দেশের কৃষি গবেষণায় নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (গাকৃবি)। প্রতিষ্ঠানটির কৃষিতত্ত্ব বিভাগের গবেষকদের দীর্ঘ এক দশকের নিবিড় প্রচেষ্টায় উদ্ভাবিত হয়েছে স্বল্পমেয়াদী, উচ্চ ফলনশীল ও চিকন আউশ ধানের নতুন জাত ‘জিএইউ ধান-৪’।
গবেষণাটির নেতৃত্ব দেন প্রখ্যাত কৃষিতত্ত্ববিদ প্রফেসর ড. এম. ময়নুল হক এবং প্রফেসর ড. মোঃ মসিউল ইসলাম। তাঁদের নিরলস গবেষণার ফলে উদ্ভাবিত এই জাতটি ইতোমধ্যে জাতীয় বীজ বোর্ডের ১১৫তম সভায় গত ৫ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পেয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ‘জিএইউ ধান ৪’ উদ্ভাবনের মাধ্যমে গাকৃবির উদ্ভাবিত ফসলের জাতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৫টিতে, যার মধ্যে ধানের জাতই চারটি। কৃষি গবেষণা ও খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এটি একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে আউশ মৌসুমে ধানের ফলন সাধারণত আমন ও বোরোর তুলনায় কম হয়ে থাকে। তবে নতুন এই জাতটি সেই ধারণা বদলে দিতে পারে বলে আশা করছেন গবেষকরা। স্বল্প সময়ের মধ্যে পরিপক্ব হওয়ায় কৃষকরা দ্রুত জমি খালি করে বছরে তিন থেকে চারটি ফসল উৎপাদনের সুযোগ পাবেন, যা বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের মঙ্গাপীড়িত এলাকায় কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ‘জিএইউ ধান ৪’ তুলনামূলক কম পানিতে চাষযোগ্য এবং দেশের প্রায় সব অঞ্চলের জন্য উপযোগী। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এটি কৃষি ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
চিকন চালের ক্রমবর্ধমান চাহিদা বিবেচনায় রেখে এই জাতটি উদ্ভাবন করা হয়েছে। প্রচলিত আউশ জাত ‘পারিজা’ এবং উচ্চ ফলনশীল চিকন জাত ‘বিইউ ধান ২’-এর সংকরায়নের মাধ্যমে ‘জিএইউ-৯৯৭৪-৫২-৭-২’ নামের একটি লাইন নির্বাচন করা হয়, যা পরবর্তীতে ধারাবাহিক পরীক্ষায় সফলতা দেখায়।
২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে আঞ্চলিক অভিযোজন, উপযোগিতা যাচাই এবং মাঠ পর্যায়ের মূল্যায়নে এ জাতটি স্বল্পমেয়াদী ও উচ্চ ফলনশীল হিসেবে প্রমাণিত হয়।
পুষ্টিগুণের দিক থেকেও ‘জিএইউ ধান ৪’ উল্লেখযোগ্য। এতে অ্যামাইলেজ এনজাইমের পরিমাণ প্রায় ২৪.৫৮ শতাংশ এবং প্রোটিন প্রায় ৮.৩৮ শতাংশ, যা মানবদেহের শক্তি উৎপাদন, বৃদ্ধি ও কোষ মেরামতে সহায়ক।
ধানটির দানা লম্বা ও চিকন এবং বপনের ৩ মাস থেকে ৩ মাস ১০ দিনের মধ্যেই ফসল সংগ্রহ করা সম্ভব। অনুকূল পরিবেশে হেক্টরপ্রতি ৫ থেকে ৫.৫ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়, যা প্রচলিত জাতের তুলনায় ১০-১৫ শতাংশ বেশি।
এ জাতের চাষে প্রতি হেক্টরে ২৫-৩০ কেজি বীজ প্রয়োজন হয় এবং রোগবালাই প্রতিরোধ ক্ষমতাও তুলনামূলক বেশি। বেলে দো-আঁশ ও এটেল দো-আঁশ মাটি এ জাতের জন্য উপযোগী বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে প্রফেসর ড. মোঃ মসিউল ইসলাম বলেন, “কৃষকদের জন্য স্বল্প সময়ে বেশি ফলনশীল এবং বাজারযোগ্য চিকন ধানের জাত উদ্ভাবনই ছিল আমাদের মূল লক্ষ্য। ‘জিএইউ ধান ৪’ কৃষকের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারে ভূমিকা রাখবে।”
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান গবেষকদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, “এই উদ্ভাবন আমাদের গবেষকদের মেধা ও নিষ্ঠার প্রতিফলন। এটি দেশের কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।”
কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ‘জিএইউ ধান ৪’ দেশের কৃষি খাতে একটি যুগান্তকারী সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হবে।