কবি জাহিদ নয়নের প্রথম কাব্যগ্রন্থ "আততায়ী অন্ধকার" এক গভীর দার্শনিক ও প্রতীকী বয়ান। এটি কেবল একগুচ্ছ কবিতার সংকলন নয়, বরং সমকালীন সময়ের চিত্রায়ণে এক নির্মম কাব্যিক দলিল। মানব সভ্যতার পঙ্কিলতা, যুদ্ধ-সংঘাত, ক্ষমতার নিষ্ঠুরতা এবং নৈতিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে কবির সংবেদনশীল হৃদয়ের এক শৈল্পিক প্রতিবাদ এই গ্রন্থের মূল সুর।
গ্রন্থের কবিতাগুলো মূলত সমাজ, ইতিহাস, এবং অস্তিত্বের গভীর সংকটকে উপজীব্য করে লেখা। কবি দেখতে পান, "পাপ ও পঙ্কিলতার নগ্ন উৎসব" চলমান। তিনি অতীত ও বর্তমানের বিভীষিকাময় ঘটনার মধ্য দিয়ে দেখেন সভ্যতার অন্তর্গত রক্তক্ষরণ। ট্রয়ের ধ্বংসযজ্ঞ, ওয়াটারলুর যুদ্ধ, হিরোশিমা-নাগাসাকির পারমাণবিক ধ্বংস, পলাশির করুণ পরিণতি- এ সবকিছুর অনুরণন কবির চেতনায় প্রতিধ্বনিত হয়। এক অশান্ত, অনিশ্চিত ও ধ্বংসসন্ন বিশ্ব কবির চোখে ধরা দেয় "আততায়ী অন্ধকার" রূপে।
এখানে কেবল ঐতিহাসিক প্রসঙ্গই উঠে আসেনি, বরং বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থার অস্থিরতাও কবিতাগুলোর অন্তঃস্রোতে প্রবাহিত। আধুনিক বিশ্বে যে নৃশংসতা ও বিভাজনের রাজনীতি চলছে, তার চিত্র ফুটে উঠেছে কাব্যিক রূপকে। "কাঁটাতার গলে শোণিতবৃষ্টিতে চলছে আমাদের স্নান"- এই পঙ্ক্তি যেন প্রতিদিনের যুদ্ধ-সংঘাতের এক রক্তাক্ত প্রতিচিত্র।
কবি জাহিদ নয়নের কাব্যভাষা তীব্র, সংবেদনশীল ও প্রতীকী। তাঁর কবিতায় অলঙ্কারিক ব্যঞ্জনা স্পষ্ট, যা পাঠককে ভাবনার গভীরে নিমজ্জিত করে। "টলমলে দুপুরে পতঙ্গের মতো ছুটতে গিয়ে তিনি দেখতে পান ইসরাফিল তার আসনে সমাসীন হয়ে ফুৎকার দিচ্ছেন শিঙায়"- এই পঙ্ক্তি কেবল এক ধর্মীয় প্রতীক নয়, বরং সভ্যতার আসন্ন পতন এবং বিপর্যয়ের ইঙ্গিত বহন করে।
কবির অভিব্যক্তি সরাসরি নয়, বরং গভীর প্রতীকী। "নরকের দূত রেখে গেছে থরে থরে সাজানো এক উদ্যান"- এমন পঙ্ক্তির মাধ্যমে তিনি আধুনিক সমাজের ভ্রান্ত উজ্জ্বলতার মুখোশ উন্মোচন করেছেন।
এই কাব্যগ্রন্থ শুধুমাত্র কাব্যপ্রেমীদের জন্য নয়, বরং যারা সমাজ, ইতিহাস এবং মানবিক সংকট নিয়ে চিন্তাশীল, তাদের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কবি এখানে নিছক ব্যথার চিত্র অঙ্কন করেননি, বরং এক গভীর প্রশ্ন রেখেছেন আমাদের সামনে- এই অন্ধকার থেকে মুক্তির উপায় কী? এই পঙ্কিলতার অন্ত নেই?
"আততায়ী অন্ধকার" নিছক একটি কাব্যগ্রন্থ নয়, এটি সময়ের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ, বিবেকের আহ্বান। কবি জাহিদ নয়ন এখানে নিছক রোমান্টিক কবিতা লেখেননি, বরং বাস্তবতার নিষ্ঠুর সত্য তুলে ধরেছেন। ভাষার দ্যোতনা, ব্যঞ্জনা ও প্রতীক ব্যবহারে এটি নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী কাব্যগ্রন্থ। সমকালীন অস্থির সময়ে এটি পাঠকের মনে আলোড়ন তুলবে, জাগিয়ে তুলবে প্রশ্ন এবং ভাবনার নতুন দিগন্ত।
কবিতা পড়তে পছন্দ করেন এমন পাঠক কিংবা কবিতায় যারা বাস্তব যাপন ও জীবনের অভিলাষী স্বপ্নে ভাসতে চান তাদের জন্য সুখপাঠ্য হতে পারে এই বইটি। ৪৮ পৃষ্ঠার এই কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ করেছে দ্বিমত পাবলিশার্স, চট্টগ্রাম। বইটির মুদ্রিত মূল্য ২০০ টাকা।
বায়ান্ন/একে