খুলনা

কালীগঞ্জে স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরকারি বরাদ্দের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আমানউল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন খাতে সরকারি বরাদ্দের টাকা আত্মসাৎ এবং নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। চলতি বছরের জুন মাসে যোগদানের পর ওই মাসের শেষে কোনো মালামাল না কিনে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে কয়েক লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন এই কর্মকর্তা।

 

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কালীগঞ্জ উপজেলা সরকারি হাসপাতালের বিভিন্ন খাতওয়ারি বরাদ্দের অর্থ ব্যয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি করেছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মামুন। এর মধ্যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বাবদ ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা, অন্যান্য মনিহারি বাবদ ১ লাখ ১০ হাজার টাকা, স্ট্যাম্প ও সিল বাবদ ২২ হাজার টাকা, অফিস সরঞ্জাম বাবদ ১৩ হাজার টাকা, সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কার বাবদ ৩০ হাজার টাকা, আসবাবপত্র মেরামত বাবদ ৩০ হাজার টাকা, আসবাবপত্র ক্রয় বাবদ ৫৫ হাজার টাকা, কম্পিউটার মেরামত বাবদ ৪৫ হাজার টাকা, পরিষ্কারের সামগ্রী বাবদ ৮ হাজার টাকা এবং অন্যান্য মনিহারি বাবদ ৫০ হাজার টাকা বিধি অনুযায়ী ব্যয় না করে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে পকেটস্থ করেছেন। স্বাস্থ্য কর্মকর্তার এই দুর্নীতির তথ্যপ্রমাণ এবং অডিও-ভিডিও বক্তব্য ইতিমধ্যে এ প্রতিবেদকের হাতে এসে পৌঁছেছে।

 

বরাদ্দের অর্থ দিয়ে মালামাল ক্রয় করা হয়েছে কি না জানতে হাসপাতালের স্টোরের দায়িত্বে থাকা হারবাল অ্যাসিস্ট্যান্ট মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করে মালামাল মজুদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিল-ভাউচারে উল্লেখ করা কোনো মালামাল দেখাতে পারেননি। এ সময় তিনি বলেন, "বরাদ্দ না থাকায় অল্প অল্প করে কোনোমতে চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে স্যার ভালো বলতে পারবেন।"

 

এদিকে প্রয়োজনীয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সামগ্রীর অভাবে হাসপাতালে নোংরা পরিবেশ বিরাজ করছে। বিভিন্ন বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় সামগ্রীর চাহিদা দেওয়া হলেও দীর্ঘদিন ধরে তা সরবরাহ করা হচ্ছে না। যোগদানের পর থেকেই অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে হাসপাতালটির প্রশাসনিক ও সেবাদান প্রক্রিয়া ভেঙে পড়েছে।

 

তিনি যোগদানের পর থেকে নিয়মিতভাবে সহযোগীদের নিয়ে হাসপাতালের রোগীদের জন্য নির্ধারিত খাবার গ্রহণ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে সাংবাদিকদের হস্তক্ষেপে তা বন্ধ হয়। ভর্তি থাকা রোগীদের অস্বাস্থ্যকর, নিম্নমানের ও পরিমাণে কম খাবার সরবরাহ করা হলেও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি। সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে অফিস শুরুর কথা থাকলেও কখনোই তাঁকে যথাসময়ে উপস্থিত থাকতে দেখা যায় না। এমনকি হাসপাতালের অধিকাংশ চিকিৎসকও সকালে যথাসময়ে আসেন না।

 

গত ২৫ জুলাই হাসপাতালের অফিসকক্ষে হারবাল অ্যাসিস্ট্যান্ট মাহবুবুর রহমান তাঁর সহকর্মী মেডিকেল টেকনোলজিস্ট জামির হোসেনকে মারধর করে রক্তাক্ত করেন। এ ঘটনার নেপথ্যে স্বাস্থ্য কর্মকর্তার ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী জামির হোসেন। শুধু তা-ই নয়, মারামারির ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাল্টা মামলা দেওয়ার ইন্ধনদাতা হিসেবেও তাঁর নাম আসছে।

 

সম্প্রতি হাসপাতালের চর্ম ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. অরুণ কুমার দাস অফিস ফাঁকি দিয়ে মাঠে গিয়ে ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের কাজ করানোর একটি ভিডিও গণমাধ্যমে প্রচার হলেও তিনি তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি; বরং ওই চিকিৎসকের পক্ষে হাসপাতালের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে প্রশংসাসূচক পোস্ট করা হয়।

 

এ ছাড়া হাসপাতালের অ্যাাম্বুলেন্স ভাড়ার ক্ষেত্রেও সরকার নির্ধারিত ফির চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয় সাধারণ রোগীদের কাছ থেকে। বিষয়টি জানা সত্ত্বেও নিশ্চুপ রয়েছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের কাছ থেকে আউটসোর্সিংয়ে কর্মরত ব্যক্তিরা টাকা আদায় করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের দৌরাত্ম্য কমাতেও স্বাস্থ্য কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

 

কালীগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের হিসাবরক্ষক আব্দুল আজিজ জানান, "আমানউল্লাহ স্যার যোগদানের পর থেকে আমাকে হিসাব বিভাগের সমস্ত কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। যে কারণে আমি অফিসে শুধু আসা-যাওয়া করি। এর বাইরে কোনো কিছুই আমার জানা নেই।"

 

সব অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আমানউল্লাহ আল মামুন কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তিনি বেশ কিছু সময় চুপ থেকে বলেন, "কেনাকাটা হয়েছে কি না আমি খোঁজখবর নিয়ে দেখব এবং বিষয়টা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানাব।"

 

এ ব্যাপারে ঝিনাইদহ জেলা সিভিল সার্জন ডা. কামরুজ্জামান বলেন, "স্বাস্থ্য কর্মকর্তা যদি সরকারি বরাদ্দকৃত অর্থ আত্মসাৎ করে থাকেন, তবে তদন্তে প্রমাণ মিললে তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকে দোহাই দিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি করে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।"

 

খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. শেখ মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন বলেন, "অনিয়ম-দুর্নীতি করা হলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

 

কালীগঞ্জ সরকারি হাসপাতাল সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচালনা এবং চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তদন্তপূর্বক স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সুধীসমাজ।



সম্পর্কিত খবর