শামসুর নাহার আমাদের সমাজের একজন জীবনযোদ্ধা, একজন গর্বিত দুখিনী মা। এই দুখিনী মায়ের দুঃখের গল্প অনেক। অনেক শুনেছি এই মায়ের গল্প, যা বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। শত দুঃখ, অভাব-অনটন ও কষ্টের মাঝেও তিনি সফলভাবে তাঁর কর্মযজ্ঞ চালিয়ে গেছেন। চালিয়ে গেছেন নিরলস জীবনসংগ্রাম। লক্ষ্য ছিল একটাই—সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করা। করতেও পেরেছেন, কিন্তু দেখে যেতে পারেননি। জীবনসংগ্রামে কখনও থেমে থাকেননি এই মা; হার মানেননি দারিদ্র্যের কাছে। সন্তানদের সুখের জন্য, তাদের মুখে অন্ন তুলে দিতে এবং সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে চালিয়ে গেছেন জীবনযুদ্ধ।
আমাদের সমাজে এমন মায়ের সংখ্যা অনেক বেশি, যাঁরা আমাদের অজানতেই থেকে যান। শামসুর নাহার আর কেউ নন, তিনি ঢাকা থেকে প্রকাশিত জাতীয় দৈনিক 'বায়ান্ন' ও চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় পত্রিকা দৈনিক 'সাঙ্গু’র প্রকাশক ও সম্পাদক কবির হোসেন সিদ্দিকীর মমতাময়ী মা।
২৩ ডিসেম্বর ছিল তাঁর মা শামসুর নাহারের ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকী। প্রতিবছর মায়ের এই মৃত্যুবার্ষিকীতে কবির হোসেন সিদ্দিকী মায়ের যে বর্ণনা দিয়ে থাকেন, তা একটি ইতিহাস, একটি সত্যিকারের জীবনকাহিনি। তাঁর এই বর্ণনায় প্রমাণ করে কবির হোসেন সিদ্দিকীর মাতা শামসুর নাহার একজন গর্বিত মা। অনেকেই দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে প্রতিষ্ঠিত হলে অতীত ভুলে যায়। খুব কম নজিরই আছে কবির হোসেন সিদ্দিকীর মতো অতীত মনে রাখার মানুষের। সেই ক্ষেত্রে কবির হোসেন সিদ্দিকী একজন আদর্শিক পিতা-মাতার সন্তান হিসেবে পরিচয় বহন করেন। দীর্ঘ পথপরিক্রমায় কবির হোসেন সিদ্দিকীর সাথে আমার পরিচয় ঘটে বহু বছর পূর্বে। কাছ থেকে তাঁকে যতটুকু দেখলাম, বুঝলাম মানুষ হিসেবে তিনি অত্যন্ত স্বচ্ছ, নিরহংকার, সহজ-সরল এবং সাদা মনের মানুষ।
২০০৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় শামসুর নাহার মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত দীর্ঘ জীবনসংগ্রামে এই মা ৫ সন্তানকে লালন-পালন তথা মানুষ করতে নিজের সবকিছু বিসর্জন দিয়েছেন। কবির হোসেন সিদ্দিকীর জীবনকাহিনি থেকে যতদূর জানা যায়, তাঁদের সংসারের দায়ভার ছিল মা শামসুর নাহারের ওপর। সন্তানদের দুবেলা খাওয়াতে একসময় বেছে নেন অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ। সারাদিন পরিশ্রম করে যা পেতেন, তা দিয়েও চলত না সংসার। কাজ শেষে বাসায় ফেরার মেঠোপথের দুপাশের বিল থেকে কচুর লতি আর শাক তুলে আনতেন। একবেলা ভাত আর অন্য বেলা কচুশাক খেয়ে জীবনের অনেকটা সময় পার করতে হয়েছে পরিবারের সবাইকে। তবুও সন্তানদের লেখাপড়া শিখানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখে গেছেন তিনি।
কবির হোসেন সিদ্দিকী এবং তাঁর ভাই যখন বান্দরবান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত, বিশেষ করে অষ্টম শ্রেণিতে যখন পড়ছিলেন, তখন স্কুলের নির্ধারিত ড্রেস, সাদা জুতো আর একটা সাদা শার্টের জন্য শিক্ষকের অনেক মার খেতে হয়েছিল। যেখানে তাঁদের দুবেলা খাবারের নিশ্চয়তা ছিল না, সেখানে স্কুলের ড্রেস কেনা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। একসময় মা শামসুর নাহার কবির হোসেন সিদ্দিকীর জয়নাল নামের এক বন্ধু থেকে একটি পুরনো সাদা শার্ট চেয়ে এনে দিয়েছিলেন। সেই শার্ট পরে ৬ মাস স্কুলে যেতে হয়েছে আজকের কবির হোসেন সিদ্দিকীকে।
সাম্প্রতিক সময়ে কবির হোসেন সিদ্দিকীর লেখায় যে বিষয়টি বেশি ফুটে উঠেছে তা হলো—সেই সাদা পুরনো জামাটি তিনি এখনো দীর্ঘ বহু বছর স্মৃতি হিসেবে আগলে রেখেছেন। শুধু স্কুলে কেন, ভালো জামাকাপড় না থাকায় এলাকার কোনো বিয়ে কিংবা সহপাঠীদের কোনো অনুষ্ঠানে দাওয়াত পেতেন না এই পরিবারের কেউই। তবে শামসুর নাহার সত্যিকার অর্থেই একজন মহীয়সী ও গর্বিত মা। কারণ তিনি তাঁর সন্তানকে মানুষ করেছেন। তাঁর সন্তান কবির হোসেন সিদ্দিকী আজ সমাজের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি। তিনি মায়ের কবর জিয়ারত করে প্রতিদিনের কর্ম শুরু করেন এখনো। তাঁর মায়ের মতো কোনো দুখিনী মা নজরে এলেই নিজের মা মনে করে জড়িয়ে ধরেন। মায়ের প্রতি সন্তানের কতটুকু ভালোবাসা থাকলে এমনটা হয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
দীর্ঘ জীবনসংগ্রামে এই গর্বিত দুখিনী মা সন্তানদের স্কুল ফি, পরীক্ষার ফি দিতে নিজের কানের দুল বিক্রি থেকে শুরু করে অনেক কিছুই করেছেন। বাবার অসচ্ছল পরিবারে একমাত্র মা-ই ছিল তাঁদের ভরসা। আজ তাঁদের সুসময়ে তাঁরা প্রতিটি মুহূর্তে মায়ের শূন্যতা অনুভব করে কেঁদে ফেরেন প্রতিনিয়ত। শুভকামনা সেই গর্বিত মায়ের সন্তানদের জন্য।
পরিশেষে মৃত্যুবার্ষিকীর এই দিনে মরহুমা শামসুর নাহারের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতবাসী করুন। আমিন।