গাজীপুর জেলাতে গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে একই পরিবারের পাঁচ সদস্যসহ অন্তত ১১ জন হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে জনমনে। গলা কেটে হত্যা, গণপিটুনি এবং ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে খুনের মতো নৃশংস ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতায় জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অপরাধের কারণ হিসেবে মাদকাসক্তি, সামাজিক অবক্ষয়, আইনের প্রতি অনাস্থা এবং নৈতিক শিক্ষার ঘাটতিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। জানা যায়, গত ৮ মে দিবাগত রাতে কাপাসিয়া উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের রাউৎকোনা গ্রামে নৃশংসভাবে খুন করা হয় একই পরিবারের শিশুসহ পাঁচজনকে। তাঁরা হলেন শারমিন খানম (৩৫), তাঁর তিন কন্যা মিম (১৬) মারিয়া (৮) ফারিয়া (২) ও শারমিনের ছোট ভাই রসুল মোল্লা (২২)। এই ঘটনার মূল সন্দেহভাজন শারমিন খানমের স্বামী ফোরকান ঘটনার পর থেকে পলাতক থাকলেও গত বৃহস্পতিবার (১৪ মে) পদ্মা নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর আগে পদ্মা সেতুর ওপর থেকে ফোরকানের ব্যাগ ও জামাকাপড় উদ্ধার করেছিল পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর ফোরকান সেতু থেকে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। এর পরদিন ৯ মে সন্ধ্যার দিকে উপজেলার প্রহলাদপুর ইউনিয়নের ফাওগান বাজারে শিশু ধর্ষণের অভিযোগে ষাটোর্ধ্ব এক বিএনপি নেতাকে সালিসে ডেকে নিয়ে ইউপি সদস্যের নেতৃত্বে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। মারধরের দুই দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। নিহত জয়নাল আবেদীন উপজেলার প্রহলাদপুর ইউনিয়নের ফাওগান গ্রামের মৃত নইমুদ্দিনের ছেলে। তিনি প্রহলাদপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি ছিলেন। ১০ মে কালিয়াকৈর উপজেলার ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নের বাগচালা গ্রামে গরুচোর সন্দেহে তিনজনকে পিটিয়ে খুন করে বিক্ষুব্ধ জনতা। এ সময় তাঁদের ব্যবহৃত একটি ট্রাকও আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। একটি মামলা দায়ের করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা। পুলিশ বাদী হয়ে আরেকটি হত্যা মামলা দায়ের করে, যেখানে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এরপর ১২ মে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের গাছা থানার ওঝারপাড়া গ্রামের মহরের বাড়ি সংলগ্ন এলাকায় শুভ নামের এক অটোরিকশা চালককে গলা কেটে হত্যার পর অটোরিকশা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। নিহত শুভ নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রী গ্রামের আমির মিয়ার ছেলে। তিনি গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের শরীফপুর এলাকায় ভাড়া বাসায় থেকে অটোরিকশা চালাতেন। গত বৃহস্পতিবার সকালে উপজেলার রাজাবাড়ি ইউনিয়নের ডোয়াইবাড়ি গ্রামের বগারভিটা এলাকার গজারিবনের ভেতর থেকে মেহেদী হাসান আসিফ নামের এক অটোরিকশা চালকের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহত মেহেদী হাসান (২২) উপজেলার রাজাবাড়ি ইউনিয়নের ডোয়াইবাড়ি গ্রামের মো. হুমায়ুন আহমেদ জাকিরের ছেলে। তিনি পেশায় অটোরিকশা চালক ছিলেন। এভাবে প্রায় প্রতিদিন কোনো না কোনো হত্যাকাণ্ডের সংবাদ পাচ্ছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত এক সপ্তাহে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গাজীপুরে উদ্বেগে সৃষ্টি হয়েছে সাধারণ মানুষ ও অভিভাবকদের মাঝে, নিরাপত্তাহীনতায় ঝুঁকছে শিক্ষার্থীরা। টানা এসব হত্যাকাণ্ডে জেলার বাসিন্দাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সন্তানদের স্কুলে পাঠানো কিংবা সন্ধ্যার পর বাইরে যেতে দেওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন অভিভাবকেরা। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙার পর নতুন কোনো হত্যাকাণ্ডের খবর শোনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সচেতন নাগরিকরা জানান, এ ধরনের অপরাধ শুধু ব্যক্তি ও পরিবার নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পারিবারিক সম্পর্কের অবনতি, সামাজিক অস্থিরতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গাজীপুরে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং সমাজে ক্রমবর্ধমান সহিংসতার প্রতিফলন। মাদক নিয়ন্ত্রণ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, নৈতিক শিক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব।
ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান অসীম বিভাকর বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়েছে, আমরা যথাযথ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠছি না। আমাদের মধ্যকার সুকুমার বৃত্তি গুলো লোপ পেয়ে আমরা ক্রমেই প্রবৃত্তির বশীভূত হয়ে যাচ্ছি। যার কারণে আমরা হিংস্র হয়ে এই কাজগুলো খুব সহজে করে ফেলছি। আমাদের মধ্যে অপরাধ বোধ কাজ করছে না মাদক গ্রহণের কারণে। এ জন্য এত খুনোখুনি, হানাহানি।'
এবিষয়ে জানতে গাজীপুর পুলিশ সুপার (এসপি) মো. শরিফ উদ্দিন বলেন, ‘মাদকের ব্যবহার এর অন্যতম কারণ। মাদকের ভয়াবহতা খুবই মারাত্মক। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি যেকোনো ধরনের অপরাধ করতে পারেন। তাঁর বিবেক কাজ করে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সামাজিক ভাবে এগুলোর মোকাবিলা করতে হবে। সন্ধ্যার পর আপনার আমার সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে চলে এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।' তিনি আরও বলেন, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আশা করি, দ্রুত সময়ের মধ্যে এগুলোর রহস্য উদ্ঘাটন করা হবে এবং অপরাধীর সাজা নিশ্চিত হবে।