আন্তর্জাতিক

ছাত্র আন্দোলনে সার্বিয়ার প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ

দীর্ঘদিনের সরকারবিরোধী আন্দোলনের মধ্যেই পদত্যাগ করেছেন সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্দার ভুচিচ। প্রায় দুই বছর ধরে চলা ছাত্র নেতৃত্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভের চাপের মধ্যে রোববার পদ ছাড়ার ঘোষণা দেন তিনি। তবে প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়লেও রাজনীতি থেকে সরে যাচ্ছেন না ভুচিচ। আগামী ২৫ অক্টোবরের আগাম সংসদ নির্বাচনে নিজের সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির হয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হওয়ার পথ খুলে নিয়েছেন তিনি। রাজধানী বেলগ্রেডে প্রেসিডেন্ট ভবনের বাইরে সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে ভুচিচ বলেন, তার প্রায় নয় বছরের প্রেসিডেন্ট মেয়াদে সার্বিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় ছিল। গত জুনেই তিনি প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন।

 

সার্বিয়ার সংবিধান অনুযায়ী, দুই মেয়াদ প্রেসিডেন্ট থাকার পর তিনি তৃতীয়বার এ পদে নির্বাচন করতে পারবেন না।  ভুচিচের পদত্যাগের পেছনে দীর্ঘদিনের ছাত্র আন্দোলন বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে সার্বিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় শহর নভি সাদে রেলস্টেশনের ছাদ ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার পর সরকারবিরোধী ক্ষোভ তীব্র হয়ে ওঠে। সংস্কারকাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা জবাবদিহির দাবি তোলে। পরে তাদের সঙ্গে শিক্ষক, শ্রমিক ও কৃষকরাও যোগ দেন।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, নভি সাদের দুর্ঘটনা ছিল ভুচিচের সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির দীর্ঘদিনের শাসনব্যবস্থার অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিফলন। স্টেশনটির সংস্কারকাজের সঙ্গে ভুচিচ নিজেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। প্রকল্পটি সার্বিয়ার অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। দুর্ঘটনার পর সরকারের কয়েকজন কর্মকর্তা পদত্যাগ করলেও আন্দোলন থামেনি। বরং গ্রীষ্মজুড়ে বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে এবং পুলিশের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠে। সরকার অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

 

আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের পাশাপাশি টেনিস তারকা নোভাক জকোভিচও শিক্ষার্থীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। তবে তার সমর্থনের কারণে দেশ ছাড়তে হয়েছে-এমন তথ্য নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ভুচিচের প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল আগামী বছর। কিন্তু পদত্যাগের পর সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। ফলে চলতি বছর শেষ হওয়ার আগেই সার্বিয়ায় সংসদ ও প্রেসিডেন্ট-দুই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর মধ্যে ২৫ অক্টোবর আগাম সংসদ নির্বাচন হবে। এই নির্বাচন নিয়ে ভুচিচের দলকে ছাত্র নেতৃত্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের ‘স্টুডেন্টস উইন’ এবং পশ্চিমাপন্থী বিরোধী দলগুলোর জোট ‘ইউরোপীয় সার্বিয়া’র মুখোমুখি হতে হবে।

 

আগাম সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি ভুচিচের পদত্যাগের পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনও সামনে এসেছে। নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত সংসদের স্পিকার আনা ব্রনাবিচ অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করবেন। তিনিও ভুচিচের সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির সদস্য। পদ ছাড়ার আগে ভুচিচ ৪৯ জনকে ক্ষমা ও সাধারণ ক্ষমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাদের মধ্যে ২৩ জন ছাত্র রয়েছেন। সার্বিয়ার সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম আরটিএস জানিয়েছে, গত দেড় বছরের নানা ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অপরাধে তাদের সন্দেহভাজন করা হয়েছিল। ভুচিচ ওই সময়কে ‘ভয়াবহ ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সার্বিয়ার রাজনীতিতে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন ভুচিচ। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ২০১৭ সালে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি। ইউরোপীয় ইউনিয়নে সার্বিয়ার যোগদানের পক্ষে অবস্থান জানালেও একই সময়ে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন ভুচিচ। চীনের বিনিয়োগের জন্যও সার্বিয়ার দরজা উন্মুক্ত রেখেছেন। প্রেসিডেন্টের পদ ছাড়লেও তাই সার্বিয়ার রাজনীতির কেন্দ্র থেকে সরে যাচ্ছেন না ভুচিচ। বরং রাষ্ট্রপ্রধানের পদ ছেড়ে এবার সরকারপ্রধান হওয়ার লড়াইয়ে নামছেন তিনি।

 



সম্পর্কিত খবর