সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা জোরদারে বাংলাদেশকে একটি টহল জাহাজ দিতে অনুদান চুক্তি করেছে জাপান। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ঢাকার জাপান দূতাবাস জানায়, ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী এ বিষয়ে নোট বিনিময় করেন।
জাপান সরকারের অনুদান সহায়তায় ‘সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রকল্পের’ আওতায় বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডকে জাপানে তৈরি ৩৫ মিটার শ্রেণির একটি টহল জাহাজ দেওয়া হবে। ঢাকায় জাপান দূতাবাসের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। দূতাবাস জানায়, নতুন এ জাহাজের মাধ্যমে সামুদ্রিক অপরাধ দমনে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের সক্ষমতা বাড়বে। পাশাপাশি অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় জরুরি কার্যক্রম পরিচালনায় জাহাজটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর জাপান সফর উপলক্ষ্যে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও জোরদার করার পাশাপাশি আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় এ উদ্যোগ অবদান রাখবে বলে আশা করছে জাপান। ১৪ দফা যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করতে ‘বিগ-বি’ (বাংলাদেশ-জাপান সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব) উদ্যোগকে ‘বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ বা ‘অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি’ হিসেবে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর আওতায় মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী এলাকাকে লজিস্টিকস, জ্বালানি ও শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করতে কাজ করবে দুই দেশ।
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নেওয়া, ঢাকায় মেট্রোরেল লাইন নির্মাণ এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বিষয়েও একমত হয়েছে দুই দেশ।
যৌথ বিবৃতিতে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরকে স্বাগত জানিয়ে দ্রুত এটি কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) চুক্তিতে যোগদানের অনুরোধ নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও আগ্রহ প্রকাশ করেছে জাপান।
বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নে করব্যবস্থা, শুল্ক ছাড়করণ, অর্থ স্থানান্তর ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং কার্যকর নিয়মকানুন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ। খাদ্য, কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, তথ্যপ্রযুক্তি ও ওষুধশিল্পে বিনিয়োগ এবং সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করতেও সহযোগিতা বাড়ানো হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে বাংলাদেশকে ৫০ বিলিয়ন ইয়েনের জরুরি ঋণ সহায়তার বিষয়টি স্বাগত জানিয়েছে দুই পক্ষ। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দক্ষতা উন্নয়ন ও স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করতেও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে সামরিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত চুক্তি কার্যকর হওয়াকে স্বাগত জানিয়েছে দুই দেশ। বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদারে জাপানের উন্নয়ন সহায়তায় একটি টহলজাহাজ এবং নিরাপত্তা সহায়তা কর্মসূচির আওতায় পাঁচটি টহলবোট দেওয়ার বিষয়টিও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় মিয়ানমারের সহিংসতা বন্ধ এবং রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান হিসেবে তাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে ও টেকসইভাবে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা, গাজা পুনর্গঠন এবং দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতিও সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে দুই দেশ।
যৌথ বিবৃতিতে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ও উন্নয়নে গত পাঁচ দশকে জাপানের অবদানের প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অন্যদিকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান।