ঢাকা

টাঙ্গাইল শহরের মরণ ফাঁদ যুগনির স্লুইস গেট

১৯৮৮ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যায় বিপর্যস্ত হয় পুরো দেশ। পরের বছর ১৯৮৯ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশের জন্য প্রণীত হয় ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যান (ফ্যাপ-২০)। এই পরিকল্পনার অন্যতম উপাদান ছিল কম্পার্টমেন্টালাইজেশন পাইলট প্রজেক্ট (সিপিপি) টাঙ্গাইল।

এর মূল লক্ষ্য ছিল টাঙ্গাইল জেলার যমুনা নদীর প্লাবনভূমিতে ছোট-বড় ‘কম্পার্টমেন্ট’ বা বন্যানিয়ন্ত্রণ বেষ্টনী তৈরি করে স্থানীয় পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি ও মৎস্যচাষের উন্নয়ন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে সেই প্রকল্পের অংশ হিসেবেই টাঙ্গাইল শহর রক্ষা বাঁধের সাথে নির্মাণ করা হয় যুগনির স্লুইস গেট। কিন্তু ৩৬ বছর পর সেই স্লুইস গেটই আজ টাঙ্গাইল শহরের জন্য ‘গলার ফাঁস’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয়ভাবে সিলিমপুর-করটিয়া বাঁধ নামে পরিচিত ২১ কিলোমিটার দীর্ঘ টাঙ্গাইল শহর রক্ষা বাঁধটি টাঙ্গাইল পৌরসভা এবং এর আশপাশের এলাকাকে যমুনা, পুংলী, ধলেশ্বরী ও লৌহজং নদীর ভাঙন এবং বন্যার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।

এই বাঁধের ভেতরে বর্ষা ও বন্যার পানি প্রবেশের জন্য একমাত্র ইনলেট বা প্রবেশপথ হিসেবে নির্মাণ করা হয় সদর উপজেলার বাঘিল ইউনিয়নের কাঠুয়া যুগনিতে লৌহজং নদীর ওপর স্লুইস গেটটি।

তত্ত্ব অনুযায়ী, বর্ষায় গেট খুলে দিয়ে পানি প্রবেশ করানো এবং শুষ্ক মৌসুমে তা বন্ধ রেখে ভেতরের জমি রক্ষার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। দীর্ঘদিন স্লুইস গেটের ভুল ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী না খোলার কারণে লৌহজং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। উৎসমুখে পলি জমে ও নাব্যতা হারিয়ে নদীটি এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে।

গেট বন্ধ থাকায় মাছের অবাধ চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে জেলার বিল-ঝিলে মাছের উৎপাদন কমেছে। পাশাপাশি নদীর অববাহিকায় পলি জমে খাল-বিল ভরাট হয়ে জলাশয়গুলো নষ্ট হয়েছে।

এই প্রকল্পের আওতায় একসময়ের প্রমত্তা শ্যামাবাবুর খালকে ১৯৯৬ সালে ড্রেনে রূপান্তর করা হয়। কিন্তু নিষ্কাশনের পথ বন্ধ থাকায় বর্ষায় টাঙ্গাইল শহর ও আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। বৃষ্টির পানি বের হতে না পেরে ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট তলিয়ে যায়।

গেটের কারণে অভ্যন্তরীণ এলাকায় পানি জমে থাকায় রবি ফসলের আবাদ ব্যাহত হয়। আবার পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় ডেঙ্গুসহ পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ছে।

পানি বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদ ড. মোবাশ্বেরা বলেন, “একটি মাত্র গেট দিয়ে ২১ কিলোমিটার বাঁধের ভেতরের পানি ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়। এতে নদীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে। ফ্যাপ-২০-এর ধারণা তখনকার বাস্তবতায় ভালো ছিল। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর গতিপথ পরিবর্তন এবং নগরায়ণের কারণে সেই মডেল এখন অকার্যকর।”

তিনি প্রস্তাব করেন— স্লুইস গেটের আধুনিকায়ন ও বড় আকারের স্বয়ংক্রিয় গেট বসিয়ে জোয়ার ও বৃষ্টির সঙ্গে সমন্বয় করে তা পরিচালনা করা; বাঁধের বিভিন্ন পয়েন্টে আরও দুই-তিনটি স্লুইস গেট বা কালভার্ট নির্মাণ করা; লৌহজং নদী ও শ্যামাবাবুর খাল খনন করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং গেট পরিচালনায় স্থানীয় পানি ব্যবহারকারী সমিতিকে যুক্ত করা।

স্থানীয় কাঠুয়া যুগনির বাসিন্দা রহিম শেখ ও কৃষক রইজ উদ্দিনের অভিযোগ, স্লুইস গেট পরিচালনায় স্বচ্ছতা নেই। কখন খোলা হবে আর কখন বন্ধ হবে, তার কোনো নীতিমালা নেই। অনেক সময় রাজনৈতিক বিবেচনায় বা ব্যক্তিস্বার্থে গেট খোলা-বন্ধ করা হয়। ফলে উপকৃত হওয়ার বদলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এলাকার সাধারণ মানুষ।

টাঙ্গাইল জেলা সচেতন নাগরিক ফোরামের সভাপতি অকিবুর রহমান ইকবাল বলেন, “৩৬ বছর আগের প্রকল্পটি বর্তমানে অকার্যকর। ভারত-বাংলাদেশের ৫৫টি অভিন্ন নদীতে বাঁধ দেওয়ার কারণে সব নদীতে পানপ্রবাহ কমে গেছে। ফলে যুগনি স্লুইস গেট এখন আর প্রয়োজনীয় কোনো বিষয় নয়। গেটটি যদি একান্তই রাখতে হয়, তবে এর আধুনিকায়ন জরুরি।”

টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মাহমুদুল হক সানু বলেন, “নদী, মানুষ ও শহর—তিনটিকেই বাঁচাতে হলে যুগনির স্লুইস গেটের বিষয়ে নতুন করে, বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশবান্ধব সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। নইলে এই রক্ষা বাঁধই একদিন টাঙ্গাইল শহরের জন্য সবচেয়ে বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।”

এই বিষয়ে জানতে টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাইন উদ্দিনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

টাঙ্গাইল শহর রক্ষা বাঁধ নিঃসন্দেহে শহরকে নদীভাঙন ও বন্যা থেকে বাঁচিয়েছে। কিন্তু বাঁধের ভেতরের পরিবেশ, কৃষি ও নদীকে বাঁচাতে পারেনি। যুগনির স্লুইস গেট এখন প্রমাণ করছে, একপাক্ষিক বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।

 


সম্পর্কিত খবর