খুলনা

বাবার লাশ বাড়িতে রেখে পরীক্ষা দিল মেয়ে

যশোরের বেনাপোলে বাড়িতে বাবার লাশ রেখে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে মাসুমা আক্তার (১৮) নামের এক শিক্ষার্থী। শোকে বিহ্বল স্বজনেরা যখন লাশ দাফনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন বাবার লাশ বাড়িতে রেখেই পরীক্ষা কেন্দ্রে যেতে হয় তাঁকে। পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরে বাবার দাফনকাজ ও জানাজায় অংশ নেয় সে। বাবার আকস্মিক মৃত্যুতে মাসুমা ভেঙে পড়লেও স্বজন ও শিক্ষকদের সাহচর্যে শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় অংশ নেয় সে।

বুধবার (১৯ জুলাই) সকালে তার পরীক্ষাকেন্দ্র বেনাপোল কলেজে গিয়ে দেখা যায়, অশ্রুসিক্ত নয়নে সে পরীক্ষা দিচ্ছে। মাসুমা এবার শার্শা উপজেলা কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। সে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। সকাল ১০টার আগেই চোখ মুছতে মুছতে ওই কেন্দ্রে পৌঁছায় সে। সহপাঠী ও কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের সহযোগিতায় পরীক্ষায় অংশ নেয়।

পরীক্ষা শেষে মাসুমা বাড়ি ফেরার পর জোহরের নামাজের শেষে গ্রামের মসজিদে বাবা আব্দুস সামাদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় আত্মীয়স্বজন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পাড়া-প্রতিবেশী ও আশপাশের এলাকার কয়েক শ মানুষ অংশ নেন। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।

মাসুমার বাবা আব্দুস সামাদ (৬৫) বেনাপোলের মেসার্স তাজমহল ট্রানস্পোর্ট ও হাজী মুছা করিম অ্যান্ড সన్స్‌-এর স্বত্বাধিকারী ছিলেন। তিনি একজন বিশিষ্ট আমদানিকারক ছিলেন। বেনাপোলের নামাজগ্রামে তাঁদের বাড়ি।

মৃতের বড় ভাই আব্দুল গফুর জানান, মঙ্গলবার (১৮ জুলাই) সন্ধ্যার দিকে বাড়িতে স্ট্রোকজনিত কারণে অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান তিনি। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, তিন মেয়ে ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

বেনাপোল কলেজের কেন্দ্রসচিব অধ্যক্ষ কামরুজ্জামান শান্তি বলেন, “মাসুমার বাবার মৃত্যুর বিষয়টি আমরা সকালেই জানতে পেরেছিলাম। সবার সঙ্গে বসে পরীক্ষা দিলে তার মন কিছুটা শান্ত থাকবে ভেবে বিশেষ কোনো আলাদা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আমরা চেয়েছিলাম সে স্বাভাবিক পরিবেশেই পরীক্ষা দিক। সে এক হাতে রুমাল দিয়ে বারবার চোখ মুছছিল, আর অন্য হাতে পরীক্ষার খাতায় লিখছিল।” তিনি আরও জানান, নির্ধারিত সময়ের আগেই দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে খাতা জমা দিয়ে সে বাড়ি ফিরে যায়।

মাসুমা বলে, “বাবা আমাকে অনেক ভালোবাসতেন। তিনি চাইতেন আমি যেন পড়ালেখা করে অনেক বড় হই। তাই এমন পরিস্থিতিতেও আমি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছি। বাবার স্বপ্ন পূরণ করতেই কষ্ট চেপে পরীক্ষা দিয়েছি।”

শার্শা উপজেলা কলেজের অধ্যক্ষ হাসানুজ্জামান অনুপম বলেন, “মাসুমা আক্তার আমাদের কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের একজন নিয়মিত ও মেধাবী ছাত্রী। তার রোল নম্বর ৫০৫৯১১। বাবার মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে কলেজের শিক্ষকমণ্ডলী ও সহপাঠীরা তাদের বাসায় সমবেদনা জানাতে যায়। শোক সামলে সে যেন পরীক্ষাটি ভালোভাবে শেষ করতে পারে, সেজন্য আমরা সব ধরনের সহযোগিতা করেছি।”

শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফজলে ওয়াহিদ বলেন, “বাবাকে হারানো যেকোনো সন্তানের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক। এরপরও মাসুমা যে ধৈর্য ও মনোবল দেখিয়ে পরীক্ষা দিয়েছে তা প্রশংসনীয়। আমরা তার পাশে থাকার চেষ্টা করেছি।”

 


সম্পর্কিত খবর