সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর মধ্যে যুদ্ধের উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কার বিরুদ্ধে বিশ্ব শ্রমিকশ্রেণিকে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ। সংগঠনটির নেতারা বলেন, বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট ও শ্রম-পুঁজির দ্বন্দ্বের মধ্যে শোষিত মানুষের মুক্তির পথ হচ্ছে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।
শনিবার (৭ নভেম্বর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মহান অক্টোবর বিপ্লবের ১০৯তম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত লাল পতাকার মিছিল ও সমাবেশে এসব কথা বলেন সংগঠনটির নেতারা।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি চৌধুরী আশিকুল আলম।
সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ দত্তের সঞ্চালনায় এতে বক্তব্য দেন জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম জাহাঙ্গীর হুসাইন, বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মো. শাহ আলম ভূঁইয়া, বাংলাদেশ স’মিল শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি খলিলুর রহমান, বাংলাদেশ ওএসকে গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্সটাইল শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মো. ইয়াছিন এবং বাংলাদেশ হোটেল রেস্টুরেন্ট সুইটমিট শ্রমিক ফেডারেশনের সহসভাপতি মো. আক্তারুজ্জামান খান।
বক্তারা বলেন, ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব বিশ্বের শ্রমিকশ্রেণি, নিপীড়িত জাতি ও জনগণের মুক্তির পথ দেখিয়েছে।
অক্টোবর বিপ্লবের শিক্ষা ধারণ করে দেশে দেশে সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম জোরদার করতে হবে।
তারা বলেন, পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর মধ্যে বাজার ও প্রভাববলয় পুনর্বণ্টন নিয়ে প্রতিযোগিতা বাড়ছে।
এর ফলে বাণিজ্যযুদ্ধ, মুদ্রাযুদ্ধ, আঞ্চলিক সংঘাত ও সাইবার যুদ্ধের পাশাপাশি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকিও বাড়ছে। ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও ন্যাটোর বিরোধ, ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের আগ্রাসন এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সংঘাতের বিস্তার বিশ্ব পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলছে।
বক্তারা আরও বলেন, বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি শ্রমিক-জনগণের সংকট বাড়িয়ে দিয়েছে। ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে শ্রমিক, ছাত্র ও সাধারণ মানুষের আন্দোলন জোরদার হচ্ছে। এসব আন্দোলনকে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করার আহ্বান জানান তারা।
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তারা বলেন, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও শ্রমিক-কৃষক ও মেহনতি মানুষের আয় সে অনুযায়ী বাড়েনি। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হলেও দেশের প্রায় সাড়ে সাত কোটি শ্রমিক-কর্মচারীর জন্য জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘোষণার উদ্যোগ নেই।
বক্তারা অভিযোগ করেন, শ্রমিকদের দাবি উপেক্ষা করে সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির শর্ত পূরণে জনগণের ওপর ঋণের বোঝা চাপাচ্ছে। একইসঙ্গে ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর দ্বন্দ্বে জড়িয়ে ফেলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে জীবিকার সংগ্রামের পাশাপাশি যুদ্ধের বিপদ মোকাবিলায়ও শ্রমিক-কৃষক-জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তারা।
সমাবেশ থেকে বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ৩০ হাজার টাকা জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা, গার্মেন্টস শ্রমিক হত্যার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি গঠিত মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে দ্রুত মজুরি ঘোষণা, গণতান্ত্রিক শ্রম আইন প্রণয়ন এবং অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ ১০ দফা দাবি তুলে ধরেন বক্তারা।
সমাবেশে সংহতি জানিয়ে উপস্থিত ছিলেন ধ্রুবতারা সাংস্কৃতিক সংসদের সভাপতি শ্যামল কুমার ভৌমিক, গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির কেন্দ্রীয় নেতা কামরুন্নাহারসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠনের নেতাকর্মীরা।