা যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি বালু কোথা থেকে আনা হচ্ছে, উত্তোলনের অনুমতি রয়েছে কি না, সরকারি ইজারার শর্ত মানা হচ্ছে কি না এবং নির্ধারিত রাজস্ব পরিশোধ করা হচ্ছে কি না, সেসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
অভিযোগের বিষয়ে যুবদল নেতা সুভাষ বলেন, “আমি একা করি না, আরও অনেকেই করে। তবে আমি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনী প্রার্থী হওয়াতে শত্রুতা বেড়ে গেছে; তাই অনেকেই আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।”
সরিষাবাড়ী উপজেলা যুবদলের সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে উপজেলা যুবদলের ন্যূনতম সম্পর্ক নেই। স্থানীয় সুভাষ নামে এক ব্যক্তি যুবদলের নাম ব্যবহার করে যমুনা থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছেন। অবিলম্বে এই অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের জোর দাবি জানান তিনি।
সরিষাবাড়ী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) লিজা রিসিল বলেন, বিষয়টি তিনি জানতে পেরেছেন এবং দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরিষাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরোজা আফসানা বলেন, অভিযোগের প্রমাণ থাকলে তা তাঁকে দিতে হবে। প্রমাণ পেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।