ঢাকার রাস্তায় বের হলেই চোখে পড়ে অসংখ্য ভিক্ষুকের সারি। বাসস্ট্যান্ড, ট্রাফিক সিগন্যাল, শপিং মল কিংবা বাজার- যেখানেই যান না কেন, একাধিক হাত আপনার দিকে বাড়িয়ে দেওয়া হবে। কখনো বৃদ্ধ, কখনো শিশু, কখনো বা শারীরিক প্রতিবন্ধী কেউ করুণ কণ্ঠে সাহায্যের আবেদন জানাবে। কেউ হাত তুলে দোয়া করবে, কেউ গা ছুঁয়ে কিছু সাহায্য চেয়ে বসবে। অনেকের আবার সঙ্গে থাকবে ছোট ছোট বাচ্চা, যারা মায়ের কোলে কাঁদতে কাঁদতে এক টুকরো খাবারের আশায় পথচারীদের দিকে চেয়ে থাকে। রাজধানীর প্রতিটি ব্যস্ত এলাকায়, প্রতিটি মোড়ে, প্রতিটি মার্কেটের প্রবেশদ্বারে যেন ভিক্ষুকের অবাধ বিচরণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকায় ভিক্ষুক বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব তো রয়েছেই, পাশাপাশি গ্রাম থেকে রাজধানীমুখী অভিবাসনের প্রবণতাও এটি বাড়িয়ে তুলছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মসংস্থানের অভাব, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গ্রামাঞ্চলে কৃষিনির্ভর জীবন কঠিন হয়ে পড়া, নদীভাঙন বা বন্যায় গৃহহীন হয়ে যাওয়া অনেকেই আশ্রয়ের সন্ধানে ঢাকায় এসে ভিক্ষাবৃত্তিকে বেছে নিচ্ছে। এছাড়া শহরের বিভিন্ন সংঘবদ্ধ চক্র পরিকল্পিতভাবে ভিক্ষাবৃত্তিকে ব্যবসায় পরিণত করেছে। ঢাকার রাস্তায় অনেক ভিক্ষুকই আসলে এই চক্রের নিয়ন্ত্রিত সদস্য, যারা প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করে তা দলের গডফাদারদের হাতে তুলে দেয়। এসব চক্রই নতুন নতুন ভিক্ষুক সংগ্রহ করে তাদের রাস্তায় নামায়, এমনকি শিশু চুরি করেও এই কাজে ব্যবহার করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকায় বর্তমানে আনুমানিক ৫০ হাজারের বেশি ভিক্ষুক রয়েছে, তবে বেসরকারি সংস্থাগুলোর মতে, এই সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে রমজান, ঈদ, দুর্গাপূজা বা বড় কোনো উৎসবের সময় গ্রাম থেকে ভিক্ষুকদের ঢাকায় আসার হার বেড়ে যায়। গুলিস্তান, শাহবাগ, নিউ মার্কেট, ফার্মগেট, মতিঝিল, বনানী, ধানমন্ডি, গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায় ভিক্ষুকদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। ট্রাফিক সিগন্যালে গাড়ি থামার সঙ্গে সঙ্গেই হুইলচেয়ারে বসা এক ব্যক্তি বা কোলের শিশুকে দুধের কৌটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক মা সাহায্য চাইতে আসবে, এমন দৃশ্য এখন নগরবাসীর কাছে খুবই সাধারণ।
ঢাকাকে ভিক্ষুকমুক্ত করতে একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সিটি করপোরেশন, পুলিশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো মিলে পুনর্বাসন কর্মসূচি চালু করেছে, সরকারি পর্যায়ে কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কখনো কখনো রাস্তা থেকে ভিক্ষুকদের সরানোর চেষ্টাও করেছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ এখন পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদে সফল হয়নি। অনেক ভিক্ষুক পুনর্বাসন কেন্দ্রে গিয়ে কিছুদিন থাকার পর আবার রাস্তায় ফিরে আসে। কারণ সেখানে টিকে থাকা কঠিন, এবং শহরের ভিক্ষাবৃত্তি থেকে উপার্জনের পথ অপেক্ষাকৃত সহজ।
নগরবাসীর প্রতিক্রিয়াও মিশ্র। কেউ কেউ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়, আবার অনেকে বিরক্ত হন। বিশেষ করে সংঘবদ্ধ ভিক্ষাবৃত্তির কারণে মানুষের মধ্যে সহানুভূতির চেয়ে প্রতারণার শিকার হওয়ার আশঙ্কাই বেশি কাজ করে। অনেকেই অভিযোগ করেন, প্রকৃত অসহায়দের চেয়ে সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যরা সাহায্য চাইতে বেশি সক্রিয়। ফলে কে প্রকৃত অভাবী, আর কে পেশাদার ভিক্ষুক- তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
ঢাকার রাস্তায় ভিক্ষুকদের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকলে এটি শুধু সামাজিক সমস্যাই নয়, নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারে। অপরাধীদের জন্য এটি এক ধরনের ছদ্মবেশ হতে পারে, যার সুযোগ নিয়ে ছিনতাই বা প্রতারণার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। তাই এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। শুধুমাত্র আইন করে ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ করা সম্ভব নয়, বরং দরকার দীর্ঘমেয়াদী দারিদ্র্য বিমোচন পরিকল্পনা, টেকসই কর্মসংস্থান, পুনর্বাসন প্রকল্পের বাস্তবায়ন ও ভিক্ষুক চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা। না হলে রাজধানীর ব্যস্ত রাস্তাগুলো ভিক্ষুকের দখলে চলে যেতে খুব বেশি সময় লাগবে না।
বায়ান্ন/এএস/একে