বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের ওপর চলমান নিষেধাজ্ঞা এবং নির্বাচনে দলটির অংশগ্রহণ বন্ধ রাখার বিষয়ে জাতিসংঘের জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর পক্ষে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক তিনজন বিশেষজ্ঞের কাছে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। এতে অভিযোগ করা হয়েছে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাখার মাধ্যমে দলটির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটিকে অংশ নিতে না দেওয়ার কারণে নির্বাচনের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র ও বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শেখ হাসিনা।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) যুক্তরাজ্যভিত্তিক আইনজীবী প্রতিষ্ঠান ম্যাট্রিক্স চেম্বার্স তাদের ওয়েবসাইটে যোগাযোগপত্র জমা দেওয়ার বিষয়টি প্রকাশ করে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ম্যাট্রিক্স চেম্বার্স জানিয়েছে, শেখ হাসিনার পক্ষে ব্রিটিশ আইনজীবী স্টিভেন পাওলস কেসি জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের কাছে আবেদনটি জমা দিয়েছেন। তবে জাতিসংঘ এই আবেদনের ভিত্তিতে কোনো নির্দেশনা দিয়েছে কিংবা আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
যোগাযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। পরে নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে। এর ফলে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারেনি। ওই নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন তারেক রহমান। শেখ হাসিনার পক্ষের অভিযোগ, নতুন সরকারও আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ বহাল রেখেছে।
আবেদনে দাবি করা হয়েছে, দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনের বাইরে রাখায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোটার নিজেদের পছন্দের দলের মাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। শেখ হাসিনার আইনজীবীদের যুক্তি, কোনো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলকে আইনগতভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে না দিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করার চেষ্টা মৌলিক রাজনৈতিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁরা ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক ছিল না বলে দাবি করেছেন। তবে এটি আবেদনকারীর পক্ষের আইনি ও রাজনৈতিক অবস্থান, জাতিসংঘ বা কোনো আন্তর্জাতিক আদালতের সিদ্ধান্ত নয়।
ম্যাট্রিক্স চেম্বার্সের প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, যোগাযোগপত্রে আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তির চারটি অনুচ্ছেদ উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার, ২২ নম্বর অনুচ্ছেদে সংগঠন করার স্বাধীনতা এবং ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে রাজনৈতিক কার্যক্রম ও নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার সুরক্ষার কথা রয়েছে। শেখ হাসিনার আইনজীবীদের দাবি, আওয়ামী লীগের ওপর চলমান নিষেধাজ্ঞা এসব অধিকারের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ।
যোগাযোগপত্রে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে হামলা এবং দলীয় কার্যক্রমের ওপর বিধিনিষেধের কারণে বাংলাদেশে আদালতের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা চ্যালেঞ্জ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আইনজীবী নিয়োগ, সাংগঠনিক যোগাযোগ এবং আইনি প্রতিকার চাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আবেদনে উত্থাপিত প্রতিটি হামলা বা প্রতিবন্ধকতার অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং পৃথক তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ।
আবেদনের মাধ্যমে জাতিসংঘের তিনটি মানবাধিকার ম্যান্ডেটের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে। তাঁরা হলেন সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় মানবাধিকার সুরক্ষাবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠনের স্বাধীনতাবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক এবং গণতান্ত্রিক ও ন্যায়সংগত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাবিষয়ক স্বাধীন বিশেষজ্ঞ। তাঁদের কাছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের আহ্বান জানিয়ে প্রকাশ্য বিবৃতি দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।