খুলনা

সহকারী প্রধান শিক্ষকের ঘুসিতে নারী শিক্ষক গুরুতর আহত, সাতদিনেও বিচার মেলেনি

নড়াইলের কালিয়া প্যারী শংকর পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক শেখ সাহিদুর ইসলাম-এর বিরুদ্ধে এক নারী শিক্ষকসহ দুই সহকর্মীকে মারধরের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার সাত দিন পেরিয়ে গেলেও বিচার না পাওয়ায় ভুক্তভোগী শিক্ষকেরা আতঙ্কের মধ্যে আছেন।

 

অভিযুক্ত অপর শিক্ষক হলেন সহকারী প্রধান শিক্ষকের আপন ছোট ভাই, একই বিদ্যালয়ের শিক্ষক শেখ তকিবুর রহমান।

 

 

ভুক্তভোগী শিক্ষকেরা জানান, সহকারী প্রধান শিক্ষক শেখ সাহিদুর ইসলাম প্রায়ই শিক্ষকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। এর জের ধরে গত ২৩ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সহকারী শিক্ষক প্রশান্ত বিশ্বাস ও চৈতালী বিশ্বাসকে তিনি মারধর করেন।

 

আহত শিক্ষিকা চৈতালী বিশ্বাস বলেন, "ঘটনার দিন আমি শিক্ষক রুমে গিয়ে দেখি সাহিদুর ইসলাম স্যার অন্য শিক্ষকদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা করছেন। একপর্যায়ে তিনি সহকারী শিক্ষক প্রশান্ত বিশ্বাসকে হাতুড়ি দিয়ে মারতে যান। আমি ও অন্য শিক্ষকরা ঠেকাতে গেলে সাহিদুর ইসলাম স্যার আমাকে ঘুসি মারেন। ঘুসিটি আমার কপালের ডান পাশে লেগে রক্ত জমাট হয়ে যায়।"

 

কালিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসার পর গত ২৭ অক্টোবর খুলনায় গিয়ে সিটি স্ক্যান করান চৈতালী বিশ্বাস। চিকিৎসক জানিয়েছেন, তাঁর কপালের উপরিভাগে বেশ ক্ষতি হয়েছে এবং তাঁকে দুই মাস চিকিৎসা নিতে হবে। তিনি বর্তমানে ১৫ দিনের ছুটিতে আছেন। ঘটনার দিনই প্রধান শিক্ষকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও বৃহস্পতিবার (৩০ অক্টোবর) পর্যন্ত তিনি কোনো বিচার পাননি।

 

আরেক ভুক্তভোগী শিক্ষক প্রশান্ত বিশ্বাস বলেন, ঘটনার দিন সহকারী প্রধান শিক্ষক সাহিদুর ইসলাম ধারালো অস্ত্র (কাস্তে) ও হাতুড়ি নিয়ে শিক্ষক রুমে তাঁকে মারতে এসেছিলেন। ঠেকাতে গেলেই অপর শিক্ষক চৈতালী আহত হন। তিনিও লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন, কিন্তু এক সপ্তাহেও কোনো বিচার মেলেনি।

 

 

 

সহকারী প্রধান শিক্ষকের ভাই শেখ তকিবুর রহমান-এর বিরুদ্ধে প্রায়ই ক্লাস ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ করেছেন সহকর্মীরা। বিশেষ করে সোম ও মঙ্গলবার কালিয়া উপজেলায় জমি রেজিস্ট্রির দিনক্ষণ হওয়ায় তিনি জমি বেচাকেনা ও মাপ দেওয়ার কাজে ব্যস্ত থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের বাড়ি বিদ্যালয়ের সংলগ্ন কালিয়া পৌরসভার বেন্দা এলাকায় হওয়ায় তাঁরা স্থানীয় দাপট দেখান বলেও অভিযোগ রয়েছে।

 

স্থানীয় শিক্ষক ও সচেতন মহল জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় অভিযুক্ত দুই শিক্ষক স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধির ছত্রচ্ছায়ায় থাকতেন। গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর দল পাল্টে তাঁরা বর্তমান প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় আছেন। এ কারণে তাঁরা বেপরোয়া আচরণ করছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

 

 

 

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দীপ্তি রানী বৈরাগী জানান, অভিযুক্ত শিক্ষক শেখ সাহিদুর ইসলামকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং সাত দিনের মধ্যে তাঁকে জবাব দিতে বলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত নোটিশের জবাব পাওয়া যায়নি। তবে সহকারী শিক্ষক শেখ তকিবুর রহমানের বিদ্যালয় ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে প্রধান শিক্ষক বলেন, তিনি মাঝে-মধ্যে জমির কাজ করতে গেলেও বিদ্যালয় ফাঁকি দিয়ে যান না।

 

কালিয়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (চলতি দায়িত্ব) মুহম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, "দুই শিক্ষককে মারধরের অভিযোগ পেয়েছি। প্রধান শিক্ষকের প্রতিবেদনের অপেক্ষায় আছি। এরপর কালিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

 

 

 

১৯১১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়ে গত কয়েক বছর ধরে শিক্ষার পরিবেশ ভালো নেই বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের। প্রায় ১৫ বছর আগে ৭০০ থেকে ৮০০ শিক্ষার্থী থাকলেও বর্তমানে এই সংখ্যা কমে ৪৫১ জনে দাঁড়িয়েছে।

 

ভুক্তভোগী শিক্ষক ও অভিভাবকেরা বিদ্যালয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং আতঙ্ক দূর করতে অভিযুক্ত দুই শিক্ষককে দ্রুত অপসারণ করে মারধরের ঘটনার বিচার দাবি জানিয়েছেন।



সম্পর্কিত খবর