কোটি টাকার ডিজিটাল পোস্ট অফিসের সরকারি এ স্থাপনায় ভবনের দরজা-জানালা আছে। কিন্তু ভেতরে নেই কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী, নেই মানুষের আনাগোনা। বছরের পর বছর তালাবদ্ধভাবে পড়ে থাকায় সরকারি ভবনের চারপাশে গজিয়েছে ঝোপঝাড় আর গাছপালা।
এটি পঞ্চগড়ের সদর উপজেলার হাফিজাবাদ ইউনিয়নের সাবেক গারাতি ছিটমহলের ডিজিটাল পোস্ট অফিসের চিত্র। শুধু এই ভবন নয়, ছিটমহল বিনিময়ের পর স্থানীয় মানুষের সেবা নিশ্চিত করতে নির্মাণ করা হয়েছে কমিউনিটি সেন্টারসহ বিভিন্ন স্থাপনা। পুলিশ ফাঁড়ির জন্য অধিগ্রহণ করা হয়েছে জমি, নির্মাণ করা হয়েছে সীমানাপ্রাচীর। কিন্তু এসবের বেশির ভাগই এখনো চালু হয়নি।
২০১৫ সালের ৩১ জুলাই ছিটমহল বিনিময়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৬৮ বছরের রাষ্ট্রহীন জীবনের অবসান হয়েছিল গারাতি ছিটমহলবাসীর। এরপর প্রায় ১১ বছরে এই জনপদে পাকা সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ ও নানা নাগরিক সুবিধা পৌঁছেছে। উন্নয়নের ছোঁয়ায় বদলে গেছে একসময়ের বিচ্ছিন্ন জনপদটির চেহারা। কিন্তু কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কিছু স্থাপনা কার্যকর না হওয়ায় সেই উন্নয়ন এখনো পূর্ণতা পায়নি বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
একসময় গারাতি ছিটমহলের মানুষের পরিচয় ছিল অনিশ্চিত। বাংলাদেশ বা ভারতের নাগরিক হিসেবে তারা পূর্ণ অধিকার ভোগ করতে পারতেন না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগসহ মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকেও ছিলেন অনেকটাই বঞ্চিত।
২০১৫ সালের ৩১ জুলাই ভারত-বাংলাদেশের স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে গারাতি ছিটমহলটি বাংলাদেশের অংশ হয়ে যায়। এর পর থেকেই নাগরিকত্ব পান এখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা। শুরু হয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। তৈরি হয় পাকা রাস্তা। প্রতিষ্ঠিত হয় স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা। বিদ্যুৎ পৌঁছে যায় ঘরে ঘরে। সরকারি নানা সেবার আওতায় আসেন বাসিন্দারা। তবে এখনো কিছু উন্নয়ন যেন থেমে আছে ভবন নির্মাণের পরই।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছিটমহলবাসীর ডাক ও যোগাযোগসেবা সহজ করতে এখানে একটি ডিজিটাল পোস্ট অফিস নির্মাণ করা হয়। কিন্তু ভবন নির্মাণের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তা এখনো চালু করা হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা আমানুল্লাহ বলেন, পোস্ট অফিসের জন্য ভবন তৈরি হয়েছে, জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশ ফাঁড়ির জন্যও জমি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কেন এসব কার্যক্রম চালু হচ্ছে না, তা তারা জানেন না। প্রতিষ্ঠানগুলো চালু হলে এলাকার মানুষ সরকারি বিভিন্ন সেবা আরও সহজে পেতেন। তাই বিষয়টি দ্রুত সমাধানে সরকারের হস্তক্ষেপ চান তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা হাসিবুল বলেন, তাদের ইউনিয়নে এখনো ডাকঘর চালু হয়নি। অথচ ছিটমহল বিনিময়ের পর এখানে ডাকঘরের ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ডাকঘরটি চালু হলে স্থানীয় মানুষ উপকৃত হবেন।
পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের জন্য স্থানীয়দের কাছ থেকে প্রায় সাড়ে তিন বিঘা জমি নেওয়া হয়েছে বলে জানান বাসিন্দারা। সেই জমিতে সীমানাপ্রাচীরও নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু এরপর আর কোনো কার্যক্রম এগোয়নি।
আব্দুস সাত্তার নামে আরেক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, পুলিশ ফাঁড়ির জন্য জমি দেওয়ার পর সীমানাপ্রাচীর দিয়ে রাখা হয়েছে। এখন জায়গাটি অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। তার মতে, পুলিশ ফাঁড়ি চালু হলে এলাকায় মাদক, চুরিসহ নানা অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। তাই দ্রুত ফাঁড়ি চালুর দাবি জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা বিল্লাল হোসেন বলেন, ছিটমহল থাকার সময় তাদের এলাকায় স্কুল-কলেজ, ভালো রাস্তাঘাট কিংবা নাগরিক অধিকার কিছুই ছিল না। ২০১৫ সালের পর অনেক উন্নয়ন হয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে এখনো তারা পিছিয়ে আছেন।
বিল্লাল হোসেন আরও বলেন, কমিউনিটি সেন্টার ও ডিজিটাল পোস্ট অফিস নির্মাণ করা হয়েছে, কিন্তু সেগুলোতে কার্যক্রম নেই। পুলিশ ফাঁড়ির জন্য জমি অধিগ্রহণ ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হলেও সেটিও চালু হয়নি। এসব প্রতিষ্ঠান পুরোদমে চালু হলে তাদের ও এলাকার জীবনমান আরও উন্নত হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, ছিটমহল বিনিময়ের পর অনেক উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু উন্নয়নের কিছু ধারা এখনো স্থবির। তাদের এলাকায় পুলিশ ফাঁড়ির অবকাঠামো পড়ে আছে। মফিজার রহমান কলেজ মাঠে নির্মিত একটি আইসিটি ভবনও পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।
পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক শুকরিয়া পারভীন বলেন, কয়েকটি কেন্দ্র, বিশেষ করে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে বর্তমানে কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি সেখানে একটি পোস্ট অফিসও অনেকটা অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে।
তিনি বলেন, খুব শিগগির বিষয়গুলো নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সরেজমিনে এলাকা পরিদর্শন করে বিদ্যমান অবকাঠামো কীভাবে কার্যকর করা যায় এবং স্থানীয়দের চাহিদা অনুযায়ী কী ধরনের উন্নয়ন প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।