খুলনা

বেনাপোল স্থলবন্দরের পণ্যাগার অগ্নিঝুঁকিতে ১০ বছরে ৮ বার আগুন

দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলের পণ্যাগারগুলো (গুদাম ও ওপেন ইয়ার্ড) ভয়াবহ অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে। গত ১০ বছরে বন্দরের গুদামে আটবার আগুন লাগার ঘটনা ঘটলেও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা আজ পর্যন্ত কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি। সম্প্রতি ঢাকার বিমানবন্দর কার্গো ভিলেজে আগুন লাগার পর বেনাপোল বন্দর ব্যবহারকারীদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক বিরাজ করছে।

 

সম্প্রতি ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে বেনাপোল বন্দরে অগ্নি নিরাপত্তার অপ্রতুলতা ও দুর্বলতার কথা জানিয়েছে। তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বন্দরের অধিকাংশ গুদাম ও ওপেন ইয়ার্ডে নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

 

বেনাপোল ফায়ার সার্ভিসের ইনচার্জ বায়োজিদ বোস্তামি জানান, গত ৩০ সেপ্টেম্বর তাঁরা বন্দরের গুদামগুলো পরিদর্শন করেছেন। ৩২, ৩৩, ৩৪, ৩৫ ও ৩৮ নম্বর শেডে কেমিক্যাল রাখা হয়। সেখানে ওই সময় ২৬ লাখ ৭১ হাজার ৬৫১ কেজি কেমিক্যাল পণ্য ছিল। তিনি বলেন, "বন্দরের অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা অপ্রতুল। আমরা দাহ্য পদার্থ কীভাবে রাখতে হয় তার সঠিক দিকনির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছি।"

 

 

বন্দর ব্যবহারকারী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রধানত তিনটি কারণে অগ্নিঝুঁকি প্রকট হচ্ছে:

 

স্থান স্বল্পতা ও পণ্য ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত মজুত: বেনাপোল বন্দরে ৩৮টি গুদাম ও ওপেন ইয়ার্ডের ধারণক্ষমতা ৪৭ হাজার ৪৪০ টন পণ্য, কিন্তু এখানে প্রায় দেড় লাখ টন পণ্য গাদাগাদি করে রাখা হচ্ছে।

 

দাহ্য পণ্যের অনিরাপদ অবস্থান: বন্দরের অভ্যন্তরে অতি দাহ্য পণ্যের (যেমন—ড্রামভর্তি ডাইস, রেইজিং পাউডার, ছাপাখানার কালি, মোটরগাড়ির ইঞ্জিন তেল ইত্যাদি) সঙ্গে সাধারণ পণ্য কাছাকাছি রাখা হচ্ছে, যা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

 

ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা: ব্যবহারকারীরা অভিযোগ করেছেন, গুদামে থাকা বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রগুলো (এক্সটিংগুইশার) ব্যবহারের উপযোগী নয় এবং আগুন নেভানোর নিজস্ব কোনো ভালো ব্যবস্থাপনা নেই।

 

বন্দর ব্যবহারকারী সূত্রে আরও জানা যায়, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকায় প্রতিবারই আগুন নেভাতে ব্যর্থ হয় বন্দর কর্তৃপক্ষ, যার ফলে কোটি কোটি টাকার পণ্য পুড়ে যায়। সর্বশেষ গত বছরের ২৬ আগস্ট বন্দরের ৩৫ নম্বর শেডে আগুনে কোটি টাকার আমদানি করা পণ্য পুড়ে যায়।

 

 

আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতি বেনাপোলের সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, "গত ১০ বছরে বন্দরে অন্তত আটবার আগুন লেগেছে। এতে শত শত কোটি টাকার পণ্য পুড়ে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি।" তিনি বন্দর ও পুলিশ প্রশাসনকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, "দেশবিরোধীরা নাশকতা ঘটাবে না এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।"

 

বেনাপোল ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়াডিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি মফিজুর রহমান সজন অগ্নিঝুঁকি এড়াতে পণ্য রাখার জায়গা বাড়ানো এবং অতি দাহ্য পণ্য নিরাপদ স্থানে রাখার ওপর জোর দেন।

 

যশোর চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি ও আমদানিকারক মিজানুর রহমান খান অভিযোগ করেন, ব্যবসায়ীরা সরকারকে রাজস্ব ও বন্দরের ভাড়া দেওয়া সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ পণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে না। তিনি রহস্যজনক কারণে বন্দরের পক্ষ থেকে পণ্যের বিমা (বীমা) না করার বিষয়টিও উল্লেখ করেন। তিনি কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়া এবং পুরো বন্দর সিসি ক্যামেরার আওতায় আনার দাবি জানান।

 

 

এ ব্যাপারে বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক শামিম হোসেন রেজা বলেন, "অগ্নিঝুঁকি নেই এই কথা বলব না। তবে কেউ যদি নাশকতা করার চেষ্টা না করে, সেজন্য কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বন্দর সচল রাখার পাশাপাশি আগুন প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলে হাই অ্যালার্ট জারি করেছি। প্রতিটি গুদামে ফায়ার হাইডেন পয়েন্ট ও ফায়ার পাম্প রয়েছে।"



সম্পর্কিত খবর