কখনো ডাহুক পাখির সুরেলা ডাক, কখনো পানকৌড়ির ডানা ঝাঁপটানি, আবার কখনো কপোতাক্ষ নদের কলকল শব্দ- প্রকৃতির এমন অপার সৌন্দর্যের মাঝে যশোরের ঝিকরগাছার কাটাখাল এলাকায় অনুষ্ঠিত হলো ব্যতিক্রমী এক পাঠচক্র। ‘সপ্তাহে একটি বই পড়ি’ সংগঠনের আয়োজনে শুক্রবার দুপুর আড়াইটায়, কপোতাক্ষের বুকে নৌকায় বসে কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস ‘কবি’ নিয়ে পাঠচক্র ও সাহিত্য-আলোচনার আয়োজন করা হয়।
শুধু পাঠচক্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না এই আয়োজন। নদের বুক চিরে এগিয়ে চলা নৌকার দোলায় ঠান্ডা বাতাসের পরশ, চারপাশে পাখিদের কলরব আর নদীর জলের ধ্বনি মিলে সৃষ্টি করেছিল এক অনন্য সাহিত্যিক পরিবেশ। ‘কবি’ উপন্যাসের গভীর বিশ্লেষণের পাশাপাশি গান, কবিতা আবৃত্তি ও প্রাণবন্ত বিতর্কের মাধ্যমে পাঠচক্রটি হয়ে ওঠে আরও সমৃদ্ধ ও উপভোগ্য।

সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোরের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শাহ্জাহান কবীরের সভাপতিত্বে এবং পাঠচক্রবন্ধু মুরাদ হোসেনের সঞ্চালনায় শুরু হয় আলোচনা।
উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশন করেন সালেহা সুলতানা ঊষা। এরপর পাঁচ মিনিটের মেডিটেশন পর্ব ও অভিজিৎ কুমার তরফদারের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মূল পাঠপর্ব শুরু হয়। পাঠচক্রে অংশগ্রহণ করেন খাদিজা একরাম এষা, সোনিয়া আফরিন, অপু দেবনাথ, জান্নাতুল ফেরদৌস ইলা, হামিদা হিমু, আনিকা প্রমুখ।
আলোচনার মাঝে কবিতা পাঠ করেন কবি মামুন আজাদ, মনিরা খাতুন এবং লোকগান পরিবেশন করেন স্থানীয় বাউলশিল্পী সোহরাব হোসেন। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি প্রকৃতির মাঝে এমন প্রাণবন্ত পরিবেশে পাঠচক্রের আয়োজন উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করে।
আলোচনার একপর্যায়ে ‘কবি’ উপন্যাসকেন্দ্রিক রম্য বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। বিতর্কের বিষয় ছিল- ‘বসন্ত নয়, ঠাকুরঝিই ছিল নিতাইয়ের প্রকৃত ভালোবাসা’।
পক্ষ দল: মুরাদ হোসেন, সায়মা আক্তার তৌফা, অভিজিৎ তরফদার ও সোনিয়া আফরিন।বিপক্ষ দল: অপু দেবনাথ, সালেহা সুলতানা ঊষা, খাদিজা একরাম এষা ও জান্নাতুল ফেরদৌস ইলা।
বিতর্কে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন কবি মামুন আজাদ, সাংবাদিক সালমান হাসান রাজীব ও সংগঠনের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক সুমন রেজা। যুক্তিতর্কের ধারাবাহিকতায় পক্ষ দল বিজয়ী হয় এবং শ্রেষ্ঠ বক্তার স্বীকৃতি পান অভিজিৎ তরফদার।
উপন্যাসের বহুমাত্রিক বিশ্লেষণের অংশ হিসেবে যশোর সরকারি মহিলা কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. মোফাজ্জেল হোসেন ও সহকারী অধ্যাপক মো. শাহ্জাহান কবীর প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নেন।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে বিতার্কিকদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। শ্রেষ্ঠ স্বেচ্ছাসেবকের স্বীকৃতি পান মুরাদ হোসেন এবং শ্রেষ্ঠ বই-বন্ধু নির্বাচিত হন সুমন রেজা।
সংগঠনের সভাপতি শাহ্জাহান কবীর বলেন, “‘কবি’ উপন্যাস পাঠের সময় পাঠচক্রবন্ধুদের মাঝে নিতাই, ঠাকুরঝি ও বসন্তের ভালোবাসা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এ বিষয়টি আরও বিশ্লেষণ করতে আমরা যুক্তিনির্ভর রম্য বিতর্কের আয়োজন করি, যা পাঠের আনন্দ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।”
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের পাঠচক্র শুধু বই পাঠের সুযোগই করে দেয় না, বরং সাহিত্যচর্চাকে আনন্দদায়ক ও বিশ্লেষণধর্মী করে তোলে।
যশোর থেকে পরিচালিত ‘সপ্তাহে একটি বই পড়ি’ সংগঠনটি এখন একটি জনপ্রিয় পাঠচক্র প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। এর বৈচিত্র্যময় উদ্যোগ ও সাহিত্যিক চর্চা ইতোমধ্যেই দেশজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এ ধরনের উদ্যোগ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে পাঠাভ্যাস বাড়বে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে নতুন মাত্রা যুক্ত হবে।
বায়ান্ন/এএস/পিএইচ