চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক কর্মবাজারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মমুখী ধারায় রূপান্তরের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, কেবল সনদনির্ভর শিক্ষা নয়, বরং ব্যবহারিক দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষাই আগামী দিনের বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হবে।
রবিবার রাজধানীর শেরেবাংলানগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলোতে স্নাতক পর্যায়ে আইসিটি কোর্স পাঠদানের জন্য ১২ হাজার শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এআই ও অটোমেশনের এই সময়ে প্রচলিত শিক্ষাক্রমকে আধুনিক ও সময়োপযোগী করা ছাড়া বিকল্প নেই। শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক কর্মবাজারের উপযোগী করে গড়ে তুলতে দক্ষতাভিত্তিক ও প্রযুক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে।”
তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ফ্যাসিবাদী শাসন ও শোষণের কারণে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে বর্তমান গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শিক্ষাক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, প্রোগ্রামিং, ডিজিটাল উদ্যোক্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, ন্যানোপ্রযুক্তি এবং ফাইভ-জি প্রযুক্তির মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে বাস্তবমুখী ও প্রযুক্তিভিত্তিক করার উদ্যোগ নিয়েছে।
শিক্ষিত বেকারত্ব কমাতে শিক্ষানবিশ, ইন্টার্নশিপ ও শিল্পখাতের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকেই তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে ‘সিড ফান্ডিং’ ও ‘ইনোভেশন গ্র্যান্ট’ সুবিধা চালু করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় একটি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করতে পারলে তরুণদের জন্য আন্তর্জাতিক কর্মবাজারে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়েও সচেতন করে গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। স্বাগত বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমান এবং গেস্ট অব অনার হিসেবে বক্তব্য রাখেন শিক্ষা সচিব আব্দুল খালেক।
“কর্মমুখী শিক্ষা নেব, বিশ্বজুড়ে কাজ করব” প্রতিপাদ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে সিলেবাস সংস্কারসহ বিভিন্ন যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এর ফলে লাখ লাখ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে দেশের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রগঠনে অবদান রাখছে।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ জানান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও দক্ষতাভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্যে বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক কর্মবাজারের পরিবর্তিত চাহিদার প্রেক্ষাপটে स्नातक পর্যায়ে আইসিটি কোর্স বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সরকারের এটুআই প্রকল্প ও ইউনিসেফের সহযোগিতায় এ পাঠ্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এছাড়া শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ তৈরি করতে ‘মাল্টি ল্যাংগুয়েজ লার্নিং ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠা এবং আগামী পাঁচ বছরে দুই কোটি গাছ রোপণের লক্ষ্যে ‘ওয়ান স্টুডেন্ট, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচি গ্রহণের কথাও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের পর মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে ‘লিবারেশন টু লিডারশিপ’ শীর্ষক একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়, যেখানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাষ্ট্র ও জনগণবিষয়ক ভাবনা তুলে করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে ক্রেস্ট ও গাছের চারা উপহার দেওয়া হয়। এতে বিএনপি মহাসচিব ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, বিদেশি কূটনীতিক, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত এক হাজার কলেজ এবং প্রায় ছয় লাখ শিক্ষার্থী।