ঢাকা, বৃহস্পতিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ৪ঠা আশ্বিন ১৪৩১

বাড়তি বইয়ের বোঝা বাড়াচ্ছে কেজি স্কুলগুলো

নিজস্ব প্রতিবেদক : | প্রকাশের সময় : বুধবার ৫ জানুয়ারী ২০২২ ০৪:৫৭:০০ অপরাহ্ন | শিক্ষা

রাজধানীসহ সারাদেশে ব্যাঙেরছাতার মতো গড়ে উঠছে শিশু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ছোট-বড় সব শহর এমনকি মফস্বলেও আজকাল কিন্ডারগার্টেন স্কুল ও কোচিং সেন্টারের দেখা মিলছে অহরহ। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রি-প্লে থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান চলছে। অথচ বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানেরই নেই প্রাথমিক (ডিপিই) কিংবা মাধ্যমিক উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের অনুমোদন। অনেকাংশে নেই মানসম্মত শিক্ষার অনুকূল পরিবেশও।

এই স্কুলগুলোতেই পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের বাইরে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে বাড়তি বই। এতে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের কাঁধে বাড়ছে বইয়ের বোঝা। বাড়তি বইয়ের জন্য অভিভাবকদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে কাড়ি কাড়ি অর্থ। আবার নিজেদের অনুমোদন না থাকায় অন্য কোনো স্কুল থেকে জেএসসি ও এসএসসির রেজিস্ট্রেশন করাচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠান। করোনাকালে নানা সংকটে এ ধরনের অনেক স্কুল বন্ধ হলেও এখন কিছু কিছু চালু হচ্ছে। সারাদেশে এমন স্কুলের সংখ্যা অর্ধলাখ।

কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলো আমাদের অধীনে নয়। সেগুলোর ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণও নেই। সেসব প্রতিষ্ঠান কি করে কীভাবে চলে তা আমরা জানতে পারি না। ফলে অনিয়ম হলে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও থাকে না। 

রাজধানীর বকশিবাজার মোড়ে তেমনই একটি স্কুলের নাম অগ্রগামী শিশু নিকেতন। প্রতিষ্ঠানটির নার্সারিতে মোট আটটি বই পড়ানো হয়। এগুলোর মধ্যে একটি সরকারি; বাকি সব স্কুল কর্তৃপক্ষ পাঠ্য হিসেবে নির্বাচন করেছে। এসব বই বাবদ প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে এক হাজার ৭০০ টাকা। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি বছর বছর পোশাক পরিবর্তন করে, যেন একই পোশাক কোনো শিক্ষার্থী এক বছরের বেশি পরতে না পারে। এ বছর নতুন পোশাক বাবদ ৯৫০ টাকা আর ভর্তি ও জানুয়ারি মাসের বেতন বাবদ নেওয়া হয়েছে ১২ হাজার টাকা। এর মধ্যে ছয় হাজার টাকার কোনো রসিদ দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

শুধু এ প্রতিষ্ঠানটিই নয়, রাজধানীর বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠা কিন্ডারগার্টেন (কেজি) স্কুলগুলোতে শিশুদের কাঁধে তুলে দেওয়া হচ্ছে বইয়ের বোঝা। করোনার দিনগুলোতে বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। গত সেপ্টেম্বরে সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিলেও কেজি স্কুলের দিকেই ঝোঁক অভিভাবকদের। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ভেবে অভিভাবকরা তাদের শিশুসন্তানদের হাতেখড়ি দিতে মূলধারার স্কুলে যাওয়ার আগে ভর্তি করাচ্ছেন এসব প্রতিষ্ঠানে। এ সুযোগে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের বইয়ের বোঝা বাড়িয়ে কেজি স্কুলগুলো নানা উপায়ে আদায় করছে কাড়ি কাড়ি টাকা।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফজলে রাব্বি হলের সামনে অবস্থিত অগ্রগামী শিশু নিকেতন প্রতিষ্ঠানের সামনে কথা হয় এক অভিভাবকের সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করে এ অভিভাবক বলেন, ‘বুঝেনই তো, বাচ্চা (সন্তানকে) ভর্তি করেছি। তাই জিম্মি। কিছু বলতে পারছি না। চার বছরের বাচ্চার আটটি বই পাঠ্য করেছে। এর মধ্যে সাতটিই স্কুল থেকে বিক্রি করা হচ্ছে।’

সব স্কুলে এসব বই পড়ায়, বই কম হলে অভিভাবকরা অভিযোগ করেন। এ কারণে টাকা নিয়ে বাড়তি বই দেওয়া হয়। স্কুলের ফ্ল্যাটটির মাসিক ভাড়া ২৭ হাজার টাকা। 

এসময় হাতে থাকা ব্যাগ থেকে এসব বই বের করে দেখান তিনি। সেখানে নার্সারির শিশুদের জন্য ‘সোনামণিরা লেখা শেখো, প্রথমভাগ’, ‘অগ্রগামী শিশু নিকেতন: ম্যাথ প্রাকটিস’, ‘লার্নিং বেসিক ইংলিশ’, ‘ছড়ায় ছন্দে প্রথম পাঠ’, ‘লেটস স্টার্ট ইংলিশ রাইটিং’, ‘ফান অ্যান্ড লার্ন নার্সারি’, ‘অগ্রগামী শিশু নিকেতন: লেটস কালার নার্সারি’ নামের বইগুলো দেখা যায়। সঙ্গে কিছু খাতাও রয়েছে। এসব বই-খাতা কিনতে প্রত্যেক অভিভাবককে গুনতে হচ্ছে এক হাজার ৭০০ টাকা।

এ অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলার সময় আরও কয়েকজন অভিভাবক এগিয়ে এসে স্কুলটির বিরুদ্ধে অভিযোগ জানান। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওয়াসার জমি দখল করে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠেছে। সেখানে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। ফলে প্রতিষ্ঠানটি স্বাভাবিকভাবেই মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) নিয়ম মেনে চলার কথা। অথচ প্রতিষ্ঠানটির কোনো ধরনের অনুমোদনই নেই। নেই মাউশির নিয়ন্ত্রণও।

এ প্রসঙ্গে স্কুলের অধ্যক্ষ রোমেল বলেন, শিশু শ্রেণিতে আটটি বই দেওয়া হলেও তা একদিনে পড়ানো হয় না, এগুলো বছরজুড়ে পড়ানো হয়। এটি শুধু আমাদের স্কুলেই নয়, অন্যান্য কেজি স্কুলেও এসব বই দেওয়া হয়। ফলে আমরা অন্যায় কিছু দেখছি না।

জানা গেছে, অগ্রগামী শিশু নিকেতনের মতো সারাদেশে একসময় প্রায় ৬০ হাজার কেজি স্কুল ছিল। করোনাকালে কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এগুলোর সবই ব্যক্তি মালিকানাধীন। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষাদান করে। ফলে এসব স্কুল প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) অধীনে পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু ডিপিই মহাপরিচালক আলমগীর মুহাম্মদ মনসুরুল আলম জানিয়েছেন, এসব প্রতিষ্ঠান তাদের অধীনে নেই।

রাস্তার পাশে হওয়ায় স্কুলে শিক্ষার্থী সংকট নেই। করোনার আগে এখানে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী ছিল। প্রি-প্লে থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত নতুন ভর্তিতে ছয় হাজার টাকা আর ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণিতে ভর্তি ফি নেওয়া হয় আট হাজার টাকা। পূর্ণ ভর্তির ফি দুই হাজার টাকা। শিক্ষকদের চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা করে বেতন দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের কোচিং করিয়ে যে বাড়তি কিছু উপার্জন হয় তা দিয়েই তাদের কোনোরকম চলে যায়। 

 

তিনি বলেন, কেজি স্কুলগুলোর ওপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সেগুলোর ফিও আমরা নির্ধারণ করি না। অভিভাবকদের জন্য সরকারি স্কুলের দরজা খোলা। ওখানে ভর্তিতেও কোনো ফি নেই। লেখাপড়া বিনামূল্যে।

জানা গেছে, সরকার ২০১১ সালে একটি বিধিমালার আলোকে এসব প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনের উদ্যোগ নেয়। অনেক চেষ্টা করে মাত্র ৩০২টি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন করতে সক্ষম হয়েছে। পরে সারাদেশে এ ধরনের কত প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে, সেই তথ্য বের করতে বিভাগীয় কমিশনারদের নেতৃত্বে টাস্কফোর্স গঠন করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু সেই উদ্যোগও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে এখন অনেকটা অভিভাবকহীন ও বেপরোয়াভাবেই চলছে কেজি স্কুলগুলো।

রাজধানীর মিরপুর এলাকায় দেখা যায়, ৫০ নম্বর উত্তর পীরেরবাগে গড়ে তোলা হয়েছে জাহানারা প্রি-ক্যাডেট স্কুল। জরাজীর্ণ একটি ভবনের নিচতলায় চারটি ছোট রুমে এই স্কুলটি গত আট বছর ধরে চলছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিবেশ এতটাই স্যাঁতস্যাঁতে ও আবদ্ধ যে, এখানে সূর্যের আলোটুকুও পৌঁছাতে পারে না। প্রতিষ্ঠানটিতে প্লে-গ্রুপ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয়। জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষা পাসের একটি সরকারি অনুমোদিত স্কুল থেকে শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন করানো হয়। প্লে থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত তিন হাজার টাকা আর ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পাঁচ হাজার টাকা ভর্তি ফি নেয় প্রতিষ্ঠানটি। প্রাথমিকস্তরে পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের বাইরে বাড়তি বাংলা, ইংরেজি, ধর্ম, অঙ্ক, রচনাসহ বিভিন্ন ধরনের বই দিয়ে অভিভাবকদের কাছ থেকে আদায় করা হয় মোটা অঙ্কের টাকা।

স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা ফারুক হোসেন বলেন, এলাকার ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার সুযোগ করে দিতে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছি। এখানে আটজন শিক্ষক ও দুই শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে। সীমিত খরচে আমরা শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার সুযোগ করে দিচ্ছি।

বাড়তি বই পড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সব স্কুলে এসব বই পড়ায়, বই কম হলে অভিভাবকরা অভিযোগ করেন। এ কারণে টাকা নিয়ে বাড়তি বই দেওয়া হয়। স্কুলের ফ্ল্যাটের মাসিক ভাড়া ২৭ হাজার টাকা।

রাজধানীর ২৩৫/৫ পশ্চিম আগারগাঁও এলাকায় স্কুল অব লাইসীয়াম নামের এমন আরেকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। একটি ফ্ল্যাট বাড়ির দ্বিতীয় তলায় ছোট তিনটি রুমে চলে এ স্কুলের পাঠদান কার্যক্রম। এখানে প্রি-প্লে গ্রুপ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত দেড় শতাধিক শিক্ষার্থীকে পাঠদান করা হয়। স্কুলটির নিজস্ব অনুমোদন না থাকায় পাশের একটি স্কুল থেকে জেএসসি ও এসএসসির রেজিস্ট্রেশন করানো হয়। ২০১৪ সালে গড়ে তোলা এ স্কুলে শিক্ষক রয়েছেন পাঁচজন।

শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাস্তার পাশে হওয়ায় স্কুলে শিক্ষার্থী সংকট নেই। করোনার আগে এখানে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী ছিল। প্রি-প্লে থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত নতুন ভর্তিতে ছয় হাজার টাকা আর ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণিতে ভর্তি ফি নেওয়া হয় আট হাজার টাকা। পূর্ণ ভর্তির ফি দুই হাজার টাকা। শিক্ষকদের চার-পাঁচ হাজার টাকা করে বেতন দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের কোচিং করিয়ে যে বাড়তি কিছু উপার্জন হয় তা দিয়েই তাদের কোনোরকম চলে যায়।

স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, অনেক স্বপ্ন নিয়ে স্কুলটি গড়ে তুলেছি। ফ্ল্যাটের জায়গা কম হওয়ায় কিছুটা সমস্যা হয়। তার পরওর আমরা যত্ন নিয়ে পাঠদানের চেষ্টা করি। শিক্ষার্থীরা এখানে স্বল্প খরচে পড়ালেখার সুযোগ পাচ্ছে।