ফেব্রুয়ারি মাস। বাংলা ভাষা আন্দোলনের মাস। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মাস। বাঙালি জাতির বাংলা ভাষার গৌরবের মাস। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি বাংলা ভাষা মাতৃভাষার স্বীকৃতি আদায় করে । আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং জাতীয় চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত—আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট।
আমরা জানি, ভাষা শুধু মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির পরিচয়, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বাহক। আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিশ্বে বিরল, যেখানে মায়ের ভাষার জন্য মানুষ প্রাণ দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১০ সালে এটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক আগ্রাসনের কারণে গত ২ শতাব্দীতে পৃথিবীতে থেকে অনেক ভাষা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বর্তমান পৃথিবীতে ৭ হাজারের উপর ভাষা প্রচলিত আছে। তার মধ্যে বাংলা একটি ভাষা। বিশ্বের ভাষাভাষী জনসংখ্যার দিক দিয়ে বিবেচনা করলে বাংলা ভাষা পৃথিবীর চতুর্থ বৃহৎ মাতৃভাষা।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ভাষা বা মাতৃভাষা সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রচারের জন্য কাজ করছে। বিশেষ করে বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলোর টিকে থাকার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
প্রতিটি ভাষাগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণ, ভাষা ও সংস্কৃতির সংযোগ স্থাপনে ভূমিকা রেখে একটি জাতির পরিচয় গঠনে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে আসছে। ভাষা শিক্ষা সংরক্ষণ ও উন্নয়নে, বিভিন্ন দেশের ভাষা উন্নয়নে গবেষণালব্ধ তথ্য প্রদান ও সংগ্রহ করে ইনস্টিটিউট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট ভাষা ও সংস্কৃতির সুরক্ষার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। যা বাংলাদেশের পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী ভাষাগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণে কার্যকর গুরুত্ব পালন করছে। আজকের প্রযুক্তিনির্ভর যুগে বিভিন্ন ভাষার ডিজিটাল সংরক্ষণ, ভাষার সফটওয়্যার উন্নয়ন, অনুবাদ প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে ভাষার প্রসার নিয়ে কাজ করছে। ফলে ভাষা সংরক্ষণে এই প্রতিষ্ঠানটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
আমরা যদি ভাষার গুরুত্ব বুঝতে না পারি, তাহলে আমাদের সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়বে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট শুধু ভাষা সংরক্ষণই নয়, বরং বিশ্বব্যাপী মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। তাই, আমাদের দায়িত্ব এই প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করা, মাতৃভাষার চর্চা করা এবং ভাষার বৈচিত্র্যকে রক্ষা করা।
বাঙালি জাতির ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের আত্মত্যাগের দীর্ঘ ৪৭ বছর পর ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর UNESCO ২১ ফেব্রুয়ারিকে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি UNESCO - র ১৮৮ টি সদস্য রাষ্ট্রে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয় । ১৯৯৯ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হলে বাংলাদেশ সরকার একটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর ২০০০ সালের মাঝামাঝিতে ১৯ কোটি ,৪৯ লাখ টাকার "আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট স্থাপন প্রকল্প"। সরকার কর্তৃক অনুমোদিত হয়ে প্রতিষ্ঠানটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। শুরুতে ১২ তলা ভবনের কথা উল্লেখ কাজ শুরু করলেও প্রাথমিকভাবে ৫ তলা নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়। তাতে একটি মিলনায়তন, চারটি সম্মেলন কক্ষ, কম্পিউটার ল্যাব, ভাষা-জাদুঘর, বিশ্বের লিখনরীতি আর্কাইভ, ভাষা প্রশিক্ষণের জন্য ১০টি শ্রেণিকক্ষসহ প্রয়োজনীয় অফিসকক্ষের ব্যবস্থা রাখা হয়। ২০০৪ সালের শেষ দিকে সরকার প্রকল্প সংশোধন করে নির্মাণ কাজ শেষ করার উদ্যোগ নেয়। সংশোধিত প্রকল্পের অধীনে ৩ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণ শেষ হয় ২০১০ সালে। এরপর উদ্বোধনের পর থেকেই ভাষা সংরক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব পালন করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের একটি বিশ্ব ভাষার গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ঢাকার সেগুনবাগিচাস্থ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ভবনের পাশেই ১.০৩ একর জায়গা জুড়ে ভবনটির অবস্থান।
এই প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে পৃথিবীর সব ভাষা সংরক্ষণের উদ্যোগ ও পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে । পাশাপাশি হুমকির সম্মুখিন ভাষার বিস্তার ঘটানোর উদ্যোগ নেয়া হয় । বিভিন্ন ভাষার উপাদান ডাটাবেজে সংরক্ষিত করে শ্রবণ-দর্শন যন্ত্রের মাধ্যমে বিলুপ্তপ্রায় বা বিলুপ্ত ভাষাগুলোকে দৃশ্যমান করা হয়।
আঞ্চলিক ভাষা সংরক্ষণে কাজ করছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর ভাষা সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। ভাষা সংরক্ষণে এই প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের কাছে অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে আমাদের গর্বিত করছে।
লেখক : কবি, সাংবাদিক ও গবেষক