খুলনা

বেনাপোল বন্দর থেকে ৭ কোটি টাকার পণ্য পাচার, ঢাকায় আটক

দেশের সর্ববৃহৎ বেনাপোল স্থলবন্দরে শুল্ক ফাঁকি চক্রের আগ্রাসী ভূমিকায় একের পর এক আমদানিকৃত পণ্যের চালান অনায়াসে পাচার হওয়ার ঘটনায় কাস্টমস ও বন্দর ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ঘটনায় ব্যবসায়িক মহল উদ্বিগ্ন।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে বেনাপোল স্থলবন্দরের ৪১ নম্বর শেড থেকে ৭ কোটি টাকা মূল্যের উচ্চ শুল্কের দুই ট্রাক সিনথেটিক ফ্যাব্রিকস, শাড়ি ও থ্রিপিসের চালান শুল্ক পরিশোধ ছাড়াই বের করে নিয়ে যায় বেনাপোল শুল্ক ফাঁকি ও নো-এন্ট্রি সিন্ডিকেটের সদস্যরা। বেনাপোল কাস্টম হাউসের এক সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও বন্দরের শেড ইনচার্জের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে পণ্যচালানটি বন্দরের শেড থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। নানাভাবে চেষ্টা চালিয়েও প্রথমে পণ্যচালানটি জব্দ করা যায়নি। পরে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দার (এনএসআই) তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকা কোতোয়ালি থানা-পুলিশ পুরান ঢাকার ওয়াইজঘাট এলাকার একটি গুদাম থেকে পণ্যচালানটি জব্দ করে। এ ঘটনায় প্রাথমিকভাবে তিনজনকে আটক করা হয়েছে। তবে রাঘববোয়ালরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন। এই রাঘববোয়ালরা বেনাপোলকেন্দ্রিক সিন্ডিকেটের সদস্য।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি ভারত থেকে কাগজপত্রবিহীন তিন ট্রাক পণ্য নিয়ে আসে এ চক্রটি। পণ্যগুলো ভারতীয় ট্রাক থেকে খালাস করা হয় বেনাপোল বন্দরের ৪১ নম্বর শেডে। রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে পণ্যচালানটি বন্দর থেকে পাচারের তথ্য পেয়ে এনএসআই বিষয়টি কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে জানায়।

বেনাপোল কাস্টম হাউসের যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দিন মিঞা বন্দরের ৪১ নম্বর শেডে গিয়ে ভারতীয় তিনটি ট্রাকের পণ্য আটক করেন। ওই পণ্যচালানে বাংলাদেশি চার ট্রাক শাড়ি, থ্রিপিসসহ ফ্যাব্রিকস ছিল। যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দিন মিঞা এই পণ্যচালানটি দেখভাল করার দায়িত্ব দেন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মঈন উদ্দিন আরমানকে। কিন্তু রক্ষকই ভক্ষকের ভূমিকা পালন করে শুল্ক ফাঁকিবাজ সিন্ডিকেটের সদস্যদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ নিয়ে শেডে থাকা চার ট্রাক পণ্যের মধ্যে দুই ট্রাক পণ্য বের করে দেওয়ার সুযোগ করে দেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সেই পণ্যচালান অবশেষে শুক্রবার গভীর রাতে এনএসআইয়ের তথ্যের ভিত্তিতে পুরান ঢাকা থেকে জব্দ করে পুলিশ। সাত কোটি টাকা মূল্যের দুই ট্রাক পণ্য বন্দর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর কাস্টমসের যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দিন মিঞা নিজে বিজিবি-কাস্টমসের যৌথ তল্লাশিচৌকিতে গিয়ে ট্রাক দুটি আটকের নির্দেশ দেন। ট্রাক দুটি হলো—ঢাকা ট্র্যান্সপোর্টের (ঢাকা মেট্রো-ট-২২-৭৪৭১) ও আফজাল পার্সেল ট্র্যান্সপোর্টের (ঢাকা মেট্রো-ট-২৪-০৮৪৭)। ট্রাক দুটি আটকের জন্য যশোরসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যশোর এনএসআইয়ের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হলেও ট্রাক দুটি আটক করা সম্ভব হয়নি। বৃহস্পতিবার রাতে ট্রাক দুটি আটকের জন্য পদ্মা সেতুর টোল প্লাজায় বলা হয়। একই সঙ্গে এনএসআইয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়। সারারাত অভিযানের পর পুরান ঢাকার ওয়াইজঘাটের সামাদ প্লাজার নিচে অবস্থিত একটি গুদাম থেকে এক ট্রাক (১২০ বস্তা) অবৈধ ভারতীয় কাপড় জব্দ করে পুলিশ। এ সময় সাইফুর রহমান (৩৭), সংগ্রাম হোসেন (৩০) ও বাবু (৩৭) নামে তিন ব্যক্তিকে আটক করে কোতোয়ালি থানা-পুলিশ। তাৎক্ষণিকভাবে তাঁদের বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকা কোতোয়ালি থানায় পুলিশ বাদী হয়ে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করেছে।

এ বিষয়ে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রবিউল ইসলাম বলেন, "গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আমরা এ অভিযান চালিয়ে ভারত থেকে অবৈধভাবে আসা বিপুল পরিমাণ ভারতীয় কাপড় জব্দ করি। একই সঙ্গে হাতেনাতে তিনজনকে আমরা গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি। আটক ব্যক্তিরা অবৈধভাবে ভারতীয় কাপড় সংগ্রহ, মজুত ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জব্দ করা কাপড়ের উৎস এবং চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।" এ ঘটনায় আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

এদিকে ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বেনাপোল কাস্টমসের যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দিন মিঞার নেতৃত্বে “তদন্ত, গবেষণা ও ব্যবস্থাপনা ইউনিট” (আইআরএম) টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মঈন উদ্দিন আরমানকে অনুপস্থিত দেখতে পায়। পরবর্তী সময়ে দায়িত্বে না থাকার কারণ জিজ্ঞাসা করলে কোনো সদুত্তর দিতে না পারায় যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দিন মিঞা ক্ষিপ্ত হয়ে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মঈন উদ্দিন আরমানকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। এআরও-কে প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করার প্রতিবাদে কাস্টমসের রাজস্ব ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। কয়েক ঘণ্টা কাজও বন্ধ রাখেন তাঁরা।

ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ বলেন, বেনাপোল স্থলবন্দর দেশের অন্যতম প্রধান স্থলবন্দর। এখানে কাস্টমসের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দাপ্তরিক কোনো সিদ্ধান্ত বা দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা বিধি অনুযায়ী তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

তাঁরা বলেন, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু কর্মস্থলে কোনো কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ সত্য হলে সেটিও প্রশাসনিকভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এ ব্যাপারে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মঈন উদ্দিন আরমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি হননি। যা কিছু বলার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবেন বলে জানান।

বন্দরের একটি সূত্র জানায়, বেনাপোল বন্দর থেকে পণ্য পাচারের ঘটনায় কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মঈন উদ্দিন আরমানসহ বেনাপোল স্থলবন্দরের একাধিক কর্মকর্তা জড়িত, যা সংশ্লিষ্ট মহলের সুষ্ঠু তদন্তে বেরিয়ে আসবে। একই সঙ্গে বন্দরের ৪১ নম্বর শেডে মিথ্যা ঘোষণায় আনা আরও কয়েক কোটি টাকার পণ্যচালান জব্দ করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া গত আট মাসে ৪১ নম্বর শেড থেকে মিথ্যা ঘোষণা ও জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে কী পরিমাণ শুল্ক ফাঁকি দিয়ে পণ্যচালান বেরিয়ে গেছে, তার তদন্ত শুরু করেছে রাষ্ট্রীয় উচ্চপর্যায়ের একটি গোয়েন্দা দল।

বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) রুহুল আমিন জানান, নতুন করে ওঠা অভিযোগটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রবিবারে এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বন্দরের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বেনাপোল কাস্টম হাউসের যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দিন মিয়ার কাছে সাংবাদিকেরা সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি পরে এ নিয়ে কথা বলবেন বলে জানান।

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শুল্ক ফাঁকিতে কাস্টমস ও বন্দরের অভিযুক্ত বা সহায়তাকারী সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিলে বন্দর ও কাস্টম হাউসের শৃঙ্খলা নষ্ট হবে এবং একই সঙ্গে এ বন্দর থেকে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে।

 


সম্পর্কিত খবর