খুলনা

যশোর কারাগার থেকে মুক্তি মিললেও ভারতীয় বাছুল মাঝি ও গাজী মণ্ডলের মরদেহ মর্গে আর কত দিন?

ভারতের উত্তরপ্রদেশের চিতামারী জেলার মেজরগঞ্জ থানার কাঁকড়ারা গ্রামের বাসিন্দা বাছুল মাঝি। ২০১৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ির রামগড়ছড়ি সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে আটক হন তিনি। পরদিন আদালত তাকে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন। সাজাভোগ শেষ হলে নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের সুবিধার্থে ২০১৮ সালের ২০ নভেম্বর তাকে স্থানান্তর করা হয় যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় তিনি এই কারাগারে বন্দি ছিলেন। বন্দি থাকা অবস্থায় সিজোফ্রেনিয়াসহ নানাবিধ জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন বাছুল। সবশেষ গত ৯ অক্টোবর হঠাৎ বুকে ব্যথা শুরু হলে কারাকর্তৃপক্ষ তাকে দ্রুত যশোর জেনারেল হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতায় সাজা শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘ আট বছর বন্দি জীবন কাটাতে হয়েছে তাকে। জীবিত অবস্থায় স্বদেশে ফেরার সব আকুতি ও চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে অবশেষে লাশ হলেন এই ভারতীয় নাগরিক।

কারাগারের চার দেয়াল থেকে মুক্তি মিললেও তার জায়গা হয়েছে এখন হাসপাতালের মর্গে। ১৭ দিন মর্গে পড়ে থাকা বাছুল মাঝির মরদেহ পরিবার পাবে কিনা, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা কাটেনি। পূর্বের বন্দিদের মতো বছরের পর বছর মর্গে পড়ে থাকবে, নাকি শেষ পর্যন্ত নিজ দেশে দাফন হবে—তা আজও অজানা। বাছুল মাঝির মতো যশোর মর্গে পড়ে আছে আরেক ভারতীয় নাগরিক গাজী মণ্ডলের মরদেহ। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার মরুটিয়া থানার গান্ধীনা গ্রামের এই বাসিন্দা অস্ত্র আইনের একটি মামলায় যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি হিসেবে যশোর কারাগারে ছিলেন।

গত ১৯ অক্টোবর কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত মরদেহ দুটি মর্গে রাখা হয়েছে। মরদেহ দুটি একদিকে মর্গে পড়ে থাকা যেমন অত্যন্ত বেদনাদায়ক; অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে মরদেহ সংরক্ষণে বিপাকে রয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত জানান, ‘হাসপাতালের মর্গে মরদেহ রাখার চারটি চেম্বার রয়েছে। তার মধ্যে একটি দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট। তিনটির মধ্যে দুটি দখল হয়ে আছে ভারতীয় বন্দিদের মরদেহ। ফাঁকা থাকা একটিমাত্র চেম্বার নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। ফলে অন্য কোনো মরদেহ রাখা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা কারাকর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছি মরদেহ দুটির বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে।’

অন্যদিকে কারাকর্তৃপক্ষও পড়েছে উভয় সংকটে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কোনো জবাব না আসায় মরদেহ দুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় রয়েছে। জীবিত অবস্থায় স্বদেশে ফেরার এই দুই ভারতীয় নাগরিকের সব আকুতি ব্যর্থ হলেও, সাজা শেষ হওয়া ৪৪ জন বন্দি নিজ বাড়িতে ফেরার আকুতি নিয়ে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রকোস্টে কাটাচ্ছেন জীবনের বছরের পর বছর। বর্তমানে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে অনুপ্রবেশ ও মাদকসহ নানা অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত ভারতীয় বন্দি রয়েছেন ৫২ জন। এর মধ্যে ৪৫ জন ভারতীয় বন্দির কোনো সাজা বাকি নেই। এদের সিংহভাগই বয়স্ক, যাদের মধ্যে সাতজন নারী এবং ২৪ জন পঞ্চাশোর্ধ্ব।

কারাকর্তৃপক্ষ বলছে, এসব বন্দির ১৫ দিন থেকে দুই বছরের সাজা থাকলেও তারা ভোগ করছেন ৮ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত। দীর্ঘ সাজা ভোগ করে মুক্তি পেয়েও ভারত থেকে প্রত্যাবাসনের অনুমোদন না মেলায় দেশে ফেরার অপেক্ষা যেন ফুরাচ্ছে না তাদের।

যশোরের সিনিয়র আইনজীবী ও সাংস্কৃতিককর্মী আমিনুর রহমান হিরু বলেন, ‘সাজা শেষ হওয়ার পরও বছরের পর বছর বিপুলসংখ্যক ভারতীয় নাগরিকের জেলের ঘানি টানা নিঃসন্দেহ দুঃখজনক। মূলত আমাদের কূটনৈতিক দুর্বলতার কারণেই এমনটি ঘটে। এসব নাগরিককে তাদের স্বজনদের কাছে পৌঁছে দিতে দুই দেশের সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।’

যশোরের পাবলিক প্রসিকিউটর সাবেরুল হক সাবু বলেন, ‘অনুপ্রবেশকারী এসব ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর বিচারের মুখোমুখি হন। আদালত তাদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেন। ইতিমধ্যে ৪৫ জনের সাজার মেয়াদ শেষ হলেও আসামি হস্তান্তরের জটিলতায় তারা মুক্তি পাননি।’

দ্রুত স্বজনদের কাছে ফিরতে চান চারল দেবী ও গোবিন্দ বিহারী। অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে ২০২৪ সালের ১২ জানুয়ারি শরীয়তসপুরে আটক হন চারল দেবী। চল্লিশোর্ধ্ব চারল দেবী ভারতের বিহারের দাউদপুর গ্রামের বাসিন্দা। আটকের পর আদালত তাকে ৮ মাসের সাজা দেয়। ওই বছরের ২ সেপ্টেম্বর সাজা শেষ হলেও মুক্তি মেলেনি তার। কারাকর্তৃপক্ষ জানায়, চারল দেবী (৪৮) সারাদিনই কাঁদেন। তার ধারণা, যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রাচীরের বাইরেই ভারত। এই প্রাচীরটি পার হতে পারলেই তিনি তার বাড়ি ভারতের বিহারে যেতে পারবেন। দুই বছর ধরে কাঁদতে কাঁদতে তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছেন।

চারল দেবীর মতো যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে ১৪ বছর ধরে কাঁদছেন গোবিন্দ বিহারী (৪৭)। ২০১১ সালে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশের দায়ে তার এক বছরের কারাদণ্ড হয়। সাজা শেষে দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে তিনি মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছেন। চারল দেবীর সঙ্গে কারাগারে থাকা এক নারী জানান, চারল দেবী সারাদিনই কান্নাকাটি করেন। বাংলা বোঝেন, কিন্তু বলতে পারেন না। তিনি জানিয়েছেন, তার স্বামীর নাম সন্তোষ ধরদু এবং শ্বশুরের নাম মিঠু তিওয়ারি। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে কাপড়ের ব্যবসা করতেন। কখন কীভাবে এই দেশে চলে এসেছেন, তা তিনি নিজেও জানেন না।

কারাকর্তৃপক্ষ জানায়, ভারতীয় এই ৪৫ বন্দির সিংহভাগই বয়স্ক। এদের মধ্যে ২৪ জন পঞ্চাশোর্ধ্ব। ফলে তাদের শারীরিক রোগব্যাধি যেমন আছে, তেমনি রয়েছে মৃত্যুঝুঁকিও। জীবিত থাকা অবস্থায় তাদের থাকা-খাওয়ার যেমন ব্যয় রয়েছে, তেমনি মারা গেলে মরদেহ সংরক্ষণও ব্যয়বহুল। বছরখানেক আগে এক ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যুর পর মরদেহ সংরক্ষণের জন্য ভারতীয় হাইকমিশন তথা ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। দুপক্ষের আলোচনা চূড়ান্ত হওয়ার পর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। আটক এসব বন্দির অধিকাংশেরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ থেকে প্রত্যাবাসনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মেলেনি ভারতীয় হাইকমিশন বা কর্তৃপক্ষের অনুমোদন। এই দীর্ঘসূত্রতা শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতাই নয়, বরং এটি সুস্পষ্টভাবে মানবাধিকারেরও লঙ্ঘন।

দেশের বৃহৎ মানবাধিকার সংগঠন ‘রাইটস যশোর’-এর নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক বলেন, ‘আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া যতই জটিল হোক, মানবিক বিবেচনায় এমন ঘটনার দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি। তাছাড়া মৃত্যুর পর মর্গে পড়ে থাকা মরদেহগুলোর মর্যাদাপূর্ণ শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার অধিকার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালার সঙ্গে সম্পর্কিত।’

যশোর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, ‘অধিকাংশ বন্দি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ থেকে প্রত্যাবাসনের অনুমোদন পেয়েছেন। কিন্তু ভারতীয় কর্তৃপক্ষের প্রত্যর্পণের অনুমোদন না মেলায় তাদের মুক্তি সম্ভব হচ্ছে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভারতীয় হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে এখনও আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায়নি। আমরা আশাবাদী, হাইকমিশনের মাধ্যমে তাদের দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হবে। আর তা না হলে আদালতের মাধ্যমে ফেরত পাঠানোর বিকল্প ভাবনাও রয়েছে।’

 


সম্পর্কিত খবর