অর্থনীতি ও বাণিজ্য

৬০১ কোটির খরচে দেড়শ কোটিই লুট!

৬০১ কোটির খরচে দেড়শ কোটিই লুট! প্রায় পাঁচ বছর আগে উন্নয়নের রঙিন স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ‘উইকেয়ার’ প্রকল্প। ২০২০ সালে যশোর, মাগুরা, চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহ জেলার ১৮টি উপজেলায় গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন, বাজার আধুনিকায়ন এবং কৃষিপণ্য পরিবহন সহজতর করতে এই প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। প্রকল্পের নাম ছিল ‘ওয়েস্টার্ন ইকোনমিক করিডোর অ্যান্ড রিজিওনাল এনহ্যান্সমেন্ট প্রোগ্রাম (উইকেয়ার) ফেজ-১: রুরাল কানেক্টিভিটি, মার্কেট অ্যান্ড লজিস্টিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইমপ্রুভমেন্ট’। লক্ষ্য ছিল ৬১১ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন, ৩২টি বাজার আধুনিকায়ন এবং অর্থনৈতিক করিডোরে প্রবেশাধিকার বাড়িয়ে কৃষির উৎপাদনশীলতা ও বাজার সংযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রাণ ফেরানো। প্রকল্পের মোট বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ১৮০ কোটি টাকা। যার অর্থায়ন করেছে বিশ্বব্যাংক এবং সরকার। কিন্তু পাঁচ বছরে এসে প্রকল্পের বাস্তবায়ন চিত্র ভয়াবহভাবে পিছিয়ে পড়েছে। নির্ধারিত ৫৭ মাসের প্রকল্পের ৫৩ মাস পার হলেও বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ২৭ শতাংশ। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে ৬০১ কোটি টাকা, অথচ সেই অর্থের ব্যবস্থাপনাতেও উঠেছে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ। আইএমইডি জানায়, খরচ করা এই অর্থের মধ্যে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা লোপাটের প্রমাণ মিলেছে নিরীক্ষা কার্যক্রমে। প্রকল্পে আর্থিক অস্বচ্ছতা, অকার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পনার ভুলের কারণে তা কার্যত ব্যর্থতার এক জীবন্ত উদাহরণে পরিণত হয়েছে। প্রকল্পের অগ্রগতির দিক থেকে এটি সরকারিভাবে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত একটি প্রকল্প হওয়া সত্ত্বেও এর এমন করুণ অবস্থা সরকার ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশায় বড় ধাক্কা দিয়েছে। আইএমইডির নিবিড় তদারকি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই প্রকল্পের অধীনে যে কাজ হওয়ার কথা ছিল, তার অধিকাংশই হয়নি। এমনকি ভূমি অধিগ্রহণ পর্যন্ত সম্পন্ন হয়নি। অথচ ডিপিপি অনুযায়ী ভূমি অধিগ্রহণের জন্য সংরক্ষিত ছিল ৩৩৫ কোটি টাকা। প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত ১৯টি প্যাকেজের একটিও এখনও পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি। শুধু কাজের ধীরগতি নয়, বরং প্রকল্পের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাতেও ভয়াবহ দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। গত চার অর্থবছরে ১৮টি অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে, যার বেশিরভাগই এখনো নিষ্পত্তিহীন রয়ে গেছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২০-২০২১ অর্থবছরে তিনটি অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়, যার মধ্যে মাত্র একটি নিষ্পত্তি হয়। বাকি দুটি আপত্তির আর্থিক মূল্য ছিল ৬ লাখ ৪৬ হাজার ২১০ টাকা, যা এখনো ঝুলে আছে। ২০২১-২২ অর্থবছরেও তিনটি অডিট আপত্তি ওঠে, যার মধ্যে একটি নিষ্পত্তি হয়েছে। বাকি দুটির মধ্যে রয়েছে ৬১ লাখ ১৫ হাজার ৪৯৩ টাকা ১৬ পয়সার অর্থ, যেটির নিষ্পত্তি হয়নি। সবচেয়ে বেশি অডিট আপত্তি দেখা গেছে ২০২২-২৩ অর্থবছরে। এই বছরে ৬টি আপত্তি উত্থাপিত হয়, যার সবগুলোর জবাব প্রকল্প কর্তৃপক্ষ দিলেও নিরীক্ষক তা অপ্রতুল বিবেচনা করেছেন। এই বছরের আপত্তিকৃত মোট অর্থের পরিমাণ ১৩৩ কোটি ২৩ লাখ ৮৫ হাজার ৭৮২ টাকা। সর্বশেষ ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরেও ৬টি নতুন অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়। একটির জবাব জমা দেওয়া হলেও তা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি, বাকি ৫টির জবাব এখনো প্রক্রিয়াধীন। এই বছরের অনিষ্পন্ন আপত্তির পরিমাণ ৮ কোটি ৯৬ লাখ ৪৪ হাজার ১৭১ টাকা। বিশ্লেষকরা বলছেন, এত বড় পরিসরে আর্থিক অনিয়ম এবং এর দায়ে জবাবদিহির অনুপস্থিতি প্রকল্প বাস্তবায়নে দায়িত্বশীলতার অভাবকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। তারা আরও বলেন, এই অনিয়ম শুধু প্রকল্পকে ব্যর্থ করেনি, বরং সরকারকে আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে ফেলেছে। আইএমইডির সচিব মো. কামাল উদ্দিন বলেন, যেসব প্রকল্পে অগ্রগতি খুবই কম, সেগুলোর তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। প্রয়োজনে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। কিন্তু এমন পর্যায়ে এসে পিডি পরিবর্তনের কথা ভাবা প্রকল্পের সার্বিক ব্যর্থতাকেই সামনে আনে। এলজিইডির পক্ষ থেকে এসব ব্যর্থতার পেছনে দায়ী করা হয়েছে কোভিড-১৯ মহামারিকে, প্রকল্প অনুমোদনে দেরি, ঠিকাদার নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা, চুক্তি সম্পাদনে বিলম্ব, এবং ভূমি অধিগ্রহণ না হওয়াকে। এমনকি রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধিকেও প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বাধাস্বরূপ চিহ্নিত করেছে সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দীর্ঘদিন পার হওয়ার পরও প্রকল্পের বাস্তবায়নে যে অগ্রগতি নেই বললেই চলে, তা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। কৃষকের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির কথা বলে নেওয়া প্রকল্প এখন কৃষকের কোনো উপকারেই আসেনি। বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন, সড়ক নিরাপত্তা—সবই থেকে গেছে কাগজে-কলমে। এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের ক্রয় পরিকল্পনায় একই প্যাকেজে সড়ক, ব্রিজ, কালভার্ট ও মার্কেট একত্রে অন্তর্ভুক্ত করার মতো জটিলতা প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দরপত্র মূল্যায়ন ও অনুমোদনের ধীরগতি, প্রাক্কলিত ব্যয়ের সঙ্গে বাস্তব ব্যয়ের অসামঞ্জস্যতাও প্রকল্প পরিকল্পনার দুর্বলতা এবং অব্যবস্থাপনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। আইএমইডির তদারকি প্রতিবেদনেও এসব বিষয় উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, প্রকল্প বাস্তবায়নে সময়ানুবর্তিতা, কার্যকর তদারকি ও অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা না থাকায় এমন পরিণতি হয়েছে। উন্নয়ন খাতে সরকারি ব্যয়ের একটি বড় অংশ এই প্রকল্পের মতো অব্যবস্থাপনায় হারিয়ে যাচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন দর্শনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, আমাদের দেশে প্রকল্প নেওয়া ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা ভুল ও অনিয়মের চিত্র স্বাভাবিকতায় রূপ নিয়েছে। প্রকল্প পরিকল্পনায় ভুল হলে বাস্তবায়নেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে—এটা তো স্বাভাবিক। কিন্তু এটিকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে অনিয়মের প্রবণতাও রয়েছে। সবশেষে রাষ্ট্র এখানে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জায়গা শক্তিশালী না হলে এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় যখন জনগণের হাজার কোটি টাকার অর্থ ব্যয় হয়, তখন এমন একটি প্রকল্পের ব্যর্থতা কেবল স্থানীয় জনগণের ক্ষতি নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ে আস্থাহীনতা তৈরি করে। তারা মনে করেন, প্রকল্প গ্রহণের সময়ই স্বচ্ছতা, বাস্তবতা যাচাই এবং দুর্নীতিমুক্ত কাঠামো নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে আরও বড় বড় প্রকল্প কেবলই কাগজে থাকবে, বাস্তবে নয়। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারের উচিত প্রকল্প পরিচালনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কার্যকর মূল্যায়ন করা, এবং দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তা না হলে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে নেওয়া এসব প্রকল্প জনগণের চোখে উন্নয়নের বদলে লুটপাটের প্রতীক হয়ে দাঁড়াবে।



সম্পর্কিত খবর