বরিশাল

কারখানার নদীর রুদ্ররোষে বিলীন ঘরবাড়ি-ফসলি জমি, কাঁদছে তীরবর্তী তিন গ্রামের মানুষ

পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ১ নম্বর কাছিপাড়া ইউনিয়নের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে সিকদার বাড়ি ও আকন বাড়ি। একসময় এই দুটি পরিবার ছিল প্রভাবশালী ও বৃহত্তর পরিবার, উপজেলাবাসীও একনামে চিনত। কিন্তু কারখানা নদীর ভাঙনে আজ সেই জৌলুস আর নেই। শুধু সিকদার বা আকন বাড়ি নয়, বাহেরচর, পশ্চিম কাছিপাড়া, হাজিপুর ও গোপালিয়া গ্রামের শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি, পাকা সড়ক, বাজার, পুকুর ও ফসলি জমি হারিয়ে মানুষগুলো এখন আশ্রয় নিয়েছে কাঁচা-পাকা সড়কের পাশে। তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি দাখিল মাদ্রাসা বিলীনের পথে। চলছে নিঃস্ব মানুষের আহাজারি। পানি উন্নয়ন বোর্ড জিও ব্যাগ ফেলেও বাগে আনতে পারছে না কারখানা নদীর স্রোতের ভয়াবহতা।

উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে কারখানা নদীর পাড়ে অবস্থিত কাছিপাড়া ইউনিয়ন। আয়তন, শিক্ষা, ব্যবসা ও জনসংখ্যায় ১৫টি ইউনিয়নের মধ্যে এগিয়ে থাকলেও প্রমত্তা কারখানা নদীর ভাঙনে হারাচ্ছে তার ইতিহাস-ঐতিহ্য।

কথা হয় নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত নাসরিন বেগমের (৩৫) সঙ্গে। কপালে চিন্তার ভাঁজ, তিন ছেলে নিয়ে তার সংসার। বাপের বাড়ি পাশের উপজেলা বাকেরগঞ্জের লক্ষ্মীপাশা গ্রামে। ২০০৭ সালে বিয়ে হয় কাছিপাড়া সিকদার বাড়ির ইব্রাহিম সিকদারের সঙ্গে। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, “গোয়ালভরা গরু, মাঠভরা ধান, দালানঘর, পুকুরভরা মাছ, পাকা ঘাটলা ছিল। বাড়িতে ছিল ৫০-৬০টি পরিবার। এই তো ২ বছর আগেও দৃশ্যমান ছিল সিকদার বাড়ি, আজ স্বামী-সন্তান নিয়ে ফসলি জমিতে ঘর করে আছি। কারখানা নদী আমার শ্বশুরবাড়ির অস্তিত্ব গিলে খেয়েছে।”

বাহেরচরের নিত্য গোপাল (৭৮) সড়কের পাশে টিনের ছাউনি দেওয়া দোচালা ঘরে ছোট্ট চায়ের দোকানে স্বামী-স্ত্রী মিলে সংসার চালান। জমি, বাড়ি, ঘর—সব হারিয়েছেন। তিনি জানান, “মারা গেলে শ্মশানের জায়গাটুকুও নেই। অথচ বাবার পাওয়া ৬ একর জমি ভেঙে গড়ে উঠেছে বড় চর। ওই চরে আমার এক কাঠা জমিও নেই।” এমন অভিযোগ অনুকূল ও বাসুদেবসহ অর্ধশত নিঃস্ব আশ্রিত পরিবারের।

চর রঘুনাথদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হিস্যা জত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং গোপালিয়া বাঘা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাকির সিকদার, এফ. এম. মামুন ও সুনীল দাস জানান, ভাঙনের কারণে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমছে। প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের নদী এখন মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ মিটার দূরে অবস্থান করছে। দ্রুত বাঁধ না দিলে নদীগর্ভে বিলীন হবে বিদ্যালয়গুলো।

কাছিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ইয়াকুব জানান, “বর্ষা মৌসুমে পানি উন্নয়ন বোর্ড জিও ব্যাগ দিলেও ভাটার সময় তা আর খুঁজে পাওয়া যায় না।”

বাউফল উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. সালেহ আহমেদ বলেন, “ভাঙনের তীব্রতায় কাছিপাড়া ও কনকদিয়ার মানচিত্র ছোট হয়ে আসছে। মাসিক উন্নয়ন সভায় জনপ্রতিনিধিরা তথ্য দিয়েছেন। এলাকা পরিদর্শন করে জরুরি তীর রক্ষার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাব।”

পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এমরান হোসেন বলেন, “বাহেরচর এলাকায় চর রঘুনাথদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে ১০৫ মিটার অংশে জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা হয়েছে, যাতে ব্যয় হয়েছে ৫৯ দশমিক ৬৫ লাখ টাকা। তবে গোপালিয়া বাঘা অংশে এখনো কোনো কাজ বাস্তবায়ন করা হয়নি। কারখানা নদীসহ পায়রা নদীর ভাঙন রোধে একটি সমীক্ষা কাজ চলমান রয়েছে। সমীক্ষা প্রতিবেদন পাওয়ার পর স্থায়ী তীর প্রতিরক্ষা কাজের জন্য ডিপিপি প্রেরণ করা হবে।”

 


সম্পর্কিত খবর