চলতি বছরে সর্বোচ্চ প্রাণহানি অক্টোবরে
ভিন্ন ভিন্ন সেরোটাইপে ভারী হচ্ছে মৃত্যুর পাল্লা
জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘ হচ্ছে ডেঙ্গুর মৌসুম
কালক্ষেপণের প্রবণতা বন্ধ করা বেশি জরুরি
বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ সাধারণত সবচেয়ে বেশি থাকে। এরপর নভেম্বর থেকে কমতে শুরু করে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। তবে এবার চিত্র ভিন্ন। ডেঙ্গুর মৌসুম পেরিয়ে গেলেও কমছে না সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার। বরং নভেম্বরেও অব্যাহত রয়েছে রোগটির দাপট, যা জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। তথ্য উপাত্ত বলছে, চলতি বছরের অধিকাংশ সময়েই ছিল ডেঙ্গুর প্রভাব। রোগটির ভয়াল থাবা প্রাণ কেড়েছে শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সিদেরই।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের প্রথম ৭ দিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ১২ হাজার ৫৮০ জন এবং মারা গেছেন ৩৯ জন। এ বছর এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৮০ জন এবং মৃতের সংখ্যা ৪৫৮ জনের। অন্যদিকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৭৬ হাজার ২৬ জন। একই সময়ে মারা গিয়েছিল ৩০৭ জন। অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত এবং মৃত- উভয় সংখ্যাই অনেক বেড়েছে।
চলতি বছরের সর্বোচ্চ প্রাণহানি অক্টোবরে
এ বছরের শুরুতে ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলক কম ছিল। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুজন করে মারা যান। মার্চ ও এপ্রিলে কোনো মৃত্যু হয়নি। মে মাসে একজন এবং জুনে ১৩ জনের মৃত্যু হয়। এরপর পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকে। জুলাইয়ে ৩৬, আগস্টে ৪৩ এবং সেপ্টেম্বরে সর্বোচ্চ ১৪৮ জন মারা যান।
কিন্তু অক্টোবর এসে মৃত্যুর সেই রেকর্ড ভেঙে দেয়। এ মাসে মাশবাহিত রোগটিতে যায় ১৭৪ জন। যা এখনো পর্যন্ত চলতি বছরে এক মাসে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে অক্টোবরে আক্রান্ত হন ৫৬ হাজার ৩৮০ জন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃষ্টি ও জমে থাকা পানি থেকে এডিস মশার লার্ভা জন্ম নিচ্ছে এবং আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে মশার প্রজনন মৌসুম দীর্ঘায়িত হচ্ছে। তাই ডিসেম্বরের আগে ডেঙ্গুর প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমার সম্ভাবনা নেই।
ভিন্ন ভিন্ন সেরোটাইপে ভারী হচ্ছে মৃত্যুর পাল্লা
নভেম্বরেও ডেঙ্গুর প্রকোপ না কমায় সারাদেশে ভারী হচ্ছে রোগটিতে প্রাণহানির পাল্লা। কেমছে না আক্রান্তের হারও। মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে এখন নির্দিষ্ট কোনো মাস বা ঋতুর সীমাবদ্ধতা নেই। আগে সাধারণত শীতকালে ডেঙ্গুর প্রকোপ কম থাকলেও বর্তমানে তার রোগতাত্ত্বিক ধরন (প্যাটার্ন) পুরোপুরি পাল্টে ফেলেছে। এটি এখন একটি বছরব্যাপী সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে সারা বছরই কম-বেশি সংক্রমণ লেগেই থাকে এবং মৌসুম নির্বিশেষে এর মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রা ওঠানামা এবং বৃষ্টিপাতের কারণে মশার প্রজনন ক্ষেত্র ও বংশবৃদ্ধি বহুগুণ বেড়েছে। সার্বিক এই পরিস্থিতির কারণেই মূলত ডেঙ্গুজনিত মৃত্যুর হার বাড়ছে।’
তিনি জানান, ‘ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার বৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ হলো- ভাইরাসটির ভিন্ন ভিন্ন সেরোটাইপ। সাধারণত প্রথমবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে পরিস্থিতি অতটা জটিল বা তীব্র হয় না। তবে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থবারের মতো পুনরায় আক্রান্ত হলে তা মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে।’ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘বর্তমানে যারা আক্রান্ত হচ্ছেন, তাদের অনেকেই অতীতে একবার আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে পুনরায় সংক্রমিত হওয়ার কারণেই ঝুঁকি ও জটিলতা বেশি তৈরি হচ্ছে। সংক্রমণ তীব্র বা গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছালে মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।’
জলবায়ু পরিবর্তনে দীর্ঘ হচ্ছে ডেঙ্গুর মৌসুম
দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ডেঙ্গুর মৌসুম দীর্ঘ হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বাংলাদেশে আবহাওয়া পরিবর্তন হয়েছে। যার ফলে সারা বছরই থাকবে ডেঙ্গু। তাই রোগটির কবল থেকে রেহাই পেতে হলে সচেতনতার বিকল্প নেই। ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে দ্রুততম সময়ে চিকিৎসা নিতে হবে।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে আংশিকভাবে সম্পর্কিত বৃষ্টি ও আর্দ্রতার ধরনে পরিবর্তনের কারণে মশার প্রজননের মৌসুম দীর্ঘ হচ্ছে। ফলে এডিস মশা আরও দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকছে।’
কালক্ষেপণের প্রবণতা বন্ধ করা বেশি জরুরি
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘রোগীরা অনেক সময় ডেঙ্গুর পরিবর্তিত লক্ষণগুলো সময়মতো বুঝতে পারেন না। সামান্য জ্বর, সর্দি, কাশি বা শরীর ব্যথাকে অবহেলা করে চিকিৎসায় দেরি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে জ্বরকে গুরুত্ব না দিয়ে স্বাভাবিকভাবে নেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে হঠাৎ করেই জটিল আকার ধারণ করে। দেরিতে রোগ নির্ণয় (ডায়াগনোসিস) এবং চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এই প্রাণঘাতী পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান কারণ। তাই এই অপ্রয়োজনীয় কালক্ষেপণ বা দেরি করার প্রবণতা বন্ধ করা সবচেয়ে বেশি জরুরি।’
তিনি বলেন, ‘এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। জ্বর, সর্দি, কাশি, শরীর ব্যথা বা মাথা ব্যথার মতো লক্ষণ দেখা মাত্রই দেরি না করে দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে হবে। যত দ্রুত রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হবে, তত দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা যাবে এবং এর মাধ্যমে রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকি সফলভাবে কমানো সম্ভব হবে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে। জনস্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগে মশার প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করা, প্রাপ্তবয়স্ক মশা নিধন এবং সামগ্রিক মশার ঘনত্ব সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার বিকল্প নেই। যতদিন এ পরিস্থিতি থাকবে, ততদিন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলোও কঠোরভাবে চালিয়ে যেতে হবে।